শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬,
১৫ কার্তিক ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬
শিরোনাম: ● এইচএসসির ফল প্রকাশ, পাসের হার ৫২.১২ শতাংশ      ● সৌদিতে আগুনে নিহত ৭ বাংলাদেশির মরদেহ দেশে পৌঁছেছে      ● কানেক্টিভিটির নামে বাংলাদেশকে ইজারা দেওয়া যাবে না : শফিকুর রহমান      ● পাবনায় বজ্রপাতে ৬ জনের মৃত্যু, আহত ২      ● জাপানের শ্রমবাজারে ঢাকা কেন পিছিয়ে      ● চার দিনের জাপান সফর শেষে ঢাকার পথে প্রধানমন্ত্রী      ● এলপিজির কমিশন বাড়ানোর প্রস্তাব, বাড়তে পারে সিলিন্ডারের দাম      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
মাধ্যমিক শিক্ষার ভঙ্গুর দশা, আর অবহেলার সুযোগ নেই
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: শনিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:৪০ পিএম
ছবি: খোলা কাগজ

ছবি: খোলা কাগজ

শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড, আর মাধ্যমিক স্তর সেই মেরুদণ্ডের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জোড়। প্রাথমিকের ভিত্তি এবং উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতি—দুটির সেতুই এই স্তর।

অথচ বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) শিক্ষা পরিসংখ্যান ২০২৫ প্রতিবেদনে যে চিত্র উঠে এসেছে, তা গভীর উদ্বেগের। এক বছরের ব্যবধানে মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থী কমেছে চার লাখের বেশি। অথচ একই সময়ে বিদ্যালয়ের সংখ্যা কমেনি, বরং ৯৪টি বেড়েছে। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠান বাড়ছে, কিন্তু শিক্ষার্থী ধরে রাখার সক্ষমতা বাড়ছে না।

সংকটের দীর্ঘমেয়াদি রূপ আরও শঙ্কাজনক। ২০১৮ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে সাধারণ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী কমেছে প্রায় ২০ শতাংশ। একই সময়ে আলিয়া মাদরাসায় শিক্ষার্থী বেড়েছে প্রায় ১০ শতাংশ, ইংলিশ মিডিয়ামেও বাড়ছে। শিক্ষাবিদদের মতে, সচ্ছল পরিবার সন্তানদের ইংলিশ মিডিয়ামে পাঠাচ্ছে, আর স্বল্প আয়ের পরিবার ঝুঁকছে মাদরাসার দিকে, যেখানে খরচ কম এবং আবাসন ও খাবারের সুবিধা মেলে। এর অর্থ, মূলধারার মাধ্যমিক শিক্ষা থেকে মানুষের আস্থা সরে যাচ্ছে। দারিদ্র্য, প্রাইভেট-কোচিংনির্ভরতা, গাইড বইয়ের ব্যয়, বাল্যবিবাহ, মেয়েদের নিরাপত্তাহীনতা এবং বারবার কারিকুলাম ও মূল্যায়ন পদ্ধতি বদলের ধাক্কাÑসব মিলিয়ে শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়বিমুখ হচ্ছে।

শিক্ষকের মান ও সংখ্যা এই সংকটের কেন্দ্রে। ব্যানবেইসের তথ্যমতে, মাধ্যমিক স্তরের প্রায় ৩৫ শতাংশ শিক্ষকের বিএড, এমএড বা বিএসএডের মতো পেশাগত প্রশিক্ষণ নেই। ইংরেজি পড়ান এমন ৯ হাজার ৯৮২ জন এবং গণিত পড়ান এমন ১০ হাজার ১৬৯ জন শিক্ষক স্নাতক পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট বিষয়ই পড়েননি। যেখানে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নেই, সেখানে অন্য বিষয়ের শিক্ষককে দিয়ে ক্লাস চালানো হচ্ছে। এতে শিক্ষার্থীর শেখার ভিত দুর্বল হচ্ছে, আর সেই দুর্বলতা তাকে পরবর্তী ধাপে বয়ে বেড়াতে হচ্ছে।

এই অব্যবস্থার দায় বহুলাংশে প্রশাসনিক। মাধ্যমিক শিক্ষার অভিভাবক মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) বিরুদ্ধে তদারকিতে উদাসীনতার অভিযোগ গুরুতর। দেশের ৪৯৫ উপজেলার মধ্যে ৩৮০টিতে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার পদ শূন্য, সহকারী কর্মকর্তার ২৮৯টি পদও ফাঁকা। এনটিআরসিএ প্রায় ৬০ হাজার শূন্য পদে শিক্ষক নিয়োগ দিতে পারছে না, অথচ মাউশির সঙ্গে তাদের কার্যকর সমন্বয় নেই। ম্যানেজিং কমিটির জটিলতা, শিক্ষকদের গ্রæপিং ও অনিয়মিত ক্লাসের মতো সমস্যা সমাধানেও দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই।

এ অবস্থায় সরকারের সামনে করণীয় স্পষ্ট। প্রথমত, শিক্ষার্থী কেন ঝরে পড়ছে বা মূলধারা ছেড়ে যাচ্ছে, তা নির্ধারণে অবিলম্বে একটি স্বাধীন ও তথ্যভিত্তিক সমীক্ষা চালাতে হবে, যাতে জনসংখ্যাগত পরিবর্তন, আর্থিক সংকট ও শিক্ষার মানের প্রভাব আলাদাভাবে চিহ্নিত হয়। দ্বিতীয়ত, এনটিআরসিএ ও মাউশির সমন্বয়ে শূন্য পদে দ্রুত স্বচ্ছ নিয়োগ সম্পন্ন করতে হবে এবং ইংরেজি, গণিতসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিষয়ভিত্তিক যোগ্য শিক্ষক নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, প্রশিক্ষণহীন শিক্ষকদের জন্য বাধ্যতামূলক ও নিয়মিত পেশাগত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা জরুরি। চতুর্থত, উপজেলা পর্যায়ের শূন্য শিক্ষা কর্মকর্তার পদ পূরণ করে মাঠপর্যায়ের তদারকি জোরদার করতে হবে এবং মাউশির জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। পঞ্চমত, দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য উপবৃত্তি বাড়ানো, বিশেষ করে মেয়েদের নিরাপত্তা ও বাল্যবিবাহ রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এবং প্রাইভেট-কোচিংবাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। ষষ্ঠত, কারিকুলাম ও মূল্যায়নপদ্ধতিতে ঘন ঘন পরিবর্তন বন্ধ করে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে টেকসই কাঠামো গড়তে হবে। সবশেষে, বিজ্ঞানাগার, গ্রন্থাগার ও তথ্যপ্রযুক্তির সুবিধা নিশ্চিত করার পাশাপাশি মাদরাসাশিক্ষার্থীরাও যেন কর্মবাজারের উপযোগী দক্ষতা অর্জন করে, তা দেখতে হবে।

মাধ্যমিক শিক্ষার এই সংকট কেবল একটি স্তরের সমস্যা নয়; এর প্রভাব পড়বে উচ্চশিক্ষা, কর্মসংস্থান ও দেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নে। প্রকল্প ও বদলি-পদায়নের ব্যস্ততা ছেড়ে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এখনই মাধ্যমিক শিক্ষাকে অগ্রাধিকারে আনতে হবে। দেরি হলে এর মাশুল দিতে হবে পুরো জাতিকে।

কেকে/সাশ 



মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close