দেশে ধর্ষণ ও আত্মহত্যা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। এ ছাড়া হত্যা, যৌন হয়রানি, বাল্যবিবাহসহ নারী ও কন্যাশিশুর ওপর সব ধরনের সহিংসতা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
সংস্থাটির জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার মাসিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুলাই মাসে ধর্ষণের ঘটনা বেড়েছে প্রায় ৩৩ শতাংশ, আত্মহত্যা বেড়েছে প্রায় ৬৫ শতাংশ। সাধারণত এসব ঘটনায় দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে পুলিশ কার্যকর কোনো তদন্ত করে না। ফলে অপরাধীরা আইনের আওতার বাইরেই থেকে যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। আর বিচারহীনতা, তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা, প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপ ও সামাজিক দায়মুক্তির সংস্কৃতি এই সহিংসতাকে আরও উসকে দিচ্ছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ।
এদিকে গত কয়েক দিন ধরে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নারী নির্যাতন, ধর্ষণ এবং আত্মহত্যার বেশ কয়েকটি মর্মান্তিক ঘটনা সামনে এসেছে, যা জনমনে তীব্র আতঙ্ক ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। সাম্প্রতিক এই অপরাধপ্রবণতা ও আত্মহত্যার ক্রমবর্ধমান হার সামাজিক নিরাপত্তা ও মানসিক স্বাস্থ্যের ভঙ্গুর অবস্থাকে আবারও প্রকট করে তুলেছে।
গতকাল শুক্রবার ভোররাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নতুন ভবনের অষ্টম তলা থেকে ‘লাফিয়ে পড়ে’ চিকিৎসাধীন এক তরুণীর মৃত্যু হয়। ২০ বছর বয়সী রিয়া ওই ভবনের ৮০২ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি ছিলেন। নিহতের বাবা লতিফ মল্লিক হাসপাতালে বলেন, পাঁচ দিন আগে তিনি মেয়েকে সেখানে ভর্তি করান। রিয়া মানসিক সমস্যাসহ কিছু জটিলতায় ভুগছিলেন। এছাড়া একই দিন রাজধানীর কলাবাগান থানার ক্রিসেন্ট রোডের একটি ছাত্রীনিবাস থেকে পিংকি বিশ্বাস (১৯) নামের এক নার্সিং শিক্ষার্থীর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। তিনি নগরীর মিরপুর রোডের পাশে অবস্থিত বেসরকারি আনোয়ার খান মডার্ন নার্সিং কলেজে প্রথম বর্ষে পড়তেন।
জুলাইয়ে নারী নির্যাতনের ঘটনা কমলেও ধর্ষণ-আত্মহত্যা বেড়েছে: দেশজুড়ে নারী ও শিশুদের প্রতি সহিংসতার চিত্র দিন দিন এক ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি, সামাজিক অবক্ষয় এবং পারিবারিক বন্ধন ও কাউন্সেলিংয়ের অভাবকে এই বেপরোয়া অবনতির জন্য দায়ী করছেন বিশ্লেষকরা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনই কঠোর সামাজিক প্রতিরোধ ও আইনের সুশাসন নিশ্চিত করা না গেলে এই ক্রমবর্ধমান নৈরাশ্য ও অপরাধের বিস্তার পুরো সমাজব্যবস্থাকে এক গভীর সংকটের মুখে ঠেলে দেবে।
মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার মাসিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, জুলাই মাসে ধর্ষণের ঘটনা বেড়েছে প্রায় ৩৩ শতাংশ, আত্মহত্যা বেড়েছে প্রায় ৬৫ শতাংশ।
এমএসএফের সভাপতি সুলতানা কামালের স্বাক্ষরে গতকাল শুক্রবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই প্রতিবেদন তুলে ধরা হয়। দেশের শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি জাতীয় দৈনিক ও স্থানীয় মানবাধিকারকর্মীদের পাঠানো তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে এই প্রতিবেদন।
গত জুন মাসে দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের মোট ৩২০টি ঘটনা পেয়েছিল এমএসএফ। জুলাই মাসে পেয়েছে ৩০৬টি। সার্বিক ঘটনা প্রায় ৪.৪ শতাংশ কমলেও পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক বলছে সংস্থাটি। তাদের পর্যবেক্ষণ হলো, মোট অপরাধ কমলেও নির্যাতনের ধরন এখন আরও বেশি নৃশংস ও জটিল রূপ নিয়েছে।
