প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে ঘিরে উচ্চ প্রত্যাশা থাকলেও এর বাস্তবায়ন সক্ষমতা, রাজস্ব আহরণ, বিনিয়োগ পরিবেশ, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির কার্যকারিতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও ব্যাংকাররা। তাদের মতে, কাঠামোগত দুর্বলতা, সুশাসনের ঘাটতি, কর ব্যবস্থার জটিলতা, বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং বিভিন্ন খাতে সমন্বয়হীনতা দূর করা না গেলে উচ্চাভিলাষী বাজেটের লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে।
গতকাল সোমবার রাজধানীতে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) ও ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক (ইউএপি) আয়োজিত ‘দ্য ফিসকাল কম্পাস ২০২৬’ শীর্ষক আলোচনায় বক্তারা এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটের বিভিন্ন দিক, অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা, রাজস্বনীতি, বিনিয়োগ পরিবেশ, কর্মসংস্থান, শিল্পায়ন এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক রূপরেখা নিয়ে আলোচনা করা হয়। বক্তারা বলেন, অর্থনীতির গণতান্ত্রিকীকরণ, তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উৎপাদন ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি, রাজস্ব খাতে সংস্কার এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গেলে আগামী কয়েক বছরে বাংলাদেশ সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যেতে পারবে।
অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, এই বাজেট প্রণয়ন অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং ছিল। আমাদের হাতে সময় ছিল মাত্র দেড় মাস, অথচ জনগণের প্রত্যাশা ছিল অনেক বেশি। ভারসাম্য রক্ষা করা কখনোই সহজ কাজ নয়। বিশেষ করে এমন এক সময়, যখন দেশ অর্থনৈতিক চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং মানুষ অর্থবহ পরিবর্তনের প্রত্যাশা করছে, তখন এ ভারসাম্য রক্ষা আরও কঠিন হয়ে পড়ে। এ বাজেটের অন্যতম কেন্দ্রীয় ধারণা হলো অর্থনীতির গণতান্ত্রিকীকরণ।
তিনি বলেন, আমরা এমন একটি বাজেট প্রণয়নের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি, যা তরুণ প্রজন্মকে সহায়তা করবে এবং তাদের বিকাশের সুযোগ তৈরি করবে। আমরা অপ্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রক বাধা কমাতে চাই, নাগরিকদের জন্য আরও স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে চাই এবং মানুষের অর্থনৈতিক জীবনে অংশগ্রহণ সহজ করতে চাই। একটি দেশ হিসেবে আমরা বহু বাধা ও সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে গিয়েছি। মানুষ প্রকৃত স্বাধীনতা পাওয়ার অধিকার রাখে, শুধু রাজনৈতিক অর্থে নয়, বরং দৈনন্দিন অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনেও। কাজটি কঠিন, কিন্তু আমরা এটি বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ভঙ্গুর অবস্থা থেকে স্থিতিস্থাপক অবস্থায় পৌঁছাতে দুই বছর সময় লাগবে। তৃতীয় বছর হবে একটি ভালো সময়। আর চতুর্থ ও পঞ্চম বছর হবে সমৃদ্ধির বছর।
সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের (সিজিএস) সভাপতি জিল্লুর রহমান বলেন, নতুন নির্বাচিত সরকার আমাদের সামনে এমন একটি বাজেট উপস্থাপন করেছে, যা উচ্চাভিলাষী বলে মনে হচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই এটি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করেছে: এটি কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে?
তিনি বলেন, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো দেশের গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান প্রতিষ্ঠান হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করে। তবে অতীতে সংখ্যার বিকৃতি বা হস্তক্ষেপ নিয়ে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সংখ্যার বাইরে গিয়েও ভাবতে হবে। শেষ পর্যন্ত লক্ষ্য শুধু আর্থিক সাফল্য হওয়া উচিত নয়; বরং একটি অধিক অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ ও অধিক ন্যায়ভিত্তিক দেশ গড়ে তোলা হওয়া উচিত।
প্রফেসর ড. এম. এ. বাকি খলিলী বলেন, নতুন সরকারের প্রথম বাজেট ঘিরে জনমনে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটের মূল লক্ষ্য অর্থনৈতিক ও আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগনির্ভর পুনরুদ্ধার এবং মানবিক বাংলাদেশ গঠনের পথে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন। বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আরও রপ্তানিমুখী ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সক্ষম করে তুলতে হবে; ক্ষুদ্র ও সীমাবদ্ধ অর্থনৈতিক পরিসরে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই অগ্রগতি সম্ভব নয়। শুধু কর বৃদ্ধি করেই রাজস্ব আয় বাড়ানো যাবে না, এর পাশাপাশি উৎপাদনশীলতা ও বিনিয়োগও বাড়াতে হবে।
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি ও ইভিন্স গ্রুপের চেয়ারম্যান আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী (পারভেজ) বলেন, দেশের নীতিমালাকে আরও সহনশীল ও ব্যবসাবান্ধব করতে হবে। বর্তমান সরকার শুরু থেকেই ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে। বন্ধ কারখানা পুনরায় চালুর জন্য প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার তহবিল ঘোষণা করা হয়েছে এবং পণ্য বহুমুখীকরণের জন্যও বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে বাস্তবতা হলো, দেশের অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান এখনো কঠিন সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং উৎপাদনশীল খাতের প্রবৃদ্ধি কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছাতে পারছে না।
তিনি বলেন, দক্ষ জনশক্তি উন্নয়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে আমলাতন্ত্র, রাজস্ব প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা বৃদ্ধি না করা গেলে ভবিষ্যতে দেশের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে।
ড. সেলিম জাহান বলেন, তরুণরা শুধু ভবিষ্যৎ নয়, তারা বর্তমানেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি অর্থনীতির গণতন্ত্রীকরণ, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে উন্নয়নের সুফল পৌঁছে দেওয়া এবং নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে হবে। চলমান, ঘনীভূত ও উদ্ভূত—এ তিন ধরনের সমস্যার প্রতিফলন বাজেটে থাকা জরুরি। অর্থায়নে শুধু ব্যাংকনির্ভরতা কমিয়ে সৃজনশীল ও সবুজ অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে হবে।
আব্দুল হাই সরকার বলেন, দেশের যেসব শিল্পপ্রতিষ্ঠান বিভিন্ন কারণে বন্ধ হয়ে গেছে, সেগুলো পুনরায় চালুর জন্য সরকারের উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত। শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির স্বার্থে বন্ধ শিল্পগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করা সময়ের দাবি। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতের বিভিন্ন অংশীজন, শিল্প খাত, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বিতভাবে কাজ করার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
তিনি আরও বলেন, সমন্বিত পরিকল্পনা, দক্ষ বাস্তবায়ন এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গেলে বাজেটের সুফল দেশের সব স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।
কেকে/এলএ