প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা আইন নিয়ে গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে গণমাধ্যম সংশ্লিষ্টদের মধ্যে। অপপ্রয়োগের আশঙ্কা করে তারা খসড়ায় আরও সংশোধনী আনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। সেইসঙ্গের আইনটি সংশোধনের ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের জন্য সুরক্ষার দাবি করেছেন। গণমাধ্যমের ক্ষেত্রে এ বিষয়গুলো দেখার জন্য তারা গণমাধ্যম কমিশন করে সেই কমিশনের মাধ্যমে বিষয়টি সুরাহার দাবি করেছেন। অন্যদিকে সরকার বলছে, খসরাটি হুবহু পাস হলেও তার অপপ্রয়োগ করা হবে না।
বহুল আলোচিত-সমালোচিত ‘সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬’-এর খসড়া পর্যালোচনায় প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার অংশীজনদের সঙ্গে গত সোমবার সচিবালয়ে সরকারের উদ্যোগে দ্বিতীয় পরামর্শ সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আমরা মিডিয়াকে টার্গেট করে সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিইনি। কোনো সাংবাদিক এটার শিকার হোক বা এ আইনের অপপ্রয়োগ হোক, সেটাও আমরা চাই না।’
তিনি আরও বলেন, ‘আশা করি, পর্যালোচনা কমিটি গণমাধ্যমের বিষয়ে যথাযথ সুপারিশ করবে। এরপর আইনের খসড়াটি আবারও সর্বসাধারণের জন্য ওয়েবসাইটে দেওয়া হবে।’
এ বিষয়ে দৈনিক মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘আমি মনে করি, সংশোধনী ছাড়া যদি এ আইন পাস হয়, তাহলে বাংলাদেশ বৃহৎ কারাগারে পরিণত হবে।’
ডেইলি স্টারের সম্পাদক ও প্রকাশক মাহফুজ আনাম বলেন, ‘বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের যে মূল্যবোধ আমরা প্রত্যাশা করি, তার প্রতিফলন এই খসড়া আইনে নেই। সরকার নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারার আইন করছে, তাই এটার বিরোধিতা করছি।’
আইন প্রণয়নের সঙ্গে প্রয়োগের বাস্তবতা সরকারকে অনুধাবন করতে হবে বলেও মত দেন মাহফুজ আনাম। একইসঙ্গে পর্যালোচনা কমিটির প্রস্তাব গ্রহণ করার মাধ্যমে প্রস্তাবিত আইনের খসড়ায় মৌলিক পরিবর্তন আনার বিষয়ে একমত হওয়ায় সরকার পক্ষকে ধন্যবাদ জানান তিনি।
সাংবাদিক ও বিশেষজ্ঞদের নিয়ে কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত :
সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধনের প্রস্তাবিত খসড়াটি মৌলিক পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত হয়েছে। গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান ও সাংবাদিকরা যাতে এই আইনের কারণে হয়রানির শিকার না হন, তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় আইনি সুরক্ষার প্রস্তাব দেবে পর্যালোচনা কমিটি। কমিটিতে সম্পাদক ও সাংবাদিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরাও থাকবেন। কমিটি ১৫ দিনের মধ্যে সরকারের কাছে সুপারিশ দেবে। তবে কমিটির সদস্য সংখ্যা ও কারা এতে থাকবেন, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
এদিকে গতকাল আরেকটি অনুষ্ঠানে তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেছেন, আইনটি বর্তমান অবস্থায় পাস হলেও বর্তমান সরকার আগের আওয়ামী লীগ সরকারের মতো করে এটি ব্যবহার করবে না। আইনের প্রয়োজনীয়তা ও প্রয়োগ নিয়ে ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, বাংলাদেশে গুজব ব্যবহার করে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টির একাধিক উদাহরণ রয়েছে, তাই অপতথ্য মোকাবিলায় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন আছে। তবে আইনটি কিভাবে প্রয়োগ হবে এবং এর সংজ্ঞা ও পরিধি কী দাঁড়াবে সে বিষয়ে প্রশ্ন থাকার বিষয়টি তিনি স্বীকার করেন।
সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করে তিনি বলেন, ‘এই আইন যদি কাগজে-কলমে অবিকৃতভাবে পাস হয়, এই সরকার হাসিনা সরকার হচ্ছে না।’
তিনি আরও উল্লেখ করেন, সাইবার অপরাধ মোকাবিলার পাশাপাশি নতুন ধরনের অনলাইন সাংবাদিকতা ও তথ্যপ্রচারের ক্ষেত্রেও সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন। তবে গণমাধ্যম ও নাগরিকদের উদ্বেগকে গুরুত্ব দিয়ে আইনের প্রয়োগের দিকটিতে নজরদারি রাখতে হবে। আইন সংশোধনের পরও যদি এর কোনো অপব্যবহার হয়, তবে তথ্য-প্রমাণসহ তা সরকারের সামনে তুলে ধরা গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের দায়িত্ব বলে তিনি মন্তব্য করেন।
কেকে/ এমএস