স্বামীর চিকিৎসায় বিক্রি করেছিলেন দুই গরু, নিঃস্ব হয়ে পড়েছিল পরিবার। সেই দুঃসময়ে ২০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে ঘরের এক কোণে ছোট দোকান গড়ে তোলেন অর্পনা রানী সরকার। আজ সেই দোকানের আয়েই চলছে সংসার, এগিয়ে যাচ্ছে দুই মেয়ের পড়াশোনা। মৌলভীবাজারের হাওরপারের এই নারীর জীবনসংগ্রাম এখন ঘুরে দাঁড়ানোর এক অনুপ্রেরণামূলক গল্প।
মৌলভীবাজার সদর উপজেলার একাটুনা ইউনিয়নের কাউয়াদীঘি হাওরপারের ইটা বড়বাড়ি গ্রাম। ৮০ থেকে ৮৫টি পরিবারের এই গ্রামে অধিকাংশ মানুষের জীবিকা কৃষিনির্ভর। গ্রামের একটি টিনের বসতঘরের এক পাশে ছোট্ট দোকান নিয়ে বসে আছেন অর্পনা রানী সরকার (৪০)। দোকানটি ছোট, পুঁজি সীমিত; কিন্তু এই দোকানই এখন তার পরিবারের বেঁচে থাকার অবলম্বন। চার বছর আগেও তার জীবন ছিল অনিশ্চয়তায় ঘেরা। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি স্বামী জিতেন্দ্র সরকার অসুস্থ হয়ে পড়ায় থমকে যায় সংসারের চাকা। স্বামীর চিকিৎসার খরচ জোগাতে বিক্রি করতে হয় বাড়ির দুটি গরু। সঞ্চয়ের শেষ সম্বলটুকুও শেষ হয়ে যায়। কীভাবে সংসার চলবে, কীভাবে দুই মেয়ের পড়াশোনার খরচ জোগাবেন–এই দুশ্চিন্তয় দিশেহারা হয়ে পড়েন অর্পনা। কিন্তু প্রতিকূলতার কাছে হার মানেননি তিনি।
একটি বেসরকারি সংস্থা থেকে ২০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে শুরু করেন ছোট্ট দোকান। সেই উদ্যোগই ধীরে ধীরে বদলে দেয় তাঁর জীবনের গতিপথ। স্বামীর অসুস্থতায় নিভে এসেছিল সংসারের আলোঅর্পনার স্বামী জিতেন্দ্র সরকার পেশায় কাঠমিস্ত্রি। তাঁর উপার্জনেই চলত চার সদস্যের সংসার। হঠাৎ জিতেন্দ্রর পিত্তথলিতে পাথর ধরা পড়লে প্রয়োজন হয় জরুরি অস্ত্রোপচারের। চিকিৎসার খরচ জোগাতে একে একে বিক্রি করতে হয় সংসারের সম্বল।
অর্পনা বলেন, চিকিৎসার খরচ জোগাইতে বাড়ির দুইটা গরু বেচি দিলাম। সঞ্চয়ের সব টাকাও শেষ। অপারেশনের পরে ডাক্তার কইলা ভারী কাম করা যাইতো নায়। তখন সংসার কেমনে চলব, বাইচ্চাইনতোরে লেখাপড়া কেমনে করাইমু এই চিন্তাত ঘুম আওয়া বন্ধ অই গেছিল। স্বামীর অসুস্থতা শুধু পরিবারের আয় বন্ধ করেনি, কেড়ে নিয়েছিল ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর স্বস্তিও। তবু দুই মেয়ের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাক, তা চাননি অর্পনা। সেই তাগিদ থেকেই বিকল্প আয়ের পথ খুঁজতে শুরু করেন।
২০ হাজার টাকায় শুরু, ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাস :
আলাপকালে জানা যায়, একটি বেসরকারি সংস্থা থেকে ২০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে বসতঘরের এক কোণে দোকান খোলেন অর্পনা। শুরুতে দোকানে ছিল অল্প কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য লবণ ও মরিচ। অভিজ্ঞতা না থাকায় ব্যবসার প্রথম দিনগুলো ছিল কঠিন। কখনো লোকসান, কখনো হিসাব মেলাতে না পারার দুশ্চিন্তা।
