বিশ্ববাজারে তেলের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি সামাল দিতে জার্মানি ও ফ্রান্সকে তাদের জরুরি ডিজেল মজুত উন্মুক্ত করার নির্দেশ দিয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। এই নির্দেশ অমান্য করলে ইউরোপে মার্কিন ডিজেল রপ্তানি বন্ধ করে দেওয়ারও গোপন হুমকি দেওয়া হয়েছে।
আলোচনার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত তিনটি সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের বাজারে জ্বালানির দাম কমানোর জন্য বিশ্বজুড়ে বহুমুখী পদক্ষেপ নিচ্ছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইউরোপকে দেওয়া এই সতর্কবার্তাকে সেই প্রচেষ্টারই কঠোর রূপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
মার্কিন আলটিমেটাম :
জ্বালানি তেলের দাম কমাতে জার্মানি ও ফ্রান্সকে তাদের জরুরি ডিজেল রিজার্ভ ব্যবহারের আহ্বান জানিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন; অন্যথায় মার্কিন ডিজেল রপ্তানি বন্ধের হুমকি।
১২ কোটি ব্যারেল সরবরাহের দাবি
আগামী ছয় মাসের মধ্যে ইইউকে অন্তত ১২ কোটি (১২০ মিলিয়ন) ব্যারেল ডিজেল বাজারে ছাড়তে বলেছে যুক্তরাষ্ট্র।
ইউরোপের দ্বিধাদ্বন্দ্ব :
তড়িঘড়ি করে নিজস্ব জরুরি মজুত ব্যবহার করলে মধ্যপ্রাচ্য সংকট আরও ঘনীভূত হলে ইউরোপে তীব্র জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা করা হচ্ছে।
জি-৭ আলোচনার উদ্যোগ :
জ্বালানি সংকট নিরসনে ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সির (আইইএ) সঙ্গে সমন্বয় করে জি-৭ নেতাদের ভার্চুয়াল বৈঠক আহ্বানের উদ্যোগ নিচ্ছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ।
বাণিজ্য শুল্ক ও সামরিক খাতে খরচ বাড়ানো নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সম্পর্ক আগে থেকেই কিছুটা উত্তপ্ত। এর মধ্যে ডিজেল রিজার্ভ ছাড়ার এই নতুন দাবি যুক্তরাষ্ট্র ও বেলজিয়াম সম্পর্কে টানাপোড়েন আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
এর পূর্বে জরুরি তেল ও জ্বালানি পণ্য ছাড়ার যে অঙ্গীকার ফ্রান্স ও জার্মানি করেছিল, তা বাস্তবায়নে তারা ব্যর্থ হয়েছে বলে মনে করছে যুক্তরাষ্ট্র। আর এতে ট্রাম্প প্রশাসন প্রচণ্ড অসন্তুষ্ট।
যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘পণ্য সরবরাহ বাড়ানো এবং গ্রাহকদের জন্য খরচ কমানোর লক্ষে আমরা একাধিক উপায় খুঁজছি। এমন সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইউরোপের একযোগে কাজ করাই তাদের নিজস্ব স্বার্থের জন্য সবচেয়ে অনুকূল হবে।’
দ্বিতীয় একটি ইউরোপীয় সূত্র নিশ্চিত করেছে, ওয়াশিংটন পরবর্তী ছয় মাসের মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নকে তাদের রিজার্ভ থেকে ১২ কোটি ব্যারেল ডিজেল বাজারে ছাড়ার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ জানিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এমন প্রস্তাবে ইউরোপীয় কমিশন এবং ইইউভুক্ত ২৭টি দেশ বড় ধরনের দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়েছে। একদিকে ঘরোয়া বাজারে ডিজেলের দাম কমানোর চাপ, অন্যদিকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সংঘাত কোনো সমঝোতা ছাড়া আরও বড় যুদ্ধের দিকে গড়ালে ইউরোপে তীব্র জ্বালানি সংকট তৈরির ঝুঁকি রয়েছে।
পরিস্থিতি পর্যালোচনা করতে শুক্রবার (২ অক্টোবর) ইউরোপীয় কমিশনের এনার্জি টাস্কফোর্স জরুরি বৈঠকে বসার কথা রয়েছে। এর আগে বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) ফ্রান্স, জার্মান, ইতালি, যুক্তরাজ্য ও আয়ারল্যান্ডের কর্মকর্তাদের নিয়ে একদফা আলোচনা পরিচালনা করেছে ইউরোপীয় কমিশন।
এদিকে, জার্মানির অর্থ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে চাপ থাকলেও আইইএ (ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি) এখনো জার্মানিকে তাদের নিজস্ব রিজার্ভ ছাড়ার আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো নির্দেশ দেয়নি।
ইউক্রেন যুদ্ধের জেরে রুশ তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে সাম্প্রতিক যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় ইউরোপ এখন অনেকাংশেই মার্কিন জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
এর বাইরে আরও কিছু কারণে বৈশ্বিক ডিজেল বাজারে চাপ সৃষ্টি হয়েছে। এর মধ্যে— ইউক্রেনের বিমান হামলায় একাধিক শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় রাশিয়া চলতি অক্টোবরের শেষ পর্যন্ত ডিজেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা বজায় রেখেছে। নিজস্ব বাজার সুরক্ষিত রাখতে অক্টোবরের শুরুতে চীনও সাময়িকভাবে জ্বালানি রপ্তানি স্থগিত করেছে।
সামনে শীতকালে ঘর গরম করার জন্য তেল-গ্যাসের চাহিদা এবং ফসল কাটার মৌসুম শুরু হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি মন্ত্রী ক্রিস রাইট বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারে আরও ডিজেল সরবরাহ করার জন্য এখনই উপযুক্ত সময় এবং সেই রিজার্ভ ইউরোপের কাছে রয়েছে। ঐক্যবদ্ধভাবে ডিজেল মজুত উন্মুক্ত করার মধ্য দিয়ে তারা বাজারের চাপ কমাতে পারে বলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে পোস্ট করে মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট জানান, আইইএর মার্চ মাসের চুক্তির অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যেই তাদের প্রতিশ্রুতি পূরণ করে ১৭২ মিলিয়ন ব্যারেল তেল ছেড়েছে। এখন মিত্র দেশগুলোকেও কথায় নয়, কাজে তা প্রমাণ করতে হবে।
তবে ফ্রান্সের জ্বালানি মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টের সরকারি বাসভবন এলিসি প্রাসাদের এক কর্মকর্তা জানান, সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে প্রেসিডেন্ট মাখোঁ ও ট্রাম্পের মধ্যে বৈঠক হলেও বিষয়টি নিয়ে সরাসরি কথা হয়নি।
তবে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) সঙ্গে সমন্বয় করে বিশ্বজুড়ে তেলের দাম ও সরবরাহ নিশ্চিত করতে জি-৭ ভুক্ত দেশগুলোর শীর্ষ নেতাদের নিয়ে জরুরি ভিডিও কনফারেন্স ডাকার পরিকল্পনা করছেন।
সূত্র : রয়টার্স
কেকে/এমএ