আওয়ামী লীগ সরকারের ১৭ বছরের স্বৈরাচারী শাসনের সময় দেশের সমস্ত রাষ্ট্রীয় ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ভেঙে পড়ে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল পুলিশ। সে সময় পুলিশ আওয়ামী লীগের দলীয় কর্মীর মতো আচরণ করত। গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে বড় আকাঙ্ক্ষা ছিল পুলিশের আমূল সংস্কার। এ লক্ষ্যে পুলিশে ব্যাপক রদবদলও করা হয়। নানা সংস্কার আনা হয়। কিন্তু এত কিছুর পরও বিভিন্ন ক্ষেত্রে সেই স্বৈরাচারী সময়ের মতোই আচরণ করছে সংস্থাটি।
অভিযোগ রয়েছে নির্দিষ্ট আসামিকে ধরতে না পেরে তার স্বজনকে আটক করা হচ্ছে, জড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন মামলায়। এ ছাড়া এখনো ঘুষ-দুর্নীতি মুক্ত করা যায়নি সংস্থাটিকে। পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা ঘুষ-বাণিজ্যসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন।
সম্প্রতি কুষ্টিয়ায় বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগে নূরজাহান বেগম নামের এক নারী থানায় মামলা করতে গেলে তা নেয়নি পুলিশ। পরে তিনি আদালতে মামলা করেন। এরপরই ৬৮ বছরের ওই বৃদ্ধাকে থানায় ডেকে নিয়ে একটি সন্ত্রাসবিরোধী মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
এর আগে ঢাকার ধামরাইয়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ যুবলীগের এক কর্মীকে ধরতে বাসায় অভিযান চালিয়ে না পেয়ে তার বাবাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। অন্যদিকে গত ১২ এপ্রিল কক্সবাজারের উখিয়ায় পালিয়ে যাওয়া এক ব্যক্তিকে ধরতে তার বাবা, স্ত্রী ও সন্তানকে আটক করে পুলিশ।
এসব ঘটনায় পুলিশের আচরণ নিয়ে নাগরিক সমাজে উদ্বেগ বাড়ছে। ছেলেকে না পেয়ে বাবাকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)।
নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, এসব ঘটনাকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই। স্বৈরাচাররী সরকার পুলিশকে ব্যবহার করে এ রকমভাবেই বিরোধী পক্ষকে নির্যাতন করত। যা মানবতা ও আইনের শাসনের চরম অবমাননা।
২০২৪ সালের ২২ মে মাসে সরকারবিরোধী আন্দোলনের সময় যুবদল নেতা রবিউল ইসলাম নয়নকে না পেয়ে তার বাবাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। সেই বিষয়টি উল্লেখ করে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে এ ধরনের ঘটনা কোনোভাবেই কাম্য নয়। এসব ঘটনায় জড়িতদের জবাবদিহিতার মধ্যে আনতে হবে। কোনোভাবে স্বৈরাচারের সংস্কৃতিতে আর ফিরে যাওয়া যাবে না।
এ ধরনের ঘটনায় নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে আসক বলেছে, একজনের দায় অন্য ব্যক্তির ওপর চাপিয়ে দেওয়া আইনের শাসনের পরিপন্থি। পরিবারের একজন সদস্যকে না পেয়ে তার স্বজনকে গ্রেপ্তার করা কোনো সভ্য, গণতান্ত্রিক ও মানবাধিকারভিত্তিক রাষ্ট্রে গ্রহণযোগ্য নয়। একজন ব্যক্তির দায় অন্য ব্যক্তির ওপর চাপিয়ে দেওয়া ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা, ন্যায়বিচার ও আইনের শাসনের মৌলিক নীতির পরিপন্থি।
সংগঠনটি বলেছে, বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদে প্রত্যেক নাগরিকের আইনের আশ্রয় লাভ ও আইন অনুযায়ী আচরণ পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। ৩২ অনুচ্ছেদে আইন অনুযায়ী ছাড়া কাউকে জীবন বা ব্যক্তিস্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত না করার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক চুক্তির (আইসিসিপিআর) ৯ অনুচ্ছেদেও নির্বিচারে গ্রেপ্তার ও আটকের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে।
আসক মনে করে, সরকারের পরিবর্তনের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় আচরণের সংস্কৃতিতেও পরিবর্তন আসা প্রয়োজন। অতীতে যে ধরনের আটক, হয়রানি ও গ্রেপ্তারের সংস্কৃতি নাগরিকদের মধ্যে ভয় তৈরি করেছে, বর্তমান সরকারকে তা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
