বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
১৫ আশ্বিন ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শিরোনাম: ● টানা তিন দফা কমার পর আবারও বাড়ল স্বর্ণের দাম      ● খাদ্যে কোটি টাকার খেলা গুদামে দুর্নীতির মহোৎসব      ● তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রক্রিয়া নিয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী      ● চার জেলায় নতুন ডিসি      ● এক দিন বেড়ে দুর্গাপূজায় টানা পাঁচ দিনের ছুটি, প্রধানমন্ত্রী বