মোবাইল ফোনের আসক্তি, স্বল্পদৈর্ঘ্য ভিডিওর মোহ ও সোশ্যাল মিডিয়ার কৃত্রিম দুনিয়া ছাড়িয়ে তরুণ প্রজন্মকে বইয়ের পাতায় ফিরিয়ে আনার ঐতিহাসিক পাঠ-আন্দোলন চূড়ান্ত পর্ব অতিক্রম করল।
শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) শ্রীমঙ্গল উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে আয়োজিত ‘বইপড়া উৎসব ২০২৬’-এর চূড়ান্ত মূল্যায়ন পরীক্ষা ‘ফল’ সফলভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে।
এ দিন সকাল সাড়ে ৯টায় শহরের ঐতিহাসিক ভিক্টোরিয়া উচ্চবিদ্যালয় মিলনায়তনে এ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। পূর্ববর্তী দুই পর্ব পেরিয়ে চূড়ান্ত ‘ফল’ পর্বে উন্মুক্ত বিভাগসহ নির্বাচিত মোট ৭৬০ জন শিক্ষার্থী ও বইপ্রেমী এ মূল্যায়নী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন। পুরো আয়োজনটির সমন্বয়ে ছিল ‘শ্রীমঙ্গল আবৃত্তি উৎসব’ এবং সার্বিক সহযোগিতায় ছিল ‘উত্তরণ পাঠাগার’।
শুধু একটি আয়োজন ঘোষণা করেই থেমে থাকেনি উপজেলা প্রশাসন। শিক্ষার্থীদের কাছে বই পড়ার বার্তা পৌঁছে দিতে দুয়ারে দুয়ারে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পৌঁছে গেছে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগ। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিয়াউর রহমান নিজে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরেজমিনে উপস্থিত হয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেছেন, বই পড়ার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন এবং পাঠাভ্যাস গড়ে তুলতে উৎসাহিত করেছেন।
উপজেলার ৩৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রায় ২৫ হাজার শিক্ষার্থীকে নিয়ে ‘বই পড়ি, মনে গড়ি’ স্লোগানে গত ২১ জুলাই এ ব্যতিক্রমী উৎসবের সূচনা হয়। শিক্ষার্থীদের পাঠাভ্যাসকে একটি সুনির্দিষ্ট ও আনন্দময় অভিজ্ঞতায় রূপ দিতে পুরো আয়োজনকে তিনটি পর্বে ভাগ করা হয়েছিল—‘মুকুল’, ‘ফুল’ ও ‘ফল’।
গত ১৭ আগস্ট প্রথম পর্ব ‘মুকুল’-এ ২৫ হাজার শিক্ষার্থী একযোগে অংশ নেয়। এ পর্বে নির্বাচিত বই ছিল–আবদুল্লাহ আল-মুতী শরফুদ্দীনের আবিষ্কারের নেশায়, এপিজে আবদুল কালামের উইয়ংস অব ফায়ার, শাহেদ আলীর জিবরাইলের ডানা, জুল ভার্নের অ্যারাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড ইন এইটটিন ডেজ, হুমায়ুন আজাদের লাল নীল দীপাবলী, জর্জ অরওয়েলের অ্যানিমেল ফার্ম, মুহম্মদ আব্দুল হাইয়ের বিলেতে সাড়ে সাতশ দিন, কাজী নজরুল ইসলামের মরু-ভাস্কর ও মৃত্যুক্ষুধা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রাশিয়ার চিঠি, সৈয়দ মুজতবা আলীর দেশে বিদেশে, জহির রায়হানের আরেক ফাল্গুন, আনোয়ার পাশার রাইফেল রোটি আওরাত এবং বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আরণ্যক।
আয়োজক সূত্রে জানায়, নিরপেক্ষতা রক্ষায় এক প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষা অন্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালনা ও মূল্যায়ন করা হয়। প্রথম পর্ব থেকে উত্তীর্ণ ১ হাজার ৯৫৭ জন শিক্ষার্থী অংশ নেয় ২ ও ৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় পর্ব ‘ফুল’-এ।
