মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬,
১১ কার্তিক ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬
শিরোনাম: ● বাংলাদেশ-জাপান বন্ধুত্বকে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে রূপ দিতে চান তারেক রহমান      ● টোকিওতে তারেক রহমানকে উষ্ণ অভ্যর্থনা তাকাইচির      ● সীতাকুণ্ডে লরিচাপায় শিশুসহ নিহত ৫      ● বাংলাদেশে ৬৩৫ কোটি ডলারের বেসরকারি বিনিয়োগের উদ্যোগ জাপানের      ● ক্রসফায়ার বলতে বিচারবহির্ভূত হত্যা বোঝাননি আইজিপি : পুলিশ সদরদপ্তর      ● অতি প্রবল হয়ে উঠছে ঘূর্ণিঝড় অর্ণব, গতিবেগ হতে পারে ১২০-১৪০ কিমি      ● রাষ্ট্রায়ত্ত তিন ব্যাংকে নতুন এমডি নিয়োগ      
বেগম রোকেয়া
তিন জোড়া কবুতর থেকে স্বপ্না রানীর এখন গরু খামার
মো. এহসানুল হক, মৌলভীবাজার
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:৩২ এএম
ছবি: প্রতিবেদক

ছবি: প্রতিবেদক

একটি ছোট্ট ডাক দিতেই ছানাদের নিয়ে ঘর থেকে ছুটে এল মুরগি। একটু দূরে ডানা মেলে ওড়ার প্রস্তুতি নিল মোরগ। আর উঠানের এদিক- সেদিক ছড়িয়ে থাকা কবুতরগুলোও পরিচিত সেই ডাক শুনে ডেকে উঠল ঝাঁকে ঝাঁকে, এরপর ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে এসে ভিড় জমাল বারান্দায়। যাদের ভালোবাসার ডাকে এই অবুঝ প্রাণীরা মুহূর্তেই ছুটে এল, তিনি স্বপ্না রানী সরকার (৪০)। ছোট ছোট উদ্যোগ আর হাড়ভাঙা পরিশ্রমে তিল তিল করে গড়ে তোলা নিজের সফল সংসারটি এভাবেই পরম মমতায় ঘুরে ঘুরে দেখাচ্ছিলেন এই সংগ্রাী নারী। 

মৌলভীবাজার সদর উপজেলার বীরগাঁও গ্রামে পা রাখতেই চোখে পড়ে স্বপ্নার সাজানো-গোছানো কর্মতৎপরতা। গ্রামের পাকা সড়কের পাশেই তার টিনশেডের আধাপাকা ঘর। স্বপ্নার স্বামীর চার ভাইয়ের ঘর পাশাপাশি অবস্থতি হলেও এই উঠান যেন স্বপ্নার নিজের হাতের জাদুতে আলাদা এক প্রাণচাঞ্চল্য পেয়েছে। উঠানের একপাশে পুকুরপাড়ের একচালার নিচে বাঁধা চারটি গরু পরম আয়েশে ঘাস চিবুচ্ছে—সব মিলিয়ে এক গ্রামীণ সচ্ছলতার জীবন্ত ছবি।

হাতখরচের তাগিদে প্রথম উদ্যোগ : 

প্রায় ২০ বছর আগে এসএসসিতে অকৃতকার্য হওয়ার পরই স্বপ্নার বিয়ে হয়। তার বাবার বাড়ি শ্রীমঙ্গল উপজেলার কালাপুর ইউনিযনের ভৈরবগঞ্জে (মাজদিহী) গ্রামে। স্বামী অবোধ সরকার পেশায় কৃষিজীবী। নিজেদের ৩০ শতাংশ জমির পাশাপাশি অন্যের জমিও বর্গা চাষ করেন তিনি। সংসারে এসে স্বপ্না রানী সরকার বুঝতে পারেন, স্বামীর একাজ ও আয়ে ঠিকমতো সংসারই চলে না, ব্যক্তিগত হাতখরচ তো দূরের কথা। তখন তিনি হাত গুটিয়ে বসে না থেকে নিজে কিছু করার সিদ্ধান্ত নেন। 

