করোনার কঠিন সময়ে ২ লাখ ৪৮ হাজার টাকা দিয়ে দুটি গরু কিনেছিলেন ফারহানা ইয়াছমিন। উদ্দেশ্য ছিল নিজের কিছু করা, সংসারের পাশাপাশি বাড়তি আয়ের পথ তৈরি করা। কিন্তু গবাদিপশু পালনের পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকায় শুরুতেই নানা সমস্যায় পড়তে হয় তাকে। গরুর খাবার, পরিচর্যা ও রোগবালাই নিয়ে ছিল অনভিজ্ঞতা। তবে হাল ছাড়েননি। স্বামী শওকত আলীর সহযোগিতা আর নিজের পরিশ্রমে ধীরে ধীরে সামলে নেন পরিস্থিতি। ছয় বছরে নিজের খামারে জন্ম নেওয়া বাছুর থেকেই গরুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০টিতে।
শুধু গরু পালনেই থেমে থাকেননি ফারহানা। যুক্ত করেছেন মৎস্য চাষও। হালদা নদীর মাত্র ৫০০ গ্রাম রেণু থেকে উৎপাদন করেছেন ১১০ কেজি মাছের পোনা। সেগুলো বিক্রি করেছেন ৩ লাখ ২০ হাজার টাকায়। তার মালিকানাধীন ‘রাওনাফ মৎস্য অ্যান্ড অ্যাগ্রো ফার্ম’ এখন গবাদিপশু পালন ও মাছের পোনা উৎপাদনের একটি সমন্বিত উদ্যোগ।
চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার দক্ষিণ পাইন্দং এলাকার বাসিন্দা ফারহানার বয়স ৩১ বছর। এইচএসসি পাস করেছেন ২০১৩ সালে। বর্তমানে তার খামারে ছয়টি গাভি, ছয়টি বাছুর ও আটটি ষাঁড় রয়েছে। শাহীওয়াল জাতের গাভি পালন, বাছুর উৎপাদন ও দুধ বিক্রি করে আয় করছেন তিনি। প্রতিদিন খামারে প্রায় ১২ কেজি দুধ উৎপাদিত হয়। প্রতি কেজি দুধ বিক্রি করেন ৬০ টাকা দরে।
অভিজ্ঞতার অভাব থেকে প্রশিক্ষণ
২০২০ সালে খামার শুরু করলেও গবাদিপশু পালন সম্পর্কে তার তেমন অভিজ্ঞতা ছিল না। ফলে গরুর লালনপালনে নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। সেই সীমাবদ্ধতা কাটাতে ২০২২ সালে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের আয়োজনে ফটিকছড়ি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজে গবাদিপশু পালনের ওপর প্রশিক্ষণ নেন তিনি। প্রশিক্ষণে পাওয়া জ্ঞান কাজে লাগিয়ে খামার পরিচালনায় আরও দক্ষ হয়ে ওঠেন।
ফারহানার স্বামী মো. শওকত আলী ১৯৯৯ সাল থেকে নার্সারি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। নার্সারি থেকে উপার্জিত অর্থ দিয়ে স্ত্রীকে খামার গড়ে তুলতে সহযোগিতা করেন তিনি। নিজের ব্যবসার পাশাপাশি খামারের কাজেও স্ত্রীকে সহায়তা করেন। তবে খামার পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেন ফারহানা নিজেই।
গরু ও মাছের খামারে নতুন সম্ভাবনা
ফারহানার খামারের সাফল্যের আরেকটি দিক মৎস্য চাষ। হালদা নদীর ৫০০ গ্রাম রেণু থেকে ১১০ কেজি মাছের পোনা উৎপাদন করে বিক্রি করেছেন ৩ লাখ ২০ হাজার টাকায়। গরু পালনের পাশাপাশি এই উদ্যোগ তার আয়ের নতুন ক্ষেত্র তৈরি করেছে।
২০২৪ সালের কোরবানির ঈদে আটটি গরু বিক্রি করে ১২ লাখ টাকা আয় করেন তিনি। এতে লাভ হয়েছিল সাড়ে তিন লাখ টাকা। বর্তমানে খামারে দুজন শ্রমিক কাজ করছেন। ফলে নিজের উদ্যোগের পাশাপাশি অন্য দুজনের কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি করেছেন তিনি।
দুধের বাজার সম্প্রসারণের লক্ষ্যে দই তৈরির মেশিনও কিনেছেন ফারহানা। তবে এখনো দই উৎপাদন শুরু হয়নি। ভবিষ্যতে দুধ থেকে পুষ্টিকর দই উৎপাদনের পাশাপাশি খামারের বর্জ্য ব্যবহার করে কেঁচো সার তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে তার।
পরিশ্রমের স্বীকৃতি
ফারহানার উদ্যোগ ও পরিশ্রমের স্বীকৃতিও এসেছে। ২০২৬ সালের জাতীয় যুব দিবসে উপজেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ নারী উদ্যোক্তা হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। ১ নভেম্বর, রবিবার সকালে ফটিকছড়ি উপজেলা শফিকুন নুর মওলা(বীর প্রতিক) মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা(ইউএনও) সাঈদ মোহাম্মদ ইব্রাহীম তার হাতে সম্মাননা ক্রেস্ট তুলে দেন।
মাত্র দুটি গরু দিয়ে শুরু করা উদ্যোগ আজ ২০টি গরু ও মৎস্য চাষের সমন্বিত খামারে পরিণত হয়েছে। পথচলায় অভিজ্ঞতার অভাব, পরিচর্যার সমস্যা ও নানা সীমাবদ্ধতা থাকলেও থেমে থাকেননি ফারহানা। প্রশিক্ষণ, পারিবারিক সহযোগিতা ও নিজের উদ্যোগকে কাজে লাগিয়ে এগিয়ে নিয়েছেন খামার।
তার এই পথচলা গ্রামীণ নারীদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার একটি সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে। ছোট পরিসরে শুরু করা উদ্যোগও যে সময়, শ্রম ও পরিকল্পনার সমন্বয়ে বড় হয়ে উঠতে পারে, ফারহানা ইয়াছমিনের খামার তার একটি উদাহরণ।
উদ্যোক্তা ফারহানা ইয়াসমিন বলেন, মাত্র দুটি গরু দিয়ে শুরু করেছিলাম। তখন জানতাম না কত দূর যেতে পারব। আজ নিজের খামারে ২০টি গরু দেখে মনে হয়, সাহস করে শুরু করাটাই ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত।
উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা মুহাম্মদ আবদুল মোমেন চৌধুরী বলেন, প্রশিক্ষণ গ্রহণের পর অর্জিত জ্ঞান কাজে লাগিয়ে আত্মকর্মসংস্থানের দৃষ্টান্ত তৈরি করেছেন ফারহানা। তার মতো উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে প্রশিক্ষণের বাস্তব সুফল প্রতিফলিত হয়। আমরা চাই, আরও বেশি নারী প্রশিক্ষণ নিয়ে উদ্যোক্তা হয়ে নিজেদের অর্থনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করেন।
কেকে/ এমএস