ক্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর কয়েক মাস না যেতেই দেশের রাজনীতিতে নতুন করে মুখোমুখি অবস্থানে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি। স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে ক্ষমতাসীন বিএনপিকে রাজনৈতিকভাবে ইমেজ সংকটে ফেলতে নানা অপতৎপরতা চালাচ্ছে বিরোধীরা। বিশেষ করে দখল, চাঁদাবাজি, দুর্নীতি, আইনশৃঙ্খলা, প্রশাসনে দলীয়করণের অভিযোগ এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ঘোষিত সংস্কার বাস্তবায়ন নিয়ে বিএনপির বিরুদ্ধে ধারাবাহিক সমালোচনা করছে জামায়াত-এনসিপি।
সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া কয়েকটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের সত্যতা যাচাই না করে চটজলদি প্রচার বা প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর অভিযোগ উঠেছে জামায়াত ও এনসিপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। বিভিন্ন আলোচিত ঘটনায় সুনির্দিষ্ট তথ্য যাচাই না করে মনগড়া বয়ান তৈরি করে তা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করার অভিযোগ তুলেছে বিএনপিসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল।
নির্বাচন কমিশনের পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী কয়েক মাসে ইউনিয়ন পরিষদসহ স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরে ভোট আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে। ফলে জাতীয় নির্বাচনের পর প্রথম বড় নির্বাচনি পরীক্ষায় নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে দলগুলো এখন থেকেই মাঠ গোছাচ্ছে। গণঅধিকার পরিষদসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের নেতারা অভিযোগ করেছেন, মাঠের রাজনীতিতে নিজেদের পক্ষে জনমত তৈরি এবং সাধারণ মানুষের সহানুভূতি অর্জনের লক্ষ্যে তারা অতিরঞ্জিত বা অসম্পূর্ণ তথ্য প্রচার করছে।
গণঅধিকার পরিষদের মুখপাত্র আবু হানিফ বলেছেন, সালমান মুক্তাদির তার বক্তব্যে স্পষ্ট বলেছেন, কেউ তার কাছে চাঁদা দাবি করেনি। সে এটাও বলেছে মূলত জমির মালিকের সঙ্গে বিরোধের জেরে এ হামলা। পুলিশও বলছে, নিউ গিনি প্রপার্টিজ লিমিটেডের সঙ্গে পাশের জমির মালিকের জমি নিয়ে বিরোধের জেরে এ ঘটনা ঘটেছে। এখানে চাঁদাবাজির কোনো ঘটনা ঘটেনি। সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও টার্গেট ছিল না।
তিনি বলেন, দুই জমির মালিকের মধ্যকার চলমান বিরোধের কারণে এ ঘটনা ঘটেছে, অথচ ছড়ানো হচ্ছে সালমান মুক্তাদির চাঁদা দেয়নি বলে এ হামলা। এটা স্পষ্ট যে সালমান মুক্তাদির ইস্যুতে প্রোপাগান্ডা ছড়াচ্ছে জামায়াত, এনসিপি ও নিষিদ্ধ লীগ।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, সরকারকে লক্ষ্য করে যারা বিতর্কিত করার চেষ্টা করছেন তারা গণতন্ত্রের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের বিপক্ষে তৎপরতা চালাচ্ছেন।
বাংলাদেশকে সুসংগঠিত যারা করতে চাই না, তারা এ সরকারকে লক্ষ্য করে বিভিন্ন রকম অপপ্রচার ও মিথ্যার বেসাতি করার চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশকে রক্ষা করতে হলে গণতন্ত্র ও স্বাধীনতাকে রক্ষা করতে হবে। এ জন্য বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পরিশ্রম করছেন। স্বাভাবিক বাংলাদেশকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য তার আকাঙ্ক্ষা ও উদ্দেশ্য সারা বিশ্বে প্রশংসিত হচ্ছে। নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে তিনি যে ভাষণ দিয়েছেন, সারা বিশ্ব সেটা প্রশংসিত।
শামসুজ্জামান দুদু বলেন, তারেক রহমানকে টার্গেট করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন জায়গায় মিথ্যা ও অপপ্রচার চালানোর চেষ্টা হচ্ছে। এ অবস্থায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী (সচিব পদমর্যাদা) রাশেদ খাঁন বলেছেন, ‘জামায়াতের কাছ থেকে ১০০ কোটি টাকা ভিক্ষা নিয়ে জাতীয় নির্বাচন করেছে এনসিপি! হয়তো সেই ভিক্ষার টাকা পরিশোধ করার জন্য এনসিপিকে এখন গণভিক্ষা কর্মসূচি চালু করতে হচ্ছে ও জামায়াতের পক্ষে খ্যাপ মারতে হচ্ছে।
অপপ্রচার ও ঢালাও অভিযোগ
