অস্টিওপোরোসিস এমন একটি রোগ, যাতে হাড়ের ঘনত্ব ও গুণগত মান কমে যায়। ফলে হাড় ধীরে ধীরে দুর্বল ও ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে সামান্য আঘাত, কাশি কিংবা ঝুঁকে কাজ করার মতো সাধারণ ঘটনাতেও হাড় ভেঙে যেতে পারে।
অনেকের ধারণা, অস্টিওপোরোসিস শুধু বয়স্ক মানুষের রোগ। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বয়স বাড়ার সঙ্গে এই রোগের ঝুঁকি বাড়লেও যেকোনো বয়সেই হাড়ের ঘনত্ব কমে যাওয়ার সমস্যা দেখা দিতে পারে। জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, হরমোনের পরিবর্তন এবং কিছু রোগ বা ওষুধের কারণে অল্প বয়সেও হাড় দুর্বল হতে পারে।
অস্টিওপোরোসিসের লক্ষণ কী?
অস্টিওপোরোসিসকে অনেক সময় ‘নীরব রোগ’ বলা হয়। কারণ শুরুতে এর তেমন কোনো স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যায় না। হাড়ের ঘনত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার পর সমস্যা প্রকাশ পেতে শুরু করে।
সম্ভাব্য লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে—সামান্য আঘাতেই হাড় ভেঙে যাওয়া; কোমর, পিঠ বা ঘাড়ে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা, উচ্চতা ধীরে ধীরে কমে যাওয়া, মেরুদণ্ড বাঁকা হয়ে যাওয়া বা কুঁজ তৈরি হওয়া, দৈনন্দিন কাজের সময় হাড় বা পিঠে অস্বস্তি অনুভূত হওয়া, বারবার হাড়ে ফাটল বা ভাঙার ঘটনা
তবে এসব লক্ষণ দেখা দিলেই অস্টিওপোরোসিস হয়েছে—এমন নয়। সঠিক কারণ জানতে চিকিৎসকের পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা জরুরি।
কেন হয় অস্টিওপোরোসিস?
বয়স বাড়ার সঙ্গে শরীরে পুরোনো হাড় ভেঙে নতুন হাড় তৈরির স্বাভাবিক ভারসাম্যে পরিবর্তন আসে। ফলে ধীরে ধীরে হাড়ের ঘনত্ব কমতে পারে। বিশেষ করে নারীদের মেনোপজের পর হরমোনের পরিবর্তনের কারণে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে।
এ ছাড়া আরও কিছু কারণ রয়েছে। যেমন—খাবারে পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি না থাকা, নিয়মিত শরীরচর্চা না করা, দীর্ঘ সময় শারীরিকভাবে নিষ্ক্রিয় থাকা, অতিরিক্ত ধূমপান, অতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণ, কম ওজন বা অপুষ্টি, হরমোনের কিছু সমস্যা, কিডনি, লিভার বা পরিপাকতন্ত্রের কিছু দীর্ঘমেয়াদি রোগ, দীর্ঘদিন কিছু নির্দিষ্ট ধরনের ওষুধ সেবন
পারিবারিক ইতিহাসও গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারের ঘনিষ্ঠ কারও অস্টিওপোরোসিস বা হাড় ভেঙে যাওয়ার ইতিহাস থাকলে নিজের ঝুঁকি সম্পর্কে চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করা ভালো।
কারা বেশি ঝুঁকিতে?
বয়স্ক নারী-পুরুষের পাশাপাশি মেনোপজ-পরবর্তী নারীরা তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। তবে বয়স কম হলেও যারা দীর্ঘদিন শারীরিকভাবে নিষ্ক্রিয়, অপুষ্টিতে ভুগছেন, পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি গ্রহণ করছেন না অথবা দীর্ঘদিন কিছু নির্দিষ্ট ওষুধ ব্যবহার করছেন, তাদেরও ঝুঁকি থাকতে পারে।
তাই শুধু বয়সকে অস্টিওপোরোসিসের একমাত্র কারণ হিসেবে দেখা ঠিক নয়।
কীভাবে শনাক্ত করা হয়?
