আমরা যারা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী কিংবা প্রাক্তন শিক্ষার্থী, আমাদের কখনো আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে একটি প্রশ্ন করা উচিত—আমাদের শিক্ষার মূল্য কে পরিশোধ করেছে, আর আমরা তার বিনিময়ে দেশকে কী ফিরিয়ে দিয়েছি? আমাদের মেধার পেছনে ব্যয় হওয়া অর্থ কোনো রাজকীয় কোষাগারের উত্তরাধিকার নয়। এর প্রতিটি টাকার সঙ্গে মিশে আছে একজন রিকশাচালকের ঘাম, একজন গার্মেন্টস শ্রমিকের ওভারটাইম, একজন প্রবাসীর নির্বাসিত যৌবন এবং কোটি মানুষের না-পাওয়ার দীর্ঘশ্বাস।
আমরা পাঁচ ভাই—দুজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, তিনজন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি। আমাদের মতো শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার পেছনে রাষ্ট্রের যে বিনিয়োগ, তার অর্থ এসেছে এই খেটে খাওয়া মানুষের কাছ থেকেই। যে রিকশাচালক নিজের সন্তানকে ভালো স্কুলে পড়াতে হিমশিম খান, তার উপার্জনের অংশ দিয়ে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে বসেছি। যে প্রবাসী বছরের পর বছর পরিবারের মুখ দেখতে পান না, তার পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রায় আমাদের শিক্ষার অবকাঠামো দাঁড়িয়ে আছে। অথচ প্রশ্ন হলো, আমরা তাদের কতটুকু প্রতিদান দিতে পেরেছি? নাকি জনগণের অর্থে উচ্চশিক্ষিত হয়ে জনগণের কাছ থেকেই দ‚রে সরে যাওয়ার সামাজিক লাইসেন্স অর্জন করেছি?
আমার স্ত্রী দেশের একটি স্বনামধন্য সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর—উভয় পরীক্ষায় ৩.৮৬ সিজিপিএ অর্জন করেছে। ৪৪তম বিসিএসে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছে। অথচ বিষয়সংশ্লিষ্ট চাকরির সাক্ষাৎকার দিতে লন্ডনে গিয়ে নিয়োগকর্তার কাছ থেকে যা শুনতে হয়েছে তা অপ্রত্যাশিত। এটি একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, কোনো আনুষ্ঠানিক আন্তর্জাতিক শিক্ষাগত সমতুল্যতার সিদ্ধান্ত নয়। তবু অভিজ্ঞতাটি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার সামনে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন রেখে যায়—পরীক্ষার ফলাফল আর বাস্তব দক্ষতার মধ্যে এত দূরত্ব কেন?
এই সংকট যে নিছক ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নয়, পরিসংখ্যানও তার সাক্ষ্য দিচ্ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪ অনুযায়ী, দেশে বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রিধারী বেকারের সংখ্যা প্রায় ৮ লাখ ৮৫ হাজার এবং উচ্চশিক্ষিত জনগোষ্ঠীর বেকারত্বের হার ১৩.৫৪ শতাংশ। আরও উদ্বেগজনক হলো, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ২০২৬ সালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ২০২৪ সালের তথ্য বিশ্লেষণ করে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের (১৫-২৯ বছর) বেকারত্বের হার প্রায় ২৫ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ আমরা একদিকে ডিগ্রির সংখ্যা বাড়াচ্ছি, অন্যদিকে সেই ডিগ্রিকে কর্মক্ষেত্রের কার্যকর দক্ষতায় রূপান্তর করতে হিমশিম খাচ্ছি। প্রশ্ন জাগে, আমরা কি মানবসম্পদ তৈরি করছি, নাকি শিক্ষিত বেকারত্বের এক বিশাল প্রদর্শনী সাজাচ্ছি?
কেউ যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তুলনা করেন, তখন অপমান লাগে, ক্ষোভ হয়। কিন্তু শুধু ক্ষোভের উত্তাপে আয়নাটি ভেঙে ফেললে নিজের মুখ দেখা যায় না। বরং প্রশ্ন করা প্রয়োজন—আমরা কি আমাদের প্রতিষ্ঠানের ঐতিহ্যের সমান যোগ্যতা অর্জন করছি? নাকি বিশ্ববিদ্যালয়ের নামটিকে ব্যক্তিগত দক্ষতার বিকল্প পরিচয়পত্র বানিয়ে ফেলেছি?
আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কি চিন্তাশীল মানুষ, গবেষক, উদ্ভাবক ও সমস্যা সমাধানকারী তৈরি করছে, নাকি জিপিএর কারিগরি দক্ষতায় পারদর্শী কিছু সনদধারী নাগরিক তৈরি করছে? পরীক্ষার খাতায় নির্ভুল উত্তর লিখতে পারলেই যদি মেধার চূড়ান্ত স্বীকৃতি মেলে, তবে বাস্তব পৃথিবীর অজানা সমস্যার সমাধান করবে কে?
অবশ্য দায় শুধু শিক্ষার্থীর নয়। দায় সেই শিক্ষকেরও, যিনি পাঠ্যবইয়ের বাইরে জ্ঞানের জানালা খুলতে ভুলে গেছেন; সেই প্রশাসকেরও, যিনি গবেষণার চেয়ে আনুষ্ঠানিকতাকে বেশি গুরুত্ব দেন; সেই নীতিনির্ধারকেরও, যিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ান, কিন্তু শিক্ষার মান ও কর্মমুখী দক্ষতার প্রশ্নে নীরব থাকেন। দায় আমাদেরও—আমরা যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয় নিয়ে গর্ব করি, অথচ নিজেদের দুর্বলতা নিয়ে কথা বলতে লজ্জা পাই।
সবচেয়ে বড় বিদ্রুপ হলো, যে শ্রমিকের ঘামে আমাদের শিক্ষার প্রদীপ জ্বলে, তাকেই আমরা অশিক্ষিত বলে অবজ্ঞা করি। অথচ তার জীবনবোধ, শ্রমের শৃঙ্খলা, প্রতিক‚লতার সঙ্গে লড়াই এবং দায়িত্ববোধের কাছে আমাদের অনেক তথাকথিত শিক্ষিত মানুষের শেখার আছে। তিনি হয়তো ইংরেজিতে জীবনবৃত্তান্ত লিখতে পারেন না, কিন্তু জীবনের যে কঠিন পরীক্ষায় প্রতিদিন উত্তীর্ণ হন, তার কোনো জিপিএ আমাদের সনদে লেখা নেই।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাফল্য শুধু সমাবর্তনের ছবি, পদকের ঝলক কিংবা বিসিএসের সুপারিশের সংখ্যায় মাপা যায় না। মাপতে হবে গবেষণার মানে, উদ্ভাবনে, কর্মক্ষেত্রে দক্ষতায়, নাগরিক দায়িত্ববোধে এবং সাধারণ মানুষের জীবনে এর অবদানে।
আমাদের আত্মসমালোচনা আত্মঅপমান নয়; এটি দায়বদ্ধতার প্রথম পাঠ। ডিগ্রি অর্জন ব্যক্তিগত সাফল্য, কিন্তু সেই ডিগ্রির পেছনে জনগণের বিনিয়োগ একটি সামাজিক আমানত। সেই আমানতের প্রতিদান দিতে না পারলে আমাদের অহংকারের মুকুট আসলে দায়মুক্তির মুখোশ ছাড়া কিছুই নয়। রাষ্ট্র আমাদের শিক্ষিত হওয়ার সুযোগ দিয়েছিল, আমরা কি মানুষ হওয়ার দায়িত্ব পালন করেছি?
জনগণ আমাদের পেছনে অর্থ বিনিয়োগ করেছিল মানুষ তৈরির আশায়; আমরা যদি কেবল সার্টিফিকেট তৈরি করি, তবে সমাবর্তনের আলোকসজ্জা যতই ঝলমলে হোক, তার আড়ালে যোগ্যতার জানাজাই অনুষ্ঠিত হবে। রাষ্ট্র মানুষ চেয়েছিল, আমরা সার্টিফিকেট হয়ে ফিরেছিÑএই আত্মজিজ্ঞাসার উত্তর খুঁজে পাওয়ার দিনই হবে আমাদের প্রকৃত সমাবর্তন।
লেখক : গণমাধ্যমকর্মী
কেকে/সাশ