ভবন নির্মাণে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) অনুমোদিত নকশা ও নির্মাণবিধি মানার বাধ্যবাধকতা থাকলেও অধিকাংশ ভবন মালিক তা মানছে না। নিয়ম না মেনে বাড়ানো হচ্ছে ভবনের তলা, পরিবর্তন করা হচ্ছে ভবনের আয়তন ও ব্যবহার। কোথাও আবার অনুমোদন ছাড়াই গড়ে উঠছে স্থাপনা। তবে রাজউকের পক্ষ থেকে নোটিস, জরিমানা ও উচ্ছেদ অভিযান চালালেও অনেক ক্ষেত্রেই তা কার্যকর ফল দিচ্ছে না।
অভিযোগ রয়েছে— অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের শুরুতেই কার্যকর ব্যবস্থা না নিয়ে কিছু ক্ষেত্রে দায়সারা নোটিস দিয়েই দায়িত্ব শেষ করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। আবার কোনো ভবনের অংশবিশেষ ভেঙে দেওয়া হলেও কিছুদিন পর সেখানে আগের মতোই নির্মাণকাজ শুরু হচ্ছে। ফলে একদিকে চলছে ভাঙাভাঙি, অন্যদিকে নতুন করে গড়ে উঠছে অবৈধ স্থাপনা।
জানা যায়, রাজধানীর উত্তরার ১৭ নম্বর সেক্টরে গত মাসের ১৭ আগস্ট সরকারি জায়গা দখল করে গড়ে ওঠা অবৈধ দোকান-স্থাপনার বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে রাজউক। অভিযানে ৭৩টি অবৈধ দোকান ও স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়। এতে রাজউকের রাস্তার জায়গা দখলমুক্ত করা হয়। এ ছাড়া সেক্টর-১৭-এর এফ ব্লকের এভিনিউ-৬-এর পূর্ব পাশে সেক্টর-১৭ কল্যাণ সমিতির ব্যানারে নির্মিত আরও প্রায় ২২টি অবৈধ দোকান ও স্থাপনা অপসারণ করা হয়। রাজউকের জোন-১/১-এর আওতাধীন উত্তরা মডেল টাউনের ৩য় পর্বের সেক্টর-১৭ ও বাউনিয়া মৌজায় এ অভিযান পরিচালনা করা হয়।
তবে এ অভিযানের এক সপ্তাহ না পেরোতেই এসব স্থানে ফের নতুন করে গড়ে উঠছে অবৈধ স্থাপনা। সরেজমিন দেখা যায়, রাউকের অভিযানে ভেঙে দেওয়া জায়গায় ফের দোকানের কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে। কোথাও বাঁশ, টিন ও অন্যান্য উপকরণ দিয়ে নতুন স্থাপনা তৈরির কাজ চলছে। ফলে রাজউকের উচ্ছেদ অভিযান শেষ হওয়ার পরও দখলমুক্ত জায়গা স্থায়ীভাবে দখলমুক্ত রাখা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
আর্থিক লেনদেনে ম্যানেজ হচ্ছে অসাধু কর্মকর্তারা : রাজধানীর অন্যান্য এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, অনুমোদিত নকসার বাইরে গিয়ে ভবন নির্মাণের চিত্র কম নয়। আবাসিক ভবনের অনুমোদন নিয়ে বাণিজ্যিক ব্যবহারসহ নানা ধরনের অভিযোগ সামনে এসেছে। এসব অভিযোগ নিয়ে কথা হলে রাজউক কর্মকর্তারা বলছেন— রাজধানীর বিশাল এলাকায় ভবন নির্মাণ তদারকির তুলনায় তাদের জনবল প্রয়োজনের তুলনায় কম। সীমিত জনবল দিয়ে সব নির্মাণকাজ নিয়মিত তদারকি করা কঠিন। এ কারণে অনেক ক্ষেত্রে অনিয়ম শনাক্ত ও ব্যবস্থা নিতে সময় লাগছে। তবে মাঠ পর্যায়ের তথ্য বলছে— এসব নকশা বহির্ভূত ভবন নির্মাণের পেছনে রাজউকের কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশ রয়েছে। তারা মোটা অঙ্গের লেনদেনের মাধ্যমে এসব বিষয়কে আড়াল করছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাজধানীর উত্তরার এক ভবন মালিক খোলা কাগজকে জানান, তার ভবনটি ৮ তলা করার অনুমোদন রয়েছে। বর্তমানে ভবনটির সপ্তম তলার নির্মাণকাজ চলছে। ভবন নির্মাণে কিছুটা অনিয়মের বিষয় স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘একজন আর্কিটেক্টের মাধ্যমে ভবনের নকশা তৈরি ও অনুমোদন নেওয়া হয়েছে। তবে ভবনের পাশে নির্ধারিত জায়গা রাখার বিষয়টি নিয়ে আপত্তি উঠেছিল এবং এ নিয়ে রাজউকের সঙ্গে আগেই আলোচনা হয়েছে।’
