শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬,
২৫ আশ্বিন ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬
শিরোনাম: ● আবুধাবি টেস্ট : স্বস্তিতে দিন শেষ আফগানিস্তানের      ● প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব ও বিনিয়োগকে অগ্রাধিকার : হুমায়ুন কবির      ● ডেঙ্গু প্রাণ নিলো আরও চারজনের, হাসপাতালে নতুন ভর্তি ১৬৩১      ● আমিরাতে ত্রিদেশীয় সিরিজের দল ঘোষণা বাংলাদেশের      ● হাম উপসর্গে আরও আট শিশুর মৃত্যু, হাসপাতালে নতুন ভর্তি ১০৮৬      ● ৪০ মিনিট বন্ধ থাকার পর খুলল শাহজালাল বিমানবন্দরের রানওয়ে      ● মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আটক       
স্বাস্থ্য
সমন্বিত উদ্যোগ ও সঠিক পরিকল্পনায় প্রারম্ভিক শিশু বিকাশের বার্তা ছড়িয়ে দিতে হবে
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশ: শনিবার, ১০ অক্টোবর, ২০২৬, ৯:১৯ পিএম
ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

শিশুর জন্মের পর প্রথম আট বছর তার বিকাশে সঠিক পুষ্টি ও যত্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর জন্ম-পরবর্তী প্রথম এক হাজার দিনকে বলা হয় সোনালি দিন (গোল্ডেন ডেজ) । এ সময়ে পুষ্টি, শিক্ষা ও সুরক্ষার মাধ্যমে শিশুর বিকাশের ভিত্তি তৈরি হয়। প্রসব-পূর্ববর্তী সেবা নিতে আসা মায়েদের এ সময়ে প্রয়োজনীয় খাদ্য, সেবা ও নিরাপদ প্রসব সম্পর্কে পরামর্শ দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

প্রারম্ভিক শিশু বিকাশের প্রয়োজনীয়তা অভিভাবক, পরিবার ও সমাজের মধ্যে গুরুত্বসহকারে তুলে ধরতে হবে। প্রারম্ভিক শিশু বিকাশের গুরুত্ব কী এবং কোন কোন বিষয় শিশুর ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে— এসব তথ্যও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দিতে হবে।

বাংলাদেশে শূন্য থেকে আট বছর বয়সের মধ্যে শিশুর মস্তিষ্কের দ্রুত প্রারম্ভিক বিকাশ ঘটে। এ সময়ে বিনিয়োগ করলে ভবিষ্যতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মানসিক সুস্থতা, উৎপাদনশীলতা ও আয় বৃদ্ধি— সব ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।

শিশুরা জাতির ভবিষ্যৎ। কাজেই একটি টেকসই সমাজ গড়তে হলে আমাদের শুরুটা করতে হবে শিশুদের থেকেই। তাদের যথাযথ বিকাশে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া শুধু পরিবারের নয়, সবার দায়িত্ব। শিশুদের মধ্যে ভাগাভাগি, যত্ন ও সহমর্মিতার মূল্যবোধ গড়ে তুলতে হবে।

কিন্তু আমরা অনেক সময় ভুল খাদ্যাভ্যাস তৈরি করি। ছোট শিশুকে অস্বাস্থ্যকর খাবারের সঙ্গে পরিচিত করি। এসব বিষয়ে পরিবারকে সচেতন করতে হবে। প্রারম্ভিক শিশু বিকাশকে (ইসিডি) সমন্বিতভাবে দেখতে হবে। শিশুর বিকাশ চাইলে আগে তাকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে, আর শিশুকে ভালো রাখতে হলে মাকেও ভালো রাখতে হবে।

বাংলাদেশে শিশুর প্রারম্ভিক যত্ন ও বিকাশের (ইসিসিডি) সমন্বিত নীতি-২০১৩ অনুযায়ী, শিশুর প্রারম্ভিক যত্ন ও বিকাশ হচ্ছে প্রতিটি শিশুর বেঁচে থাকা, সুরক্ষা, যত্ন, বিকাশ ও শিক্ষার অধিকার বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় সব সহায়তা দেওয়া, যা শিশুর ভ্রুণ অবস্থা থেকে কাঙ্ক্ষিত বিকাশ নিশ্চিত করবে।

নীতিমালায় বলা হয়েছে, এ কার্যক্রম বাস্তবায়নে মোট ১৫টি মন্ত্রণালয় বিভিন্নভাবে সম্পৃক্ত থাকবে। এগুলো বাস্তবায়নে আমরা সরকার ও অংশীদারদের সঙ্গে এক হয়ে কিছুটা এগোতে পেরেছি। কিন্তু নীতিগুলো পুরোপুরি কার্যকর করতে দরকার শক্ত নেতৃত্ব ও অঙ্গীকার, যা নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকেই আসতে হবে।