বিয়ের তিন-চার মাসের মধ্যেই তিন জোড়া ‘পারো’ (কবুতর) কিনে শুরু করেন লালন-পালন। কেন কবুতর বেছে নিলেন—এমন প্রশ্নের জবাবে স্বপ্না বলেন, কবুতর দ্রুত বাচ্চা দেয় এবং এর লালন-পালনে খরচ ও কষ্ট দুটোই কম। সে সময় প্রতি  জোড়া কবুতর ২০০ থেকে ২৫০ টাকায় বিক্রি হলেও বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকায়। বর্তমানে খামার থেকে প্রতি মাসে নিয়মিত দুই-তিন জোড়া কবুতর বিক্রি করা যায়। সংসারে আসার পর  থেকেই বাড়ত আয়ের চেষ্টা করছি। নিজের বলতে কিছু রাখি না। যা আয় হয়, সংসারেই দিই।

কবুতর থেকে গরু খামারে সম্প্রসারণ : 

কবুতর পালনের সাফল্যের পর তার উদ্যোগে একে একে যুক্ত হয়েছে হাঁস-মুরগি, ছাগল ও গরু। বর্তমানেও তার সংগ্রহে চার-পাঁচ জোড়া কবুতর রয়েছে। রোগবালাইয়ে হাঁস মারা যাওয়ার পর নতুন করে হাঁস কেনা না হলেও ভবিষ্যতে তা চালুর ইচ্ছা রয়েছে। 

এ ছাড়া অসুস্থতার কারণে তিন দফায় ছাগল বিক্রি করতে হলেও নতুন করে ছাগল পালনের জোরালো পরিকল্পনা রয়েছে তার। ঘরে মোরগ-মুরগি থাকায় একদিকে যেমন পরিবারের আমিষের চাহিদা মিটছে, অন্যদিকে বাড়তি ডিম বিক্রি করে আসছে অতিরিক্ত আয়। কয়েক বছর আগে মাত্র ৯ হাজার ৩০০ টাকায় একটি গাভি কিনে খামার শুরু করেছিলেন স্বপ্না। পরে কেনেন আরেকটি। গাভি ও তাদের বাছুর বড় হলে বিক্রি করে সেই টাকা তুলে দিয়েছেন সংসারের কাজে। বর্তমানে ওই দুই গাভির চারটি বাছুর বড় হচ্ছে। গরুর ঘাস-খড় ও সার্বিক দেখাশোনা স্বপ্না নিজে করলেও মাঠ থেকে ঘাস কেটে এনে জোগান দেন তার স্বামী। গোয়ালঘর থেকে গোবর তুলে উঠানের নির্দিষ্ট কোণে জমা করেন স্বপ্না। এগুলো দিয়ে তৈরি হয় জ্বালানির ঘুঁটে, যা স্থানীয়ভাবে ‘গুমুইট’ বা ‘মুইঠটা’ নামে পরিচিত। বাকি গোবর জমির জৈব সার হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

ছয়জনের পরিবারের শক্ত চালিকাশক্তি : 

স্বপ্না ও অবোধ দম্পতির দুই মেয়ে ও দুই ছেলে। এক ছেলে পড়াশোনা ছেড়ে দোকানে কাজ নিলেও বাকি তিনজন নিয়মিত পড়াশোনা করছে। সব খরচ বাদ দিয়ে তার বার্ষিক নিট আয় প্রায় ৫০ হাজার টাকা। এর পাশাপাশি নিজেদের এক টুকরা জমিতে মৌসুমি শাকসবজি চাষ করেন তিনি। উৎপাদিত এসব সবজি দিয়ে পরিবারের পুষ্টির চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজনদেরও দেওয়া হয়।

অনুপ্রেরণার অপর নাম স্বপ্না : প্রতিবেশী শম্পা বিশ্বাস জানান, এই সংসারটি মূলত স্বপ্না নিজেই অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করছেন। এই এলাকায় আরও অনেক নারী আছেন, যারা টুকটাক কাজ করলেও স্বপ্নার কর্মস্পৃহা আলাদা। স্থানীয় সংগঠক বিউটি রানী সরকারের কাছে স্বপ্না এক অনন্য অনুপ্রেরণার নাম। 

তার ভাষ্য, প্রথমে তিনি নিজের হাতখরচার কথা ভেবেছিলেন, আর এখন পুরো সংসারটাই সাফল্যের সঙ্গে চালাচ্ছেন। কয়জন নারী এভাবে ভাবতে পারেন? সবাই তো কেবল স্বামীর আয়ের ওপর নির্ভর করে থাকেন। স্বপ্না বিশ্বাস করেন, দেশের নারীরা যদি এ রকম ছোট ছোট চেষ্টা ও উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে আসেন, তবে যেকোনো অভাব অনটন পেরিয়ে সংসারকে স্বাচ্ছন্দ্যে টিকিয়ে রাখা সম্ভব।

কেকে/ এমএস


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

বেগম রোকেয়া- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close