রাজউকের পক্ষ থেকে তাকে কোনো লিখিত নোটিস দেওয়া হয়েছিল কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে ওই ভবন মালিক বলেন, ‘রাজউক থেকে আমাকে কোনো নোটিস দেয়নি। তবে ইমারত পরিদর্শকের মাধ্যমে বিষয়টি ‘ম্যানেজ’ করা হয়েছে।’ এ ঘটনাটি প্রায় দেড় থেকে দুই বছর আগের জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বর্তমানে ভবনটির যে অবস্থায় রয়েছে, সেভাবেই নির্মাণকাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। নির্মিত ভবন এখন ভেঙে ফেলা সম্ভব নয়।’
এসব বিষয়ে কথা হলে রাজউক জোন-১-এর পরিচালক রাজিয়া সুলতানা খোলা কাগজকে বলেন, ‘আমরা নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করছি। বিভিন্ন বিষয়ে অভিযোগ এলে সেগুলোও গুরুত্বসহকারে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আমাদের এসব অভিযান অব্যাহত রয়েছে।’
ঢাকায় অবৈধ ভবন ৩ হাজার ৩৮২টি : রাজউকের তথ্যমতে, নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে ঢাকার ৩ হাজার ৩৮২টি ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। তবে এসব অবৈধ ভবনে ভেঙে ফেলার কার্যক্রম শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা জানান।
রাজউক চেয়ারম্যান বলেন, অবৈধ ভবনগুলোর নির্মাণকাজ স্থগিত রাখতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং পর্যায়ক্রমে এসব ভবনের অবৈধ অংশ ভেঙে ফেলা হবে। প্রথম ধাপে সেবা সংযোগ বিচ্ছিন্ন, ফৌজদারি মামলা দায়ের, নকশা বাতিল এবং প্রয়োজনে ভবনগুলো সিলগালা করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে রাজউকের সদস্য (উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ) এরাদুল হক খোলা কাগজকে বলেন, একজন ভবন মালিকের দায়িত্ব হলো অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী ভবন নির্মাণ করা। তিনি নকশা তৈরি করে রাজউকে জমা দেবেন, অনুমোদন নেবেন এবং অনুমোদিত নকশা অনুসরণ করে ভবন নির্মাণ করবেন। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই সেই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা হয় না। ফলে ভবন নির্মাণে বিভিন্ন ধরনের বিচ্যুতি দেখা দেয়। তাই আমরা এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ভবন মালিকদেরও তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন করতে উদ্যোগ নিয়েছি। এটা হচ্ছে— মোটিভেশনাল পরিকল্পনা। কারণ মানুষের মধ্যে নিয়ম ভাঙার প্রবণতা রয়েছে। যার ফলে আইন প্রয়োগের সঙ্গে সঙ্গে নিয়ম ভাঙার প্রবণতাও কমাতে হবে।
এরাদুল হক আরও বলেন, রাজউকের কোনো কর্মকর্তা যদি অন্যায় করে তাকেও কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। এ ছাড়া আমাদের জনবল অত্যন্ত সীমিত। একজন পরিদর্শকের পক্ষে বিপুলসংখ্যক ভবন নিয়মিত মনিটরিং করা সম্ভব নয়। বর্তমানে যে পরিমাণ ভবন রয়েছে, সীমিতসংখ্যক পরিদর্শক দিয়ে সেগুলো সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখাও প্রায় অসম্ভব।
তিনি বলেন, কেউ অন্যায় করলে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। অন্যরা যেন তা দেখে অনিয়ম থেকে বিরত থাকে। আমরা সেই দৃষ্টান্ত তৈরি করার চেষ্টা করছি। আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
কেকে/ এমএস