অর্পনা বলেন, প্রথম ছয়-সাত মাস লস খাইছি। বুঝতাম না কেমনে কী করতাম। আস্তে আস্তে সব শিখছি। এখন হিসাবও করতে পারি। আগে তো থ্রি পর্যন্ত পড়ছি। অল্প পুঁজি নিয়ে শুরু করা ব্যবসাটিকে টিকিয়ে রাখতে ধীরে ধীরে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন তিনি। স্বামীর মাধ্যমে শহর থেকে পণ্য আনতে শুরু করেন। এখন প্রতি বৃহস্পতিবার কোম্পানির লোকজন ভ্যানে করে দোকানের মালামাল পৌঁছে দেন। লবণ-মরিচের পাশাপাশিদোকানে বিক্রি হচ্ছে তেল, সাবান, বিস্কুট, চানাচুর, চিপসসহ বিভিন্ন পণ্য।
ছোট দোকানেই বড় ভরসা :
সম্প্রতি অর্পনার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, টিনের ঘরের একটি অংশজুড়ে তার দোকান। দেয়ালে দড়িতে ঝুলছে চানাচুর, চিপস ও বিস্কুটের প্যাকেট। পাশে সারি করে রাখা লবণ, মরিচ, তেল ও সাবান। নেই চেয়ার-টেবিল; ক্রেতা এলে দাঁড়িয়েই পণ্য তুলে দেন তিনি। গ্রামের মানুষই তার প্রধান ক্রেতা। অনেকেই প্রয়োজনীয় পণ্য বাকিতে নিয়ে মাস শেষে টাকা পরিশোধ করেন।
হাওরাঞ্চল থেকে বাজার দূরে হওয়ায় অর্পনার দোকানটি স্থানীয় বাসিন্দাদের দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানোর গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হয়ে উঠেছে। এখন দোকান থেকে প্রতি মাসে প্রায় ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা আয় করেন অর্পনা। এই আয় দিয়েই সংসারের খরচ চালানোর পাশাপাশি দুই মেয়ের পড়াশোনা অব্যাহত রেখেছেন। ঋণের কিস্তিও ইতোমধ্যে পরিশোধ করেছেন।
মেয়েদের পড়াশোনাই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি :
অর্পনার কাছে সবচেয়ে বড় সাফল্য শুধু দোকান চালিয়ে সংসার টিকিয়ে রাখা নয়, বরং দুই মেয়ের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারা। বড় মেয়ে এবার এসএসসি পাস করেছে। ছোট মেয়ে পড়ছে নবম শ্রেণিতে। অন্যদিকে, স্বামী জিতেন্দ্রও এখন আগের চেয়ে সুস্থ। শারীরিক সামর্থ্য অনুযায়ী কিছু কাজ করে তিনিও সংসারে সহযোগিতা করছেন। একসময় যে পরিবারে নিত্যদিনের খরচ চালানোই ছিল বড় দুশ্চিন্তা, সেই পরিবারে এখন নতুন করে স্বপ্ন দেখার সুযোগ তৈরি হয়েছে। আর এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে অর্পনার শ্রম, সাহস ও নিজের পায়ে দাঁড়ানোর দৃঢ় সংকল্প।
তিন কিলোমিটার পথ বাঁচিয়েছে অর্পনার দোকান :
