পর্যটন নগরী কক্সবাজারের কলাতলী হোটেল-মোটেল জোনে সরকারি খাস জমি দখল করে অবৈধভাবে কোটি কোটি টাকায় বিক্রি ও হস্তান্তরের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, ডলফিন মোড় বৈশাখী রেস্তোরাঁ সংলগ্ন এলাকায় প্রায় ৪.৫০ একর জমি টিনের বেড়া দিয়ে ঘিরে ভেতরে পাকা দেয়াল ও দোকানঘর নির্মাণের কাজ পুরোদমে চালানো হচ্ছে একটি প্রভাবশালী ভূমিদস্যু চক্র।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রাসাদ প্যারাডাইসের মালিক ইউসুফ আবদুল্লার নামে বরাদ্দকৃত বি.এস. খতিয়ান নং-০১-এর ৩০ নম্বর প্লটটি নিয়ে আদালতে মামলা চলমান। প্লটটিতে স্থিতাবস্থার আদেশ থাকা সত্ত্বেও সেখানে গোপনে মার্কেট নির্মাণের কাজ চলছে।
সরেজমিন দেখা যায়, নির্মাণস্থলের চারপাশে উঁচু টিনের বেড়া দেওয়া হয়েছে। বেড়ার আড়ালে কয়েকজন শ্রমিককে নির্মাণকাজ করতে দেখা যায়। তাদের সঙ্গে কথা বললে, তারা কার নির্দেশে কাজ করছেন সে বিষয়ে কিছু জানেন না বলে জানান।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পাশের বৈশাখী হোটেল/রেস্টুরেন্টের মালিক কামরুলের তত্ত্বাবধানে একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এসব নির্মাণকাজ পরিচালিত হচ্ছে। নির্মাণাধীন দোকানগুলো বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে উচ্চ ‘সালামি’র (টাকা) বিনিময়ে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা লেনদেনের প্রস্তুতি চলছে।
স্থানীয়দের দাবি, এর আগেও একই প্লটে আদালতের আদেশ উপেক্ষা করে বৈশাখী হোটেলসহ প্রায় ২০-২৫টি দোকান নির্মাণ করা হয়েছে। এসব দোকানও উচ্চ ‘সালামি’র বিনিময়ে ভাড়া বা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
কলাতলীতে সরকারি বাতিলকৃত প্লটে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম ব্যবহার করে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ‘ম্যানেজ’ করে নির্মাণকাজ চালানোর অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে বৈশাখী হোটেল/রেস্টুরেন্টের মালিক কামরুলের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলে তিনি বিভিন্ন অজুহাতে ফোন কেটে দেন। পরে নিউজের বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে সরাসরি দেখা করে বক্তব্য দেওয়ার কথা জানান তিনি।
আদালতের নিষেধাজ্ঞা : সরেজমিন দেখা যায়, কলাতলী রোডের মূল সড়কের পাশে টিনের ঘেরা দিয়ে বিশাল এলাকা বেষ্টন করা হয়েছে। সেখানে টানানো একটি নোটিসে লেখা রয়েছে, “প্রবেশ নিষেধ— মহামান্য হাইকোর্টের রিট নং- ৩৪৭৫/২০২৪ (তারিখ : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৫) এর নির্দেশনা অনুযায়ী, বি.এস খতিয়ান নং-০১, বি.এস দাগ নং-২০০০৩/১, কলাতলী রোড, প্লট নং-৩০, হোটেল মোটেল জোন, কক্সবাজার। বৈশাখী রেস্তোরাঁ সংলগ্ন সীমানা প্রাচীরের উপর সব স্থাপনা নির্মাণের উপর আদালতের স্থিতি বিদ্যমান। অবৈধ অনুপ্রবেশ আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। জমির পরিমাণ- ৪.৫০ একর।”
তবে আদালতের স্থিতাবস্থার নোটিস ঝুলানো হলেও সরেজমিন ঠিক তার বিপরীত চিত্র দেখা গেছে। সেখানে রাজমিস্ত্রি ও শ্রমিকদের দিয়ে পাকা ইটের দেয়াল নির্মাণ এবং প্লট তৈরির কাজ প্রকাশ্যে চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
স্থানীয়দের উদ্বেগ ও কোটি টাকার বাণিজ্য : স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিগত দিনে এই জায়গাটি সম্পূর্ণ উন্মুক্ত ছিল। কিন্তু সম্প্রতি হঠাৎ একটি চক্র রাতের আঁধারে টিনের সীমানা প্রাচীর দিয়ে পুরো সাড়ে চার একর জমি নিয়ন্ত্রণে নেয়। পরবর্তীতে সেই জমি ছোট ছোট প্লট ও দোকানের আকার দিয়ে কোটি টাকার বিনিময়ে বিভিন্ন জনের কাছে হস্তান্তরের চক্রান্ত চলছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক ব্যবসায়ী জানান, “আদালতের রিট ও সরকারি খাস জমি (১ নং খতিয়ান) হওয়ার তথ্য নোটিসে নিজেরাও লিখে রেখেছে, আবার নিজেরাই সেখানে আদালতের নির্দেশ অমান্য করে পাকা স্থাপনা তুলছে। এটি মূলত প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে কোটি কোটি টাকার ভূমি বাণিজ্যের পাঁয়তারা।”
প্রশাসনের হস্তক্ষেপ দাবি : কক্সবাজারের প্রাণকেন্দ্রে এভাবে সরকারি বি.এস ১নং খতিয়ানের জমি দখলের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা। তারা দ্রুত জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ দাবি করে এই অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং জড়িত সংঘবদ্ধ চক্রটিকে আইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে কক্সবাজার সদর উপজেলা ভূমি কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার (ভূমি) মশিয়ুর রহমান বলেন, ‘বাতিলকৃত সরকারি প্লট হলে আমরা দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করব। বিষয়টি জানতাম না। তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করছি। যতই প্রভাবশালী হোক, সরকারি জায়গা দখল করতে দেওয়া হবে না।’
কক্সবাজার জেলা প্রশাসক (ডিসি) আ. মান্নান জানান, ‘বিষয়টি অবগত ছিলাম না। তদন্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করছি।’
কেকে/ এমএস