ধর্ষণ ও আত্মহত্যার উদ্বেগজনক বৃদ্ধি: এমএসএফের পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, জুলাই মাসে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৯০টি। জুনে এই সংখ্যা ছিল ৬৮টি। অর্থাৎ এক মাসে ধর্ষণের ঘটনা বেড়েছে প্রায় ৩৩ শতাংশ। জুনে যৌন নিপীড়ন বা হয়রানির ঘটনা ছিল ২১টি। জুলাইয়ে তা বেড়ে হয়েছে ২২টি। অন্যদিকে জুনে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছিল ১৭টি। জুলাইয়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৮টিতে। এক মাসে আত্মহত্যা বেড়েছে প্রায় ৬৫ শতাংশ। এমএসএফ মনে করে, ধর্ষণের মতো ঘটনা বৃদ্ধি নারী ও শিশুদের চরম নিরাপত্তাহীনতার ইঙ্গিত দেয়। আর আত্মহত্যার উচ্চ হার সামাজিক নিপীড়ন ও বিচারহীনতার মানসিক প্রতিক্রিয়া হতে পারে।
কমেছে কিছু অপরাধ: ধর্ষণ ও আত্মহত্যা বাড়লেও নির্যাতনের কিছু সূচক জুলাই মাসে কমেছে। জুলাই মাসে দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৭টি, যা জুনে ছিল ১৬টি। জুনে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা ঘটেছিল ৫টি, জুলাইয়ে তা কমে হয়েছে ৩টি। ধর্ষণচেষ্টার ঘটনা ৩৫টি থেকে কমে ৩৪টি হয়েছে। শারীরিক নির্যাতনের ঘটনা ৫৬টি থেকে কমে ৪২টিতে নেমেছে। এ ছাড়া জুনে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিলেন ৭৬ জন নারী ও শিশু, জুলাইয়ে এই সংখ্যা কমে হয়েছে ৫২টি। তবে অপহরণ ও নিখোঁজের ঘটনা ১২টি থেকে সামান্য বেড়ে ১৩টি হয়েছে। অ্যাসিড নিক্ষেপের ঘটনা জুনের মতো জুলাইয়েও একটি ঘটেছে।
সালিসে ফৌজদারি অপরাধ মীমাংসা ও নবজাতক উদ্ধার: আইন অমান্য করে সালিসের মাধ্যমে গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ মীমাংসার প্রবণতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এমএসএফ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুলাই মাসে ধর্ষণের চেষ্টা ও বলাৎকারের মতো অন্তত তিনটি ঘটনা বেআইনি সালিসের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হয়েছে। এর মধ্যে দুটি ছিল ধর্ষণের চেষ্টা এবং একটি বলাৎকারের ঘটনা। জুলাই মাসে পরিত্যক্ত অবস্থায় ১১ জন নবজাতককে উদ্ধারের তথ্য দেওয়া হয়েছে প্রতিবেদনে। তাদের মধ্যে ৮ জন ছিল মৃত, আর ৩ জন জীবিত।
ধর্ষণ থেকে হত্যা, সব ক্ষেত্রেই বাড়ছে নারী নির্যাতন: সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে কন্যাশিশুরা। আর প্রাপ্তবয়স্ক নারীরা সবচেয়ে বেশি হত্যার শিকার হচ্ছেন। বিচারহীনতা, তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা, প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপ ও সামাজিক দায়মুক্তির সংস্কৃতি এই সহিংসতাকে আরও উসকে দিচ্ছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ। সংগঠনটি বলেছে, নারী নির্যাতন এখন কেবল নারীর সমস্যা নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারের সংকটে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম বলেন, ধর্ষণের পাশাপাশি হত্যার ঘটনাও উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। ফলে নারী শুধু যৌন সহিংসতারই নয়, জীবনহানিরও বড় ঝুঁকিতে পড়ছেন। এটি শুধু নারীর সংকট নয়, বরং পুরো সমাজের নিরাপত্তা ও মানবিকতার সংকট। নারী নির্যাতনের প্রতিটি ঘটনাকে সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন হিসেবে বিবেচনা করে গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ ও নারী আন্দোলনকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
কেকে/এলএ