ফুল পর্বে নির্বাচিত বই ছিল–আল মাহমুদের পা পাখির কাছে ফুলের কাছে, হুমায়ুন আজাদের ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না ও কতো নদী সরোবর, ডা. লুৎফর রহমানের উন্নত জীবন, সৈয়দ মুজতবা আলীর চাচা কাহিনী, আর্নেস্ট হেমিংওয়ের দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি, মুনির হাসানের ওরা ১১ বাংলার বিজ্ঞানী, সান জু-র দ্য আর্ট অব ওয়্যার, অদ্বৈত মল্লবর্মনের তিতাস একটি নদীর নাম, অ্যান ফ্রাঙ্কের দ্য ডায়েরি অফ এ ইয়ং গার্ল, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শেষের কবিতা, জগদীশ চন্দ্র বসুর অব্যক্ত, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবি এবং মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুতুল নাচের ইতিকথা।
সেখান থেকে বাছাইকৃতদের নিয়েই আজ ১৯ সেপ্টেম্বর আয়োজিত হয় চূড়ান্ত ‘ফল’ পর্ব। আজকের ‘ফল’ পর্বে অংশগ্রহণকারীরা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছেলেবেলা, ড্যানিয়েল ডিফোর রবিনসন ক্রুসো, জহির রায়হানের গল্পসমগ্র, হেক্টোর গার্সিয়া ও ফ্রান্সেস্ক মিরালসের ইকিগাই, পাওলো কোয়েলহোর দ্য আলকেমিস্ট, মাইকেল এইচ. হার্টের বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ১০০ মনীষীর জীবনী, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পথের পাঁচালী।
উৎসবকে সর্বজনীন রূপ দিতে যুক্ত করা ‘উন্মুক্ত বিভাগ’-এ শ্রীমঙ্গলে বসবাসরত ও কর্মরত বিভিন্ন পেশার দেড় শতাধিক বইপ্রেমী অংশ নেন। উন্মুক্ত বিভাগের জন্য নির্ধারিত কাজী নজরুল ইসলামের রাজবন্দীর জবানবন্দী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গোরা ও জসীমউদ্দীনের নকশী কাঁথার মাঠ বইগুলোর ওপর মূল্যায়নে অংশ নেন।
চুড়ান্ত মূল্যায়নের ভিত্তিতে প্রতিটি শ্রেণির সেরা ১০ জন শিক্ষার্থী এবং উন্মুক্ত বিভাগের সেরা পাঠকদের দেওয়া হবে বিশেষ শুভেচ্ছা উপহার, ক্রেস্ট, বই ও সনদপত্র। প্রতি ক্যাটাগরির সেরা আট পাঠকের জন্য ব্যক্তিগতভাবে আটটি ল্যাপটপ উপহার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন মৌলভীবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব মো. মজিবুর রহমান চৌধুরী। এ ছাড়া মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল ‘ফল’ পর্বের সকল প্রতিযোগীর জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বই উপহার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
এ দিকে আজকের চূড়ান্ত মূল্যায়নী পরীক্ষা ‘ফুল’ পর্বের কেন্দ্র পরিদর্শন করেন স্থানীয় সংসদ সদস্য আলহাজ্ব মজিবুর রহমান চৌধুরী, ইউএনও মো. জিয়াউর রহমান, সহকারী কমিশনার (ভূমি) মিনহাজুল ইসলাম, শ্রীমঙ্গল পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জহিরুল ইসলাম, উপজেলা এলজিইডি প্রকৌশলী আব্দুর রাকিব, শ্রীমঙ্গল থানার পুলিশ পরিদর্শক আব্দুর রাজ্জাক, উপজেলা বিএনপির আহবায়ক কমিটির সিনিয়র যুগ্ন আহ্বায়ক মো. ইয়াকুব আলী, উপজেলা যুবদল আহ্বায়ক মহিউদ্দিন জারু প্রমুখ।
কেকে/এআই