দেশে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি ও দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে সরকারের নানা উদ্যোগ থাকলেও চাঁদাবাজি, দখলদারত্ব ও নিরাপত্তাহীনতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। জমি কেনা, কারখানা স্থাপন, পণ্য পরিবহন থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র ব্যবসা পরিচালনা পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে অবৈধ অর্থ আদায়ের অভিযোগে বাড়ছে ব্যবসার ব্যয়।
এতে উদ্যোক্তাদের মধ্যে নতুন বিনিয়োগ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে, বাধাগ্রস্ত হচ্ছে ব্যবসা সম্প্রসারণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার সন্দেহভাজন চাঁদাবাজদের তালিকা তৈরি ও অভিযান জোরদারের উদ্যোগ নিলেও মাঠপর্যায়ে আইন প্রয়োগের ধীরগতি এবং রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগে কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
ব্যবসায়ীদের মতে, চাঁদাবাজি বন্ধে নিরপেক্ষ আইন প্রয়োগ, প্রশাসনিক জবাবদিহি ও নিরাপদ ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করা না গেলে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে কাঙ্ক্ষিত গতি ফিরবে না।
ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, অনানুষ্ঠানিক খরচ বাড়তে থাকলে উৎপাদন ব্যাহত হবে, পণ্যের দাম বাড়বে এবং নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত পিছিয়ে যাবে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছেও দেশের ব্যবসায়িক পরিবেশ সম্পর্কে নেতিবাচক বার্তা যাবে। ফলে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর লক্ষ্য অর্জনে চাঁদাবাজি দমনে কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি বলে মনে করছেন তারা।
চাঁদাবাজির পরিস্থিতি নিয়ে চলতি বছরের শুরুর দিকে উদ্বেগ প্রকাশ করে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)। সংগঠনটির সভাপতি তাসকিন আহমেদ অভিযোগ করেন, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ব্যবসা ও সরবরাহব্যবস্থার বিভিন্ন পর্যায়ে চাঁদাবাজি ২০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। কারখানা থেকে পণ্য সরবরাহ, সড়ক ও নৌপথে পরিবহনসহ বিভিন্ন পর্যায়ে ব্যবসায়ীদের অবৈধ অর্থের দাবি মোকাবিলা করতে হচ্ছে বলে তিনি জানান।
ডিসিসিআইয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, চাঁদাবাজি বন্ধ না হলে কোনো কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পক্ষে কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে। সংগঠনটি নতুন সরকারের কাছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার দাবি জানায়।
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর বাড়তি চাপ
চাঁদাবাজির সবচেয়ে বড় চাপের মুখে রয়েছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। রাজধানীর বিভিন্ন বাজার, ফুটপাত, পরিবহনকেন্দ্র ও দোকানপাটে নিয়মিত চাঁদা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। দোকানভাড়া, কর্মচারীদের বেতন, বিদ্যুৎ বিল ও পণ্যের খরচ মেটানোর পর চাঁদার অতিরিক্ত বোঝা বহন করতে গিয়ে অনেক ব্যবসায়ী আর্থিক সংকটে পড়ছেন। কেউ কেউ ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে বাধ্য হয়ে অবৈধ অর্থের দাবি মেনে নিচ্ছেন। আবার দাবি পূরণে অস্বীকৃতি জানালে হুমকি, হয়রানি কিংবা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলার আশঙ্কা করছেন তারা।
মিরপুর ১০ নাম্বার একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আব্দুল সালাম বলেন, ‘দোকানভাড়া, কর্মচারীর বেতন আর মালামাল কেনার খরচ দিতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। এর মধ্যে বিভিন্ন নামে চাঁদা দাবি করা হলে ব্যবসা চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। চাঁদা না দিলে ঝামেলায় পড়ার ভয় থাকে। আমরা চাই, প্রশাসন আমাদের নিরাপত্তা দিক।’
রাজধানীর গুলিস্তানের ফুটপাতের ব্যবসায়ী বলেন, ‘প্রতিদিন যা আয় হয়, তার বড় অংশই দোকানের মালামাল কেনা ও সংসারের খরচে চলে যায়। এর মধ্যে বাড়তি টাকা দিতে হলে লাভ থাকে না বললেই চলে। পরিবার নিয়ে বেঁচে থাকার জন্য ব্যবসা করি, কিন্তু নিরাপদে ব্যবসা করতে পারব কি না, সেই চিন্তায় থাকতে হয়।’
রাজধানীর কারওয়ান বাজারের ক্ষুদ্র পাইকারি ব্যবসায়ীরা বলছেন, ‘পণ্য কেনা থেকে পরিবহন করে দোকানে পৌঁছানো পর্যন্ত নানা খরচ রয়েছে। এর বাইরে কোথাও অবৈধ টাকা দিতে হয়, ফলে পণ্যের দাম বাড়ানো ছাড়া উপায় থাকে না। শেষ পর্যন্ত এর চাপ ক্রেতাদের ওপরও পড়ে। চাঁদাবাজি বন্ধ হলে ব্যবসার খরচ কমবে।’
ব্যবসায়ীরা বলছেন, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সুরক্ষা এবং চাঁদাবাজিমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে কার্যকর নজরদারি ও দ্রুত আইনি ব্যবস্থা প্রয়োজন।
চাঁদাবাজির ভয়ে নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা
চাঁদাবাজি ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে দেশে নতুন বিনিয়োগের পরিবেশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, কারখানার ফটক থেকে পণ্য পরিবহন, জমি কেনা ও ব্যবসা সম্প্রসারণের বিভিন্ন পর্যায়ে অবৈধ অর্থের দাবি তাদের পরিচালন ব্যয় বাড়াচ্ছে। এতে নতুন প্রকল্পে অর্থ বিনিয়োগের আগে উদ্যোক্তাদের ঝুঁকি নিয়ে বাড়তি হিসাব করতে হচ্ছে।
বেসরকারি খাতের ব্যবসায়ী নেতারা চাঁদাবাজি, দুর্বল আইনশৃঙ্খলা, প্রশাসনিক জটিলতা ও নীতিগত অনিশ্চয়তাকে ব্যবসা ও নতুন বিনিয়োগের বড় বাধা হিসেবে দেখছেন। বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট অনুযায়ী, দেশে বেসরকারি বিনিয়োগ দুর্বল এবং প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগও কম। ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলো উচ্চ নিয়ন্ত্রক ব্যয়, অবকাঠামোগত সমস্যা ও অর্থায়নের সীমাবদ্ধতায় রয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, চাঁদাবাজির কারণে ব্যবসার অনিশ্চিত ব্যয় বাড়লে উদ্যোক্তারা নতুন কারখানা স্থাপন বা উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিতে পারেন। এতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই নতুন বিনিয়োগ বাড়াতে চাঁদাবাজি দমন, ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ জরুরি।
চাঁদাবাজি দমনে কঠোর সরকার
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে সরকার রাজধানী থেকে শুরু করে সারা দেশে সন্দেহভাজন চাঁদাবাজ ও অপরাধীদের তালিকা তৈরি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত অভিযান জোরদার করেছে। পুলিশ, বিশেষ রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি), বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও আনসারের সমন্বিত অভিযান পরিচালনা করছে। অপরাধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো সদস্যের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধেও বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
গত বুধবার রাতে চাঁদাবাজির অভিযোগে আদাবর থানা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মো. নয়ন হোসেনকে আটক করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। পুলিশের কয়েকজন কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, আদাবর এলাকায় সিটি করপোরেশনের পয়োনিষ্কাশন ও ড্রেনেজ উন্নয়নকাজে বাধা দেওয়া এবং ভবনমালিকদের কাছে চাঁদা দাবির অভিযোগ রয়েছে নয়নের বিরুদ্ধে।
এ ছাড়া রাজধানীর মিরপুরে চাঁদাবাজি, জুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ, প্লট-ফ্ল্যাট দখল ও কিশোর গ্যাং পরিচালনার অভিযোগে গতকাল তিন ভাইকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পুলিশের দাবি, তারা ‘ফোর স্টার গ্রুপ’ নামে পরিচিত স্থানীয় একটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।
মিরপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাফিজুর রহমান জানান, গ্রেপ্তার জয় মিরপুরের শীর্ষ সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত মফিজুর রহমান মামুনের হয়ে চাঁদা আদায়, জুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ, বিভিন্ন প্লট ও ফ্ল্যাট দখল এবং ফুটপাত নিয়ন্ত্রণের কাজে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে।
রাজধানীতে চাঁদাবাজির একাধিক ঘটনার পর ৫৪৫ জন সন্দেহভাজন চাঁদাবাজের তালিকা তৈরি করেছে সরকার। বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ তালিকা তৈরি করেছে বলে মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানিয়েছে। তালিকা অনুযায়ী অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ঢাকা মহানগর পুলিশকে (ডিএমপি) নির্দেশ দেওয়া হলেও এখনো পুরোদমে অভিযান শুরু হয়নি। তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারের পর কী আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা না থাকায় পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে দ্বিধা রয়েছে। তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা রয়েছে, এমন ব্যক্তিও রয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে কোনো ধরনের প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক জটিলতায় পড়তে হবে কি না, তা নিয়ে মাঠপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে সংশয় রয়েছে।
বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর দ্বিতীয়বারের মতো সন্দেহভাজন চাঁদাবাজদের এমন তালিকা তৈরি করা হলো। এর আগে ডিএমপি ১ হাজার ২০০ জনের বেশি সন্দেহভাজন চাঁদাবাজের একটি তালিকা তৈরি করেছিল। চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে তালিকা তৈরির পাশাপাশি অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত ও কার্যকর আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কেকে/ এমএস