নিজেদের দীর্ঘদিনের অবস্থান পরিবর্তন করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে আগ্রহী হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সম্প্রতি ফাঁস হওয়া এক অডিও বার্তার বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে ওয়াশিংটন পোস্ট। ওই বার্তা থেকে আরও জানা যায়, জামায়াত যদি ক্ষমতায় গিয়ে শরিয়াহ আইন বা যুক্তরাষ্ট্রের মতের বিরুদ্ধে কিছু করে তাহলে তারা রপ্তানিতে ১০০ ভাগ শুল্ক আরোপ করবে। অন্যদিকে জামায়াতও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে তাদের দীর্ঘদিনের এজেন্ডা শরিয়াহ আইন বাস্তবায়নের দাবি থেকে সরে এসেছে। অন্য দিকে এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের মতো জামায়াতও মনে করে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ একটি উগ্রবাদী দল।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জামায়াতের এই গোপন আঁতাতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন রাজনীতিক ও বুদ্ধিজীবীরা। তারা মনে করছেন, জামায়াতে ভর দিয়ে এদেশে মার্কিন আধিপত্যবাদ খুঁটি গাড়ার চেষ্টা করছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দুনিয়াজুড়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্র চরম আধিপত্যবাদ প্রতিষ্ঠা করছে। বিশ্বের সমস্ত আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ভেনেজুয়েলার প্রেসিন্ডেকে তুলে নিয়ে গেছে নিজ দেশে। ডেনমার্কের রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বকে অস্বীকার করে ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকি দিচ্ছেন। গাজায় পিস অব বোর্ডের নামে স্বাধীন ফিলিস্তিনের স্বপ্ন চিরতরে রুদ্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। সেই সঙ্গে ইরান আক্রমণের পাঁয়তারা চলছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন এমন আগ্রাসী রূপে হাজির হয়েছে, সেসময় তাদের সঙ্গে জামায়াতের গোপন আঁতাত বাংলাদেশের জন্য গভীর এক অশনিসংকেত।
জামায়াতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যোগাযোগকে ভয়ঙ্কর অশনিসংকেত হিসেবে উল্লেখ করেছেন কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহার। তিনি বলেন, ‘আপনারা অনেকে ভারতবিরোধিতার কথা বলেন, ভারতের আধিপত্য আমি স্বীকার করি। কিন্তু আপনারা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কথা বলেন না কেন? কী জন্য বলেন না? জামায়াত তো বলে নাই, গাজাতে (ফিলিস্তিনের) এই যে স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ) যাচ্ছে, আমার সেখানে আপত্তি আছে। তবে বোঝা গেল জামায়াতের সঙ্গে অবশ্যই যুক্তরাষ্ট্রের একটা নীতি, একটা সম্পর্ক রয়েছে। ফলে আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্র এই বক্তব্যটা দিচ্ছে। এটা আমি ভয়ঙ্কর অশনিসংকেত হিসেবে দেখি।’
গাজা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সেখানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে কোনো আন্তর্জাতিক সামরিক উদ্যোগে অংশ নেওয়া জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র একটা ভূরাজনৈতিক শক্তি এবং পৃথিবীতে আন্তর্জাতিক আইন বলে কিছু নাই। দেখেছেন ট্রাম্পের যে আচরণ। এই রূঢ় বাস্তবতা, এই বিপজ্জনক পরিস্থিতির মধ্যে আমার চিন্তা, আমি ১৭ কোটি মানুষকে নিয়ে বেঁচে থাকব কী করে? আমার প্রশ্ন খুব সহজ। আমি ১৭ কোটি মানুষকে নিয়ে ডাল-ভাত দিয়ে বেঁচে থাকতে চাই। কারও সঙ্গে যুদ্ধে জড়াতে চাই না।’
এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, ‘যারা ভারতের পক্ষের শক্তি ছিল তারা ভারতে পালিয়েছে। আরেকটি শক্তি বিদেশি শক্তির গোলামি করে, তারা বাংলাদেশের বিভিন্ন রকম বিভ্রান্তি করে রাজনীতি করছে।’
এর আগে জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের ফেনীতে এক মতবিনিময় সভায় বলেন, ‘আমরা যদি শুধু ইসলামপন্থিদের নিয়ে জোট আগাইতাম, তাহলে এটা মৌলবাদী জোট হিসেবে চিহ্নিত হতো। যখন আমরা অন্যদের নিয়ে আসতে শুরু করলাম, তখন এটা জাতীয় জোট হিসেবে রূপান্তরিত হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের প্রথম জোট ছিল চরমোনাইয়ের সাথে। আমিরেকান অ্যাম্বেসিতে গেলাম, তারা বলল, তোমরা তো মৌলবাদীদের সাথে আছ। আমি বললাম সমস্যা নাই। তাদের মধ্যে কিছু এক্সট্রিমিজম (উগ্রবাদ) আছে, তাদের আমরা সেখান থেকে দূরে আনতেছি। তারা বলল, ওকে ফাইন। তাহলে ঠিক আছে।’
ওয়াশিংটন পোস্টের সেই প্রতিবেদন : জামায়াতের সঙ্গে বন্ধুত্ব¡পূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে আগ্রহী যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির এক কূটনীতিক কয়েকজন নারী সাংবাদিকের সঙ্গে আলাপকালে এ বিষয়ে কথা বলেছেন। আলাপচারিতার একটি অডিও মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্ট পেয়েছে।
ওই অডিওতে মার্কিন কূটনীতিক বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ইসলামপন্থার দিকে ঝুঁকছে এবং আগামী জাতীয় নির্বাচনে জামায়াত ইতিহাসে সর্বোচ্চ আসন পাবে। সেই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র জামায়াতের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে চায়।
কূটনীতিকটি বলেন, ‘আমরা চাই তারা আমাদের বন্ধু হোক।’ তিনি আরও বলেন, জামায়াত নির্বাচিত হলে দেশজুড়ে শরিয়াহ আইন কার্যকর হবে না। যদি তা কার্যকর হয়, তবে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করবে যুক্তরাষ্ট্র, যা দেশের অর্থনীতিকে মারাত্মক প্রভাবিত করবে। তিনি উল্লেখ করেন, শুধু জামায়াত নয়, হেফাজতে ইসলাম ও ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গেও যুক্তরাষ্ট্র যোগাযোগ করতে পারে। তবে লক্ষ্য তাদের বন্ধুত্বপূর্ণ অবস্থানে আনা।
ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসের মুখপাত্র মোনিকা শিই ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেন, ‘এই আলোচনাটি গত ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নিয়মিত বৈঠকের অংশ ছিল। তবে এসব আলাপ সাধারণত বাইরে প্রকাশ করা হয় না।’ তিনি আরও বলেন, এটি ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ককে প্রভাবিত করবে না।
জামায়াতের মুখপাত্র মোহাম্মদ রহমানও সংবাদমাধ্যমকে জানান, ‘ব্যক্তিগত কূটনৈতিক বৈঠক নিয়ে আমরা কোনো মন্তব্য করি না।’ তবে তিনি জানিয়েছেন, ২০২৪ সালে স্বৈরাচার শেখ হাসিনার পতনের পর জামায়াত ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের মধ্যে চারবার বৈঠক হয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যান মন্তব্য করেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ইতোমধ্যে তিক্ত। এখন তারা জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে চাইছে, যা দুই দেশের সম্পর্ক আরও জটিল করে দিতে পারে।’
কেকে/এমএফ