মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যা হাসপাতালে জন্মগতভাবে জরায়ু ও যোনিপথ অনুপস্থিত থাকা এক নারীর অ্যাডভান্সড ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারির মাধ্যমে সফলভাবে কৃত্রিম যোনিপথ তৈরি করা হয়েছে। পেটে বড় ধরনের কাটাছেঁড়া না করে কয়েকটি ছোট ছিদ্রের মাধ্যমে এ জটিল অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করা হয়।
চিকিৎসকরা জানান, ৩০ বছর বয়সী ওই নারী মেয়ার-রকিটানস্কি-কুস্টার-হাউজার (গজকঐ) সিনড্রোমে আক্রান্ত ছিলেন। এ ধরনের জন্মগত সমস্যায় নারীর স্বাভাবিক নারীসুলভ শারীরিক বৈশিষ্ট্য ও কার্যকর ডিম্বাশয় থাকলেও জরায়ু ও যোনিপথ সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে অনুপস্থিত থাকতে পারে। এর ফলে দাম্পত্য জীবনসহ নানা ধরনের শারীরিক ও মানসিক সংকট তৈরি হতে পারে।
মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যা হাসপাতালের অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট ডা. শাহী আরশাদ বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, রোগীর ক্ষেত্রে পেটে বড় ধরনের অস্ত্রোপচার না করে ল্যাপারোস্কোপের মাধ্যমে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও দক্ষতানির্ভর প্রক্রিয়ায় নতুন যোনিপথ তৈরি করা হয়েছে। অস্ত্রোপচারের পর রোগী বর্তমানে সুস্থ রয়েছেন।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, প্রচলিত ওপেন সার্জারির ক্ষেত্রে এ ধরনের অস্ত্রোপচারে পেটে বড় ধরনের কাটাছেঁড়ার প্রয়োজন হতে পারে। তবে আধুনিক ল্যাপারোস্কোপিক প্রযুক্তির মাধ্যমে কয়েকটি ছোট ছিদ্র করে ক্যামেরা ও বিশেষায়িত সূক্ষ্ম অস্ত্রোপচারিক যন্ত্র ব্যবহার করে অপারেশনটি সম্পন্ন করা হয়েছে।
অ্যাডভান্সড ল্যাপারোস্কোপিক পদ্ধতির সুবিধা সম্পর্কে হাসপাতালের স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ও সার্জন ডা. ফারজানা হক পর্না বলেন, ‘বড় পর্দায় ক্যামেরার মাধ্যমে অস্ত্রোপচারের স্থান পর্যবেক্ষণ করে বিশেষ সূক্ষ্ম যন্ত্রের সাহায্যে এ সার্জারি করা হয়। এতে পেটে বড় কোনো দাগ বা কাটা থাকে না। একই সঙ্গে অস্ত্রোপচারজনিত ব্যথা ও রক্তক্ষরণ তুলনামূলক কম হয়, হাসপাতালে কম সময় থাকতে হয় এবং রোগী দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন।’
অস্ত্রোপচারে নেতৃত্ব দেন ডা. ফারজানা হক পর্না ও অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট ডা. শাহী আরশাদ। তাদের সঙ্গে সহায়তা করেন ডা. ইমরান আহমদ এবং সিনিয়র স্টাফ নার্স মনিক রায় ও মো. আবদুল্লাহ মিয়া।
ডা. শাহী আরশাদ বলেন, ‘মৌলভীবাজারে এ প্রথম এবং সরকারি হাসপাতালে এমন জটিল অস্ত্রোপচার সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।’
তিনি জানান, বেসরকারিভাবে বা জেলার বাইরে এ ধরনের চিকিৎসায় প্রায় ছয় লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে। সরকারি হাসপাতালে এ চিকিৎসা সম্পন্ন হওয়ায় রোগীর পরিবারের আর্থিক চাপও কমেছে।
চিকিৎসকরা মনে করছেন, মৌলভীবাজারে স্থানীয় পর্যায়ে এ ধরনের অত্যাধুনিক চিকিৎসাসেবা চালু হওয়া জেলার স্বাস্থ্য খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। এর ফলে এ অঞ্চলের রোগীদের উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজধানী ঢাকাসহ দূরবর্তী স্থানে যাওয়ার দুর্ভোগ ও অতিরিক্ত আর্থিক ব্যয় অনেকটাই কমে আসতে পারে।
চিকিৎসকদের মতে, এ অস্ত্রোপচার শুধু একটি বিরল জন্মগত সমস্যার চিকিৎসাই নয়; সংশ্লিষ্ট নারীর আত্মবিশ্বাস ও স্বাভাবিক দাম্পত্য জীবনের সম্ভাবনা তৈরিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে এটি সরকারি হাসপাতালে আধুনিক ল্যাপারোস্কোপিক গাইনোকোলজিক্যাল সার্জারির সক্ষমতার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
স্থানীয় পর্যায়ে এমন অত্যাধুনিক চিকিৎসা চালু হওয়ায় এখন থেকে মৌলভীবাজার ও আশেপাশের অঞ্চলের রোগীদের আর রাজধানী ঢাকাসহ দূরবর্তী কোনো স্থানে দৌড়ঝাঁপ করতে হবে না। এতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি ও অতিরিক্ত আর্থিক চাপ অনেকাংশে কমে আসবে বলে আশা প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কেকে/এআই