বিএনপির নেতাদের দাবি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা চলছে। অনেক ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি ভুয়া ছবি, ভিডিও বা বক্তব্যও প্রচার করা হচ্ছে। অন্যদিকে দেশের বিভিন্ন স্থানে দখল, চাঁদাবাজি, ভাঙচুর ও আধিপত্য বিস্তারের বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে বিএনপির সঙ্গে যুক্ত করে প্রচারনা চালানো হচ্ছে।
বিএনপির ইমেজ সংকট তৈরির অপচেষ্টা
স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলোকে চাপে রাখতে বহুমুখী কৌশলে এগোচ্ছে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি। একদিকে তৃণমূল পর্যায়ে সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাই ও সাংগঠনিক তৎপরতা জোরদার করছে, অন্যদিকে কেন্দ্রীয়ভাবে সরকারের বিভিন্ন নীতি, প্রশাসনের কার্যক্রম এবং বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির ভূমিকা নিয়ে কঠোর সমালোচনা করছে দল দুটি। রাজনৈতিক অঙ্গনে এমন তৎপরতাকে আসন্ন স্থানীয় নির্বাচন ঘিরে জনমত গঠনের প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন অনেকেই।
বিশেষ করে বিএনপির বিরুদ্ধে দখল, চাঁদাবাজি, দুর্নীতি, আধিপত্য বিস্তার ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রত্যাশা পূরণ না করার মতো অভিযোগ সামনে আনছে জামায়াত ও এনসিপির নেতারা। এসব অভিযোগের কিছু রাজনৈতিক বক্তব্য ও অভিযোগের পর্যায়ে থাকলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন সভা-সমাবেশে তা ব্যাপকভাবে প্রচার করা হচ্ছে। ফলে সরকারের পাশাপাশি ক্ষমতাসীন দলের ভাবমূর্তি নিয়েও জনমনে প্রশ্ন তৈরির চেষ্টা চলছে বলে বিএনপির নেতাদের অভিযোগ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে না হলেও তৃণমূলে প্রভাব বিস্তারের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। তাই সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের দুর্বল করা, নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি দৃশ্যমান করা এবং জনসমর্থন বাড়ানোর লক্ষ্যেই জামায়াত ও এনসিপি একইসঙ্গে মাঠ ও কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে সক্রিয় রয়েছে।
বিএনপিকে ঘিরেই বেশি আক্রমণ
আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় বর্তমান বাস্তবতায় জাতীয় রাজনীতিতে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির মধ্যকার প্রতিযোগিতা ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে। ক্ষমতাসীন বিএনপির বিরুদ্ধে সরকারের বিভিন্ন নীতি ও কর্মকাণ্ড নিয়ে সরব হয়েছে জামায়াত। সংসদের প্রধান বিরোধী দল হিসেবে তারা একদিকে সংসদে সরকারের সমালোচনা করছে, অন্যদিকে বিভিন্ন ইস্যুতে মাঠেও কর্মসূচি দিচ্ছে। একইসঙ্গে এনসিপি নিজেদের বিএনপি ও জামায়াতের বাইরে একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে এই প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিএনপি বর্তমানে রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকায় তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, স্থানীয় পর্যায়ের নেতাকর্মীদের ভূমিকা এবং সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে বিরোধী দলগুলোর সমালোচনার সুযোগও বেশি তৈরি হয়েছে। তবে নির্বাচনি মাঠে জনসমর্থন বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় রাজনৈতিক বক্তব্য কতটা তথ্যনির্ভর থাকে, সেটিও ভোটারদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
আওয়ামী লীগ প্রসঙ্গে ভিন্ন কৌশল
বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় আওয়ামী লীগ নির্বাচনি প্রতিযোগিতার বাইরে রয়েছে। দলটির রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ এবং নির্বাচন কমিশন এর নিবন্ধন স্থগিত করেছে। ফলে জামায়াত ও এনসিপির রাজনৈতিক আক্রমণের বড় অংশ এখন ক্ষমতাসীন বিএনপিকে কেন্দ্র করে। তবে আওয়ামী লীগকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বাইরে রাখার প্রশ্নেও জামায়াত সরব। দলটি নির্বাচন কমিশনের কাছে নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের পদধারী বা সক্রিয় নেতাকর্মীদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণের অযোগ্য ঘোষণার বিধান করার প্রস্তাব দিয়েছে। এদিকে আওয়ামী লীগের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড নিয়েও বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির মধ্যে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ রয়েছে।
কেকে/ এমএস