বাংলাদেশ সরকার এই খাতকে গুরুত্ব দিয়েছে। এ ক্ষেত্রে শিশুর প্রারম্ভিক যত্ন ও বিকাশের সমন্বিত নীতি-২০১৩ একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। পাশাপাশি মাতৃস্বাস্থ্য, শিশুস্বাস্থ্য, পুষ্টি, প্রাক্-প্রাথমিক শিক্ষা, প্যারেন্টিং ও সামাজিক সুরক্ষা খাতের বিভিন্ন কর্মসূচি রয়েছে।

প্রারম্ভিক শিশু বিকাশসংক্রান্ত কার্যক্রম উন্নয়ন প্রকল্প বা ডেভেলপমেন্ট বাজেটের ওপর নির্ভরশীল। ধীরে ধীরে এই সেবাগুলো সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠানের রাজস্ব বাজেটের আওতায় সরকারি নিয়মিত কার্যক্রম হিসেবে গ্রহণ করা গেলে সেগুলোর টেকসই বাস্তবায়নের সুযোগ অনেক বেশি তৈরি হবে।

নতুন কিছু যুক্ত করার সময়ও বাস্তবসম্মতভাবে ভাবা প্রয়োজন। বিদ্যমান দায়িত্ব ও সেবাকাঠামোর মধ্যেই প্রারম্ভিক শিশু বিকাশের সেবাগুলো অন্তর্ভুক্ত করা যায়। উদাহরণস্বরূপ- প্যারেন্টিং সাপোর্ট, প্রাথমিক উদ্দীপনা বা শিশু বিকাশসংক্রান্ত বার্তাগুলো যদি বিদ্যমান স্বাস্থ্যসেবা, প্রাক্-প্রাথমিক শিক্ষা বা কমিউনিটি পর্যায়ের সেবার সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তাহলে আলাদা কোনো নতুন কাঠামো তৈরি না করেই তা অনেক বেশি কার্যকরভাবে এবং বৃহত্তর পরিসরে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হতে পারে।

গবেষণা, বাস্তব অভিজ্ঞতা ও নীতিনির্ধারণ— এই তিন দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয় প্রারম্ভিক শিশু বিকাশ কার্যক্রমকে আরও কার্যকরভাবে এগিয়ে নিতে বাস্তবসম্মত অগ্রাধিকার নির্ধারণে সহায়তা করবে।

ইউনিসেফের এডুকেশন ম্যানেজার মো. ইকবাল হোসেন বলেন, ‘প্রকল্পভিত্তিক কাজ থেকে বেরিয়ে জাতীয় কর্মসূচিতে যেতে হবে। স্থায়ী বাজেটের মধ্যে ধাপে ধাপে সব শিশুকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এটি বহু খাতভিত্তিক উদ্যোগ, তাই সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন জরুরি। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকারকে যুক্ত করতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের দেশে বহু প্রতিষ্ঠান আছে, তাদের সদিচ্ছা ও সক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু কার্যক্রম না থাকলে প্রশিক্ষণ কাজে লাগে না। তাই স্পষ্ট কর্মসূচি, নেতৃত্ব ও জবাবদিহির বিকল্প নেই। প্রয়োজনীয় শিশু অধিদপ্তর গঠন, জাতীয় কারিগরি ও সমন্বয় কমিটির নিয়মিত বৈঠক এবং রাজনৈতিক অঙ্গীকার নিশ্চিত করতে হবে।’

ইকবাল হোসেন বলেন, ‘আমি একটি নির্দিষ্ট জায়গায় ফোকাস করতে চাই— নীতি, তার বাস্তবায়ন ও অগ্রাধিকার। ২০১৩ সালে দেশে একটি সমন্বিত ইসিডি নীতি অনুমোদিত হয়েছে। আজ ১৪ বছর পরও আমরা কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি দেখতে পাচ্ছি না। এই নীতিতে ১৫টি মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা নির্ধারিত। জাতীয় থেকে স্থানীয় পর্যায় পর্যন্ত সমন্বয় কাঠামো আছে, এমনকি প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে জবাবদিহির ব্যবস্থাও রাখা হয়েছিল। এরপরও বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি।’

তার মতে, বড় সমস্যা হলো আমরা প্রারম্ভিক শিশু বিকাশকে একটি প্রোগ্রাম হিসেবে দেখি, নীতি হিসেবে নয়। স্বাস্থ্যনীতি বাস্তবায়নে যেমন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পূর্ণ দায় থাকে, শিক্ষানীতির ক্ষেত্রেও তেমন। কিন্তু প্রারম্ভিক শিশু বিকাশের ক্ষেত্রে কে নেতৃত্ব দেবে, কে  সমন্বয় করবে— এই বোঝাপড়াটাই এখন পর্যন্ত দুর্বল।