মামলার বাদীকে গ্রেপ্তার :
জায়গা-জমির বিরোধের জেরে ‘মব’ পরিস্থিতি তৈরি করে কুষ্টিয়া সদর উপজেলার আওয়ামী লীগ নেতা রুহুল আমিনের বাড়িতে এক দল লোক হামলা-ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। সেই ঘটনায় রুহুল আমিনের মা নূরজাহান বেগম ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানায় মামলা করতে যান। পুলিশ মামলা না নেওয়ায় তিনি আদালতে মামলা করেন। মামলা করার পর দিন রোববার পুলিশ ৬৮ বছরের নূরজাহান বেগমকে মামলার বিষয়ে কথা বলতে থানায় ডেকে নেয়।
দিন শেষে নূরজাহান বেগমের পরিবার জানতে পারে, তাকে বিএনপি কার্যালয় ভাঙার মামলায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। অথচ ওই মামলার আসামিই নন নূরজাহান বেগম। আসামি তার ছেলে আওয়ামী লীগ নেতা রুহুল আমিন। পুলিশ বলছে, তারা তদন্তে প্রাপ্ত হয়ে সন্দেহভাজন হিসেবে নূরজাহানকে গ্রেপ্তার করেছেন। রুহুল আমিন পাটিকাবাড়ি ইউনিয়নের নলকুলা গ্রামের এক নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সহসভাপতি। তিনি আত্মগোপনে রয়েছেন।
নূরজাহান বেগমের ছোট মেয়ে সেলিনা খাতুন বলেন, ‘আওয়ামী লীগ করে আমার ভাই রুহুল আমীন। সে এখন পলাতক। ছেলের কারণে বৃদ্ধ মাকেই জেলে যেতে হলো। আর থানা মামলায় না নিলে আদালতে মামলা করা কি অপরাধ?’
যুবলীগকর্মীকে না পেয়ে বাবাকে গ্রেপ্তার :
এদিকে ঢাকার ধামরাইয়ে গত শনিবার কার্যক্রম নিষিদ্ধ যুবলীগের এক কর্মীকে ধরতে বাসায় অভিযান চালিয়ে না পেয়ে তার বাবাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তার মোহাম্মদ কলিম উদ্দিন (৬০) ধামরাই উপজেলার বালিয়া ইউনিয়নের ভাবনহাটি গ্রামের বাসিন্দা। তার ছেলে ইঞ্জিনিয়ার রিফাত আহমেদ যুবলীগের কর্মী বলে জানা গেছে। কলিম উদ্দিনকে একটি পেন্ডিং মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে বলে ধামরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল হুদা খান গণমাধ্যমকে জানান।
এর আগে গত ১২ এপ্রিল কক্সবাজারের উখিয়ার রাজাপালং ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতির বসত বাড়ি ঘেরাও করে এক দল পুলিশ। ওই সময় চেক প্রতারণা মামলার আসামি সভাপতির ছোট ভাই মিজানকে গ্রেপ্তার করে। কিন্তু হ্যান্ডক্যাফ পরানোর পরপরই মিজান পালিয়ে যায়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পলাতক আসামির ৮০ বছর বয়সী বৃদ্ধ বাবা, ৮ বছর বয়সী শিশুসহ স্ত্রী এবং ভাবিকে আটক করে পুলিশ। শর্ত দেয় মিজানকে আত্মসমর্পণের। তবুও মিজান ধরা না দিলে আটকদের নাম উল্লেখ করে ১৫ জনকে এজাহার নামীয় আসামি করে পুলিশ এসল্ট ও সরকারি কাজে বাঁধাদানের অভিযোগে মামলা দায়ের করে আদালতে পাঠায় উখিয়া থানা পুলিশ।
এ ছাড়া সম্প্রতি দেশজুড়ে আলোচিত মিরপুরে মা ও শিশুস্বাস্থ্য কেন্দ্র রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় নিষ্ক্রিয়তা ও দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ উঠেছে। প্রাথমিক সত্যতা মেলায় গত রোববার শাহ আলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহাঙ্গীর আলমকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।
পুলিশ-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ঘটনার রাতেই শাহ আলী থানার ওসি জাহাঙ্গীর আলমকে ভাঙচুরের খবর জানানো হয়। কিছুক্ষণের মধ্যে তিনি পুলিশের একটি দল নিয়ে ঘটনাস্থলে যান। তবে হামলাকারীদের আটক বা নিবৃত্ত করার উদ্যোগ নেননি। বরং ওসি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ভাঙচুরের বিষয়ে অসত্য তথ্য দেন।
তিনি জানিয়েছিলেন, বৈধ কাগজপত্র থাকা লোকজন নিজেদের জায়গার দখল বুঝে নিচ্ছেন। এমনকি ওই রাতে দখলদারদের একজনের সঙ্গে পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে মুঠোফোনে কথা বলিয়ে দেন।
কেকে/ এমএস