মূল্যবোধ আন্দোলনের চেয়ারম্যান ও ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের প্রফেসর ড. মোহাম্মদ সরোয়ার হোসেন বলেছেন, ‘বাংলাদেশে শব্দের মারপ্যাঁচে এলজিবিটি তথা সমকামিতা বৈধ করার প্রক্রিয়া চলছে।’
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) সকাল ১০টায় রাজধানীর কাকরাইলে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে অনুষ্ঠিত জাতীয় উলামা-মাশায়েখ কনভেনশনে তিনি এ কথা বলেন।
ড. মোহাম্মদ সরোয়ার হোসেন জানান, দেশে পরিবার ও ঈমান বিধ্বংসী ট্রান্সজেন্ডারবাদ ও সমকামিতা প্রতিষ্ঠার চক্রান্ত চলছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুরক্ষায় ট্রান্সজেন্ডারবাদ প্রত্যাখ্যান করে রাষ্ট্রের সর্বস্তরে ‘দ্বি-লিঙ্গ নীতি’ চান তারা।
ট্রান্সজেন্ডারবান্ধব সংশোধিত শ্রম আইন ২০২৬ বাতিলের পাশাপাশি সরকারের সব স্তরে দ্বি-লিঙ্গ নীতি বাস্তবায়নের দাবি জানান তিনি।
ড. মোহাম্মদ সরোয়ার হোসেন বলেন, ‘আজকের এই কর্মসূচির মাধ্যমে সংশোধিত শ্রম আইন ২০২৬ বাতিলের পাশাপাশি আমরা সরকারের সব স্তরে দ্বি-লিঙ্গ নীতির দাবি জানাচ্ছি।’ এ নীতির আওতায় তিনটি দাবি তুলে ধরেন তিনি।
১. ‘স্বীকৃত লিঙ্গ’ হবে জন্মগত বায়োলজিক্যাল লিঙ্গের ভিত্তিতে এবং তা হবে কেবল দুটি—নারী ও পুরুষ। ‘হিজড়া’ জনগোষ্ঠীকে জন্মগত লিঙ্গ প্রতিবন্ধী হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে; তবে তা মেডিকেল পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হতে হবে, মৌখিক দাবির ভিত্তিতে নয়।
২. সব ধরনের সরকারি নীতি, নথি, ফরম ও পরিচয়পত্রে কেবল ‘লিঙ্গ’ শব্দটি (জৈবিক লিঙ্গ বা সেক্স অর্থে) ব্যবহার করতে হবে। ‘জেন্ডার’ শব্দ বা জেন্ডার-সংক্রান্ত পরিভাষা ব্যবহার করা যাবে না।
৩. জেন্ডারবাদকে চরমপন্থা হিসেবে চিহ্নিত করে তা প্রতিহত করতে হবে।
মূল্যবোধ আন্দোলনের চেয়ারম্যান ড. সরোয়ার বলেন, অগণিত ইসলামপ্রেমী জনতার রক্তের বিনিময়ে প্রতিষ্ঠিত বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কর্মকাণ্ডে ইসলামের মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এলজিবিটি গোষ্ঠীর প্রতি সুস্পষ্ট পৃষ্ঠপোষকতা ছিল। এর মধ্যে রয়েছে—ঈদ শোভাযাত্রায় সমকামিতার প্রতীক ইউনিকর্নের প্রদর্শনী, নববর্ষের ড্রোন শোতে সমকামিতার প্রতীক ‘গে এঞ্জেল’ প্রদর্শন, বিভিন্ন সংস্কার প্রস্তাবে ভাষার মারপ্যাঁচে এলজিবিটি তথা সমকামী অন্তর্ভুক্তির প্রচেষ্টা এবং ট্রান্সজেন্ডার ও যৌনকর্মীদের ব্যাপক অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত ‘মৈত্রীযাত্রায়’ সরকারঘনিষ্ঠ ও বিভিন্ন সংস্কার কমিশনের সদস্যদের অংশগ্রহণ।
এ ছাড়া প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস কর্তৃক একজন জন্মগত পুরুষকে ‘অদম্য নারী পুরস্কার ২০২৫’ প্রদান, সমকামী এজেন্ডা বাস্তবায়নের সুবিধার্থে ‘মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়’-এর নাম পরিবর্তন করে ‘নারী ও শিশু মন্ত্রণালয়’ করা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা ২০২৬-এর প্রবেশপথে এলজিবিটির প্রতীক রংধনুর আদলে স্তম্ভ স্থাপন, পোশাক শিল্পসহ দেশের বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে সমকামীবান্ধব পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে শ্রম আইন সংস্কারের নামে আইএলও কনভেনশন-১৯০ অনুমোদন এবং এলজিবিটিকে অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে জুলাই সনদ ও গণভোটকে বিতর্কিত করার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
