জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঠিক আগে জারি হওয়া এক গেজেটকে ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এতে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসকে দায়িত্ব হস্তান্তরের তারিখ থেকে এক বছরের জন্য ‘ভিভিআইপি’ ঘোষণা করা হয়েছে। তবে, গেজেটটি সরকারি ওয়েবসাইটে প্রকাশ না হওয়ায় এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তার ঠিক দুই দিন আগে গত ১০ ফেব্রুয়ারি জারি করা ১ গেজেটে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসকে দায়িত্ব হস্তান্তরের তারিখ থেকে এক বছরের জন্য ‘ভেরি ভেরি ইম্পর্ট্যান্ট পার্সন’ বা ভিভিআইপি ঘোষণা করা হয়েছে।
ওই গেজেটে বলা হয়েছে, বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী আইন ২০২১’-এর ধারা ২ (ক) অনুযায়ী এ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। এর ফলে, তিনি ১ বছরের জন্য স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সের (এসএসএফ) নিরাপত্তা পাবেন।
গেজেটটি জারি করেন তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের সচিব মো. সাইফুল্লাহ পান্না। বর্তমানে তিনি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত রয়েছেন। এ ব্যাপারে জানতে তাকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি।
ওই আইনের ২ (ক) ধারায় বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধানের পাশাপাশি সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সরকার ঘোষিত অন্য কোনো ব্যক্তিকেও ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার বিধান রয়েছে। আইন অনুযায়ী বিদায়ী সরকারপ্রধানদের স্বয়ংক্রিয়ভাবে এসএসএফ নিরাপত্তা দেওয়া হয় না; গেজেট প্রজ্ঞাপন জারি হলে তবেই তা কার্যকর হয়।
সরকারি গেজেট সাধারণত বাংলাদেশ গভার্নমেন্ট প্রেসের ওয়েবসাইটে প্রকাশ ও সংরক্ষণ করা হয়। দেশের একটি অনলাইন গণমাধ্যম বাংলাদেশ গভার্নমেন্ট প্রেসের ‘এক্সট্রা গেজেটস (মান্হলি) আর্কাইভের ২০২৬ সালের ১০ ফেব্রুয়ারির প্রকাশ তালিকা পর্যালোচনা করে। সেখানে সংশ্লিষ্ট গেজেটটি পাওয়া যায়নি।
সরকারি কার্যপ্রণালী অনুযায়ী, গেজেট আকারে জারি করা আদেশ বাংলাদেশ গেজেটে প্রকাশের মাধ্যমে কার্যকর ও সর্বসাধারণের জন্য প্রামাণ্য নথি হিসেবে বিবেচিত হয়। গেজেট প্রকাশ রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের আনুষ্ঠানিক নোটিফিকেশন এবং স্বচ্ছতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বাংলাদেশ গভার্নমেন্ট প্রেসের উপপরিচালক মোহাম্মদ আবু ইউসুফ ওই গণমাধ্যমকে বলেন, ‘১০ ফেব্রুয়ারি জারি হওয়া গেজেটটি গভার্নমেন্ট প্রেসে মুদ্রিত হয়েছে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের পাঠানো নথির ভিত্তিতে।’
তিনি বলেন, ‘ওইটা প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে এসেছিল। তাদের রিকোয়ারমেন্ট অনুযায়ী ওয়েবসাইটে দেওয়া হয়নি।”
গেজেট ওয়েবসাইটে প্রকাশ না হলে তা কার্যকারিতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠে কি না জানতে চাইলে মোহাম্মদ আবু ইউসুফ বলেন, ‘কোনো গেজেট ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে, আর কোনটি হবে না, সে সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট দপ্তরের।’
তিনি বলেন, ‘যদি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নির্দেশনা থাকে যে, এটি প্রকাশ করা যাবে না, তাহলে আমরা ওয়েবসাইটে দিই না।’
গোপনীয়তার স্বার্থে কোনো গেজেট অনলাইনে প্রকাশ না করার সুযোগ রয়েছে বলে জানান মোহাম্মদ আবু ইউসুফ।
তার ভাষ্য, সংশ্লিষ্ট গেজেটটি ‘যথাযথ প্রক্রিয়া’ মেনেই জারি হয়েছে।
এ ব্যাপারে কথা বলতে সাবেক প্রধান উপদেষ্টার প্রেস টিমের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা ‘এখন দায়িত্বে না থাকার’ যুক্তি দিয়ে কথা বলতে চাননি।
ভিভিআইপি মর্যাদায় নিরাপত্তা কাঠামো
‘রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী বা প্রধান উপদেষ্টা এবং অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিরাপত্তা বিধিমালা ২০২৫’ অনুযায়ী, ভিভিআইপি হিসেবে ঘোষিত ব্যক্তির বাসভবন ও কর্মস্থলে এসএসএফ নিরাপত্তা থাকে। তার উপস্থিতিতে আয়োজিত অনুষ্ঠান নিরাপত্তা তল্লাশির আওতায় থাকে এবং দেশে ও বিদেশে ভ্রমণের সময় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট দূতাবাসের সমন্বয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
এসএসএফ ভিভিআইপির সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের ব্যাকগ্রাউন্ড যাচাই করে এবং বাসভবন, কার্যালয় বা অনুষ্ঠানের স্থানে দর্শনার্থী, যানবাহন ও সামগ্রীর প্রবেশ ও প্রস্থান নিয়ন্ত্রণ করে।
মুহাম্মদ ইউনূস ২০২৪ সালের ৮ অগাস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেন। অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর তাকে প্রধান উপদেষ্টা করে সরকার গঠন করা হয়। প্রায় ১৮ মাস দায়িত্ব পালনের পর তিনি গত শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনা ছাড়েন।
কেকে/এমএ