তিনি বলেন, ‘অথচ এটি একটি বহু খাতভিত্তিক নীতি, যেখানে সমন্বয়কারী সংস্থা, বাস্তবায়নকারী সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর নির্দিষ্ট ভূমিকা থাকা জরুরি। এই সমন্বয়ের ক্ষেত্রে গত ১৩ বছরে অনেক ঘাটতি দেখা গেছে।’

জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের সহকারী পরিচালক ও বিভাগীয় প্রধান (ল্যাব) শ্যামল কুমার রায় বলেন, ‘আমরা আগে মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র থেকে কাজ করতাম, এখন সেটি কমিউনিটি ক্লিনিকের আওতায় এসেছে। এই ক্লিনিকগুলো গ্রামাঞ্চলে প্রতি ছয় হাজার মানুষের কাছে সেবা পৌঁছানোর চেষ্টা করছে। মাঝখানে কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও বর্তমানে আবার চালু হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘নীতির দিক থেকে আমাদের অনেক কিছুই আছে, সংবিধানেও স্বাস্থ্য ও পুষ্টির কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবায়নই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। নতুন নীতির চেয়ে আমাদের উচিত এখন থেকেই বিদ্যমান নীতিগুলো সমন্বয় ও কার্যকর করা।’

পুষ্টি খাতে কাজ করতে গিয়ে শ্যামল কুমার রায় দেখেছেন, প্রান্তিক মানুষের মধ্যে সচেতনতার অভাব রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, এই সেবা তাদের জন্য নয়। তাদের জানাতে হবে— এটি তাদের অধিকার।

তিনি বলেন, ‘মাতৃসেবার শুরু প্রসব-পূর্ব সেবা (এএনসি) চেকআপ থেকে। সেখানে পুষ্টি, খাদ্যাভ্যাস, টিকা, শারীরিক পরিবর্তন, শিশু বিকাশ—সব বিষয়ে কাউন্সেলিং দেওয়া সম্ভব। এরপর নিরাপদ প্রসব, পোস্টনেটাল চেকআপ ও শিশুর টিকাদান— সবই ধারাবাহিকভাবে নিশ্চিত করতে হবে।’

আইসিডিডিআরবির মাতৃ ও শিশু পুষ্টি বিভাগের বিজ্ঞানী ফাহমিদা তোফায়েল বলেন, ‘আমার দৃষ্টিতে প্রারম্ভিক শিশু বিকাশ একটি বহুমাত্রিক বিষয়। একক কোনো উপাদান দিয়ে এটিকে ব্যাখ্যা বা সমাধান করা যায় না। শিশুর প্রারম্ভিক যত্ন ও বিকাশ পাঁচটি উপাদান দিয়ে বিষয়টি ধরার চেষ্টা করেছে, কিন্তু বাস্তবে আমাদের অনেক কর্মসূচি এই সবগুলো উপাদান পূরণ করতে পারে না। অর্থায়ন ও কাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও এখানে কাজ করে।’

তিনি আরও বলেন, ‘গর্ভকালীন আমাদের বেশি জোর দিতে হবে। গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুর বিকাশের ক্ষেত্রে গর্ভকালীন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গর্ভধারণের শুরু থেকেই মস্তিষ্কের দ্রুত বিকাশ ঘটে এবং জন্মের পর তিন বছর পর্যন্ত প্রতি সেকেন্ডে বিপুল সংযোগ তৈরি হয়। এখানে মায়ের প্রস্তুতির পাশাপাশি পুরো পরিবারের প্রস্তুতিও জরুরি।’

‘বিশেষ করে মাতৃকালীন মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি আমরা গবেষণায় গুরুত্বসহকারে দেখেছি। আমার মনে হয়, এটি প্রসব-পূর্ব সেবার সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব, যা বাস্তবায়নের দিক থেকেও কার্যকর হতে পারে।’

আলাদা নতুন কর্মসূচি নেওয়ার পরিবর্তে বিদ্যমান অবকাঠামো যেমন কমিউনিটি ক্লিনিক, পুষ্টি কর্মসূচি বা সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি—এসবের মধ্য দিয়েই বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা বেশি বাস্তবসম্মত। তবে এর জন্য কর্মসূচিগুলোকে সহজ, প্রশিক্ষণযোগ্য ও বাস্তবায়নযোগ্য হতে হবে। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন খাতের মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করাও জরুরি।

কেকে/এমএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  প্রারম্ভিক শিশু বিকাশ   ইসিসিডি নীতি ২০১৩   গোল্ডেন ডেজ   গর্ভকালীন যত্ন   শিশু পুষ্টি   সমন্বিত সেবা  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

স্বাস্থ্য- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close