অর্পনার দোকান শুধু তার পরিবারের আয়ের উৎস নয়, গ্রামের মানুষেরও ভরসা। স্থানীয় বাসিন্দা মালতি রানী বলেন, অর্পনা দিদির দোকান না থাকলে আমাদের ৩ কিলোমিটার হেঁটে বাজারে যাওয়া লাগত। সে বাকিও দেয়, বিপদে সাহায্যও করে। সীমিত সামর্থ্য নিয়েও গ্রামের মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করেন অর্পনা। প্রয়োজনের সময় বাকিতে পণ্য দেওয়ায় অনেক পরিবারের উপকার হয়। এভাবেই ছোট্ট দোকানটি হয়ে উঠেছে গ্রামীণ জীবনের প্রয়োজনীয় একটি অংশ।
এবার স্বপ্ন দোকানটি বড় করার :
সংসার সামলানোর পাশাপাশি অর্পনার চোখ এখন ভবিষ্যতের দিকে। তিনি চান, দোকানটি আরও বড় হোক। বিশেষ করে গ্রামের সড়কের পাশে দোকান নিতে পারলে ক্রেতা বাড়বে, আয়ও বাড়তে পারে। তবে নতুন করে ঋণ নেওয়ার ঝুঁকি নিতে চান না তিনি।
অর্পনা বলেন, ইচ্ছা আছে দোকানটা আরও বড় করার। কিন্তু আর ঋণ নিতাম চাই না। যি কোনো সহযোগিতা পাই, তাইলে গ্রামের সড়কের পাশে দোকানটা নিয়া যাইতাম। তাইলে আরও মানুষ আইত। তার এই স্বপ্নের পেছনে রয়েছে পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আকাঙ্খা এবং মেয়েদের ভবিষ্যৎ আরও সুন্দর করে গড়ে তোলার প্রত্যাশা।
অল্প পুঁজিতে ঘুরে দাঁড়ানোর অনুপ্রেরণা অর্পনা রানী সরকারের গল্প কেবল একটি ছোট দোকানের সাফল্যের গল্প নয়। এটি সংকটের মুখে ভেঙে না পড়ে নতুন করে পথ খুঁজে নেওয়ার গল্প। স্বামীর অসুস্থতা, সঞ্চয় হারানো, সীমিত পুঁজি আর ব্যবসার শুরুর দিকের লোকসান–সব বাধা পেরিয়ে তিনি নিজের জন্য তৈরি করেছেন আয়ের একটি পথ। মাত্র ২০ হাজার টাকার ঋণ দিয়ে শুরু করা উদ্যোগ আজ তাঁর পরিবারের প্রধান অবলম্বন। সেই আয়েই চলছে সংসার, এগিয়ে যাচ্ছে দুই মেয়ের পড়াশোনা। একই সঙ্গে তাঁর দোকান উপকার করছে গ্রামের মানুষেরও।
হাওরপারের এই নারী উদ্যোক্তা দেখিয়েছেন, ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য সব সময় বড় পুঁজি লাগে না; প্রয়োজন উদ্যোগ নেওয়ার সাহস, পরিশ্রম আর হাল না ছাড়ার মানসিকতা। অর্পনার ছোট দোকান তাই শুধু জীবিকার উৎস নয়, প্রতিকূলতার মধ্যেও নতুন সম্ভাবনা খুঁজে পাওয়ার এক জীবন্ত উদাহরণ।
মৌলভীবাজার সদর উপজেলার ৬ নম্বর একাটুনা ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান সৈয়দ রুমেন আলী বলেন, অর্পণা রানীর স্বামী অসুস্থ এবং তার দুটি মেয়ে পড়ালেখা করছে। দোকানের অল্প আয়ে সন্তানদের পড়ালেখা, স্বামীর চিকিৎসা ও সংসার চালানো তার জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। যদি সরকারিভাবে বা অন্য কোনো উপায়ে তাঁকে আর্থিক সহায়তা কিংবা সুদমুক্ত ঋণের ব্যবস্থা করে দেওয়া যায়, তবে এই দুর্বিষহ পরিস্থিতি থেকে কিছুটা রেহাই পেতেন তারা। এই অসহায় পরিবারটিকে বাঁচাতে তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সদয় দৃষ্টি ও কার্যকর সহযোগিতা কামনা করেন।
কেকে/ এমএস