ড. সরোয়ার বলেন, ড. ইউনূস সরকারের এসব পদক্ষেপ ট্রান্সজেন্ডার ও এলজিবিটি গোষ্ঠীর দুঃসাহস বাড়িয়ে দিয়েছিল। তার দাবি, একজন ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তি প্রকাশ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষক আসিফ মাহতাব ও তাকে হত্যার হুমকি ও উসকানি দিয়েছেন। একাধিকবার সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করার পরও ওই ব্যক্তি ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিলেন এবং প্রকাশ্যে শহীদ মিনারে সমকামী বিয়ের দাবিতে অনশন করেছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
ড. সরোয়ার বলেন, ওই সরকারের জারি করা ‘বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’ বর্তমান সরকার প্রশ্নহীনভাবে পাস করেছে। তার দাবি, সংশোধিত শ্রম আইন ২০২৬-এ কোনো স্পষ্ট সংজ্ঞা ছাড়াই ‘জেন্ডার’, ‘জেন্ডার পরিচয়’ বা ‘লিঙ্গ পরিচয়’, ‘জেন্ডার অভিব্যক্তি’, ‘বৈষম্যমূলক জেন্ডার সংবেদনশীলতা’ এবং ‘জেন্ডারভিত্তিক অন্যান্য আচরণ’-এর মতো পরিভাষা সংযোজন করা হয়েছে। এর ফলে ট্রান্সজেন্ডারবাদ ও সমকামিতা পরোক্ষভাবে বৈধতা পাওয়ার পথ তৈরি হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
তিনি আরও বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে একদিকে ঢাকেশ্বরী মন্দিরে প্রকাশ্যে সমকামী বিয়ের আয়োজন হলেও প্রশাসন নির্বিকার ছিল। অন্যদিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এলজিবিটি নীতি গ্রহণ করেছে এবং ট্রান্সজেন্ডারদেরও হিজড়া হিসেবে বিবেচনা করার নীতিমালা ঘোষণা করেছে বলে দাবি করেন তিনি।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রীর ‘ইনক্লুসিভ শিক্ষা’ এবং ‘প্লে ল্যাব’ মডেলের প্রসঙ্গ তুলে ড. সরোয়ার বলেন, যে ‘জেন্ডার ট্রান্সফরমেটিভ অ্যাপ্রোচ’ থেকে ‘শরীফ-শরীফার গল্প’ তৈরি হয়েছিল, একই অ্যাপ্রোচে ‘প্লে ল্যাব’ মডেল সাজানো হয়েছে।
ড. সরোয়ার বলেন, ‘আমরা দ্ব্যর্থহীনভাবে বলতে চাই—জেন্ডার শব্দ বা জেন্ডার পরিভাষা সম্পূর্ণরূপে সমকামীবান্ধব এবং ইনক্লুসিভ বা অন্তর্ভুক্তিমূলক শব্দও সম্পূর্ণরূপে সমকামীবান্ধব। কেউ তা অস্বীকার করতে চাইলে আমরা তাকে ওপেন ডিবেটের চ্যালেঞ্জ দিচ্ছি।’
তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে নারী-পুরুষের বাইরে আর কোনো লিঙ্গের স্বীকৃতি নেই। পাসপোর্ট থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় কোনো ফরমে নারী-পুরুষের বাইরে অন্য কোনো অপশন নেই বলেও দাবি করেন তিনি।
তার আরও দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল সব নথি থেকে ‘জেন্ডার’ শব্দ বাদ দিয়ে তার পরিবর্তে ‘সেক্স’ (জন্মগত লিঙ্গ) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। সেখানে লিঙ্গ (সেক্স)-এর প্রতিস্থাপন হিসেবে লিঙ্গ পরিচয় (জেন্ডার আইডেনটিটি)-কে অস্বীকৃতি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে ‘জেন্ডারবাদ’কে ‘চরমপন্থা’ এবং ‘ট্রান্সজেন্ডারবাদ’কে ‘উন্মাদনা’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
ড. সরোয়ার বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে ইনক্লুসিভ বা অন্তর্ভুক্তিমূলক সব ডিআইই কর্মসূচিকে ‘উগ্র ও অপচয়মূলক’ (র্যাডিক্যাল অ্যান্ড ওয়েস্টফুল) হিসেবে চিহ্নিত করে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি রাশিয়া, চীন, তুরস্ক, মালয়েশিয়াসহ ওআইসি ও মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন দেশ জেন্ডারবাদের বিপক্ষে। অন্যদিকে জেন্ডারবাদের পক্ষে মূলত জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
লিবিয়ার শরিয়া রিসার্চ অ্যান্ড স্টাডিজ কাউন্সিল ‘সামাজিক লিঙ্গ’ তথা ‘জেন্ডার’ পরিভাষার ব্যবহার হারাম ঘোষণা করেছে বলেও উল্লেখ করেন ড. সরোয়ার। জেন্ডারবাদ থেকে উদ্ভূত ট্রান্সজেন্ডারবাদকে কুফরি আখ্যা দিয়েছে বাংলাদেশ, সৌদি আরব এবং ওআইসির ফতোয়া বোর্ডসহ বিশ্বের বড় বড় ইসলামিক প্রতিষ্ঠানগুলো—এমন দাবিও করেন তিনি।
কেকে/ এমএস