অস্টিওপোরোসিস শনাক্ত করার জন্য চিকিৎসক রোগীর বয়স, শারীরিক অবস্থা, পারিবারিক ইতিহাস ও ঝুঁকির বিষয়গুলো বিবেচনা করেন। প্রয়োজন হলে হাড়ের ঘনত্ব পরিমাপের পরীক্ষা করা হয়। সাধারণত ডেক্সা বা DXA স্ক্যান হাড়ের ঘনত্ব নির্ণয়ের একটি প্রচলিত পদ্ধতি।
কার কার এই পরীক্ষা প্রয়োজন, তা বয়স ও ব্যক্তিগত ঝুঁকির ওপর নির্ভর করে। তাই নিজে থেকে পরীক্ষা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
প্রতিরোধে কী করবেন?
অস্টিওপোরোসিস প্রতিরোধে ছোটবেলা থেকেই হাড়ের যত্ন নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবারের পাশাপাশি নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ড হাড়কে সুস্থ রাখতে সহায়তা করে।
ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি: খাদ্যতালিকায় দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার, ছোট মাছসহ ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ খাবার রাখা যেতে পারে। ভিটামিন ডি-এর পর্যাপ্ততা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। কারও ঘাটতি থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা যেতে পারে।
নিয়মিত ব্যায়াম: হাঁটা, সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা এবং বয়স ও শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী ওজন বহনকারী ব্যায়াম হাড়ের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতে পারে। তবে যাদের আগে থেকেই হাড় দুর্বল, তারা ব্যায়াম শুরুর আগে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেবেন।
ধূমপান এড়িয়ে চলুন: ধূমপান হাড়ের স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই ধূমপান থেকে দূরে থাকা জরুরি।
পড়ার ঝুঁকি কমান: বিশেষ করে বয়স্কদের ক্ষেত্রে ঘরের মেঝে শুকনো ও নিরাপদ রাখা, পর্যাপ্ত আলো নিশ্চিত করা এবং চলাচলের পথে অপ্রয়োজনীয় জিনিস না রাখা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ হাড় দুর্বল থাকলে পড়ে গিয়ে গুরুতর ভাঙন হতে পারে।
চিকিৎসা কি সম্ভব?
অস্টিওপোরোসিস ধরা পড়লে আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। রোগীর বয়স, হাড়ের ঘনত্ব, আগের হাড় ভাঙার ইতিহাস এবং অন্যান্য শারীরিক অবস্থার ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসক প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নির্ধারণ করেন।
চিকিৎসার অংশ হিসেবে খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনে পরিবর্তনের পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধ দেওয়া হতে পারে। তবে অস্টিওপোরোসিসের ওষুধ নিজে থেকে শুরু বা বন্ধ করা উচিত নয়।
বয়স নয়, সচেতনতাই গুরুত্বপূর্ণ
অস্টিওপোরোসিসকে শুধু বার্ধক্যের সমস্যা মনে করে অবহেলা করলে ঝুঁকি বাড়তে পারে। হাড়ের শক্তি ধরে রাখতে প্রয়োজন সুষম খাদ্য, নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম, পর্যাপ্ত পুষ্টি এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন।
হাড় দুর্বল হয়ে যাওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার চেয়ে আগেই সচেতন হওয়া বেশি কার্যকর। বিশেষ করে যাদের ঝুঁকি বেশি, তাদের নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী হাড়ের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা উচিত।
মনে রাখতে হবে, অস্টিওপোরোসিস শুধু বয়সের অপেক্ষায় থাকে না—সচেতনতার অভাবেও হাড় দুর্বল হওয়ার পথ তৈরি হতে পারে।
কেকে/সাশ