মানসিক স্বাস্থ্য বর্তমান সময়ে একটি প্রকট ও অবহেলিত জনস্বাস্থ্য সমস্যা, যা প্রায়ই ‘নীরব মহামারি’ হিসেবে আলোচিত হয়। দেশে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভোগা প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৯ জনেরও বেশি (প্রায় ৯২% এর বেশি) মানুষ তেমন কোনো চিকিৎসাসেবা পান না। আবার সমাজের একটি অংশ মানসিক রোগকে দুর্বলতা, লজ্জা বা হীনমন্যতার বিষয় মনে করে। এসব কারণে প্রয়োজনীয় সচেতনতার অভাব মানুষকে সঠিক সেবা নিতে ভেতর থেকে বাধা দেয়। কিন্তু এটিই এখনকার সমাজে বাস্তবতা হওয়ার কথা নয়। অবশ্যই এই ব্যবধান কমাতে বড় ধরনের উদ্যোগ নিতে হবে। এজন্য পরিবার, সমাজ, সরকারসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে আসতে হবে।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাম্প্রতিক তথ্যমতে, বাংলাদেশের মানসিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। দেশের প্রায় ১৬.৮ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক এবং ১২.৬ শতাংশ শিশু ও কিশোর-কিশোরী কোনো না কোনো মানসিক রোগে ভুগছেন। সংখ্যার হিসাবে যা প্রায় ৩ কোটির কাছাকাছি। এর মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে বিষণ্নতা এবং উদ্বেগ। গ্রামীণ নারী ও শিশুদের ক্ষেত্রে এ হার আরও বেশি। সময় এসেছে এই পরিসংখ্যান ভেঙে দেওয়ার। কারণ, এই আধুনিক সময়ে অসচেতনতা, সামাজিক ট্যাবু বা অবৈজ্ঞানিক তত্ত্বকে প্রশ্রয় দেওয়া মানে আবারও পিছিয়ে পড়া। সমাজকে পেছনে টেনে নেওয়া। এ কথাও সত্য পরিবারে থাকা একজন রোগীকে নিয়ে তার পরিস্থিতি সামাল দেওয়াটাও কষ্টের।
এক্ষেত্রে পরিবার বা সমাজের কেউ মানসিক কষ্টে থাকলে তার মনের কথা আগে শুনতে হবে। তাকে কথা বলার নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করে দিতে হবে। তারা অভিভাবক খুঁজে পান। বন্ধু খুঁজে পান। হুমকি, হতাশা বা অসহায়ত্বের মতো বিষয়গুলো থেকে তাদের মুক্ত পরিবেশ তৈরি করে দেওয়াটা জরুরি। এ কারণেই বলা হয়, যারা মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, তাদের নিয়ে কথা না বলে তাদের কথা শুনুন, তাদের বোঝার চেষ্টা করুন। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় তাদের যুক্ত করাটা আরও ভালো। রোগীকে কোনোভাবেই তার পেছনের কার্যক্রম নিয়ে ব্যক্তিগত আক্রমণ করা, পরিবারের বোঝা মনে করে এরকম আচরণ করা কোনোভাবেই কাম্য নয়। এতে ওই রোগীর মধ্যে বিরূপ মনোভাব তৈরি হয়।
মৌলিক সমস্যার মধ্যে চিকিৎসার পরিবেশ, হাসপাতালের সংখ্যা ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ নিয়েও আশঙ্কার জায়গা রয়েছে। বেসরকারি সংস্থা মাইন্ডস্পেসের তথ্যমতে, ১৭ কোটির বেশি মানুষের এই দেশে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সংখ্যা একেবারেই নগণ্য। প্রতি ১ লাখ মানুষের জন্য মাত্র ০.২১ জন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ এবং ০.৪২ জন ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট রয়েছেন, যার একটি বড় অংশই আবার ঢাকাকেন্দ্রিক। ফলে একটি পরিবার চাইলেও যে কোনো সময় যে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে না।
এক্ষেত্রে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায় রয়েছে। সরকারকে অবশ্যই পর্যাপ্ত মানসিক চিকিৎসালয়, পর্যাপ্ত স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বাড়ানোসহ এ জাতীয় সেবা আরও সহজ করতে হবে। প্রতিটি ভুক্তভোগী যেন পরিবার, সরকার, সমাজ ও নানা প্রতিষ্ঠানকে বন্ধু হিসেবে পাশে পান। সেই উদ্যোগ আমাদের সমাজ ও সরকারকে অবশ্যই নিতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা হলো- সমাজের সবাইকে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার ব্যাপক পরিবর্তনে চিন্তার পরিসর বাড়াতে হবে। আর এসব আন্তরিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই সূচিত হবে পরিবর্তনের নতুন পথ।
কেকে/এআই