আর্থিক সংকটে থাকা ছয় ব্যাংকে আটকে থাকা প্রায় ২৫০ কোটি টাকার রাজস্ব ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রভিডেন্ট-গ্র্যাচুইটি তহবিল ফেরত পেতে বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপ চেয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি (ডেসকো)।
গত ১১ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে ডেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম আহমেদ এসব অর্থ ফেরত পাওয়ার ব্যবস্থা নিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতি অনুরোধ জানান।
ডেসকো জানিয়েছে, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা, সরকারি রাজস্ব সুরক্ষিত রাখা এবং সময়মতো আর্থিক দায় পরিশোধের জন্য এসব আমানত জরুরি ভিত্তিতে নগদায়ন করা প্রয়োজন।
ডেসকোর চিঠির তথ্য অনুযায়ী, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকে ৪৭ কোটি ৯৪ লাখ, ইউনিয়ন ব্যাংকে ৫৫ কোটি ২৭ লাখ, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকে ৫৯ কোটি ৯৬ লাখ এবং ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে ৪৬ কোটি ২৭ লাখ টাকা আমানত রয়েছে।
এই চার ব্যাংকে ডেসকোর মোট আমানতের পরিমাণ ২০৯ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। এর বাইরে পদ্মা ব্যাংকে ২২ কোটি ৫৩ লাখ এবং বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকে ১৭ কোটি ৩৬ লাখ টাকা আটকে রয়েছে।
পদ্মা ব্যাংক ছাড়া বাকি পাঁচটি ব্যাংক আগে বিতর্কিত ব্যবসায়ী সাইফুল আলমের (এস আলম) নিয়ন্ত্রণে ছিল।
ডেসকো জানিয়েছে, আমানতের মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার পরও ব্যাংকগুলো অর্থ ফেরত দিতে পারেনি। এ বিষয়ে লিখিত ও মৌখিকভাবে বারবার অনুরোধ জানানো হলেও কোনো ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, একীভূত ব্যাংকগুলোতে আটকে থাকা অর্থ সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকদের জন্য নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী পরিশোধ করা হবে। অন্যদিকে, পদ্মা ব্যাংক ও বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের দ্রুত বড় অঙ্কের অর্থ পরিশোধের সক্ষমতা নেই। ফলে ডেসকোকে অর্থ ফেরত পেতে অপেক্ষা করতে হবে।
আর্থিকভাবে নাজুক অবস্থায় ব্যাংকগুলো
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংককে ‘ব্যাংক রেজল্যুশন স্কিম ২০২৫’-এর আওতায় এনে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়েছে। পাঁচ ব্যাংকের সম্মিলিত আমানতের পরিমাণ ১ লাখ ৩৬ হাজার ৫৪৬ কোটি টাকা। এসব ব্যাংকের বিপুল খেলাপি ঋণ ও তারল্য সংকট সামাল দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক আমানত সুরক্ষা তহবিল থেকে অর্থ সরবরাহ করেছে।
ব্যাংকগুলোর আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে কাজ করা বাংলাদেশ ব্যাংকের অফসাইট সুপারভিশন বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, পদ্মা ব্যাংক বর্তমানে তীব্র আর্থিক সংকট, উচ্চ খেলাপি ঋণ ও মূলধন ঘাটতিতে জর্জরিত। ব্যাংকটির প্রায় ৯০ শতাংশ ঋণই খেলাপি হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকও বিভিন্ন আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ৩১ মার্চ পর্যন্ত ব্যাংকটির মোট ঋণের ৬৬ শতাংশ ছিল খেলাপি।
ব্যাংকটির বড় অঙ্কের প্রভিশন ঘাটতিও রয়েছে। মার্চ শেষে ১ হাজার ৪ কোটি টাকার প্রয়োজনীয় প্রভিশনের বিপরীতে ব্যাংকটি সংরক্ষণ করতে পেরেছিল মাত্র ৩৭৫ কোটি টাকা।
আমানত ফেরতের কাঠামো
একীভূত পাঁচ ব্যাংকের গ্রাহকদের আমানত ফেরত দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি কাঠামো রয়েছে।
আমানত সুরক্ষা আইন ২০২৬ অনুযায়ী, সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা পর্যন্ত আমানত সুরক্ষিত। একই সঙ্গে রেজল্যুশন কাঠামোর আওতায় নতুন ব্যাংকে আমানতকারীদের পাওনা সংরক্ষণ করা হয়েছে।
গত জুলাইয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, সংকটে থাকা ব্যাংকগুলোর আমানতকারীরা শেষ পর্যন্ত তাদের মূল অর্থ ও সুদ ফেরত পাবেন। তবে ব্যাংকগুলোর লোকসানের কারণে পুরো অর্থ ফেরত পেতে সময় লাগতে পারে।
গত জানুয়ারিতে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রথমে একীভূত পাঁচ ব্যাংকের গ্রাহকদের সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা পর্যন্ত উত্তোলনের সুযোগ দেয়। পরে জুলাইয়ে চিকিৎসাসহ আমানতকারী ও তাদের পরিবারের নিকটাত্মীয়দের জরুরি প্রয়োজন বিবেচনায় এ সীমা বাড়িয়ে ১০ লাখ টাকা করা হয়।
তবে ডেসকোর মতো প্রতিষ্ঠানের আমানত কীভাবে ফেরত দেওয়া হবে, সে বিষয়ে নির্দেশনায় স্পষ্ট কোনো ব্যবস্থা উল্লেখ করা হয়নি।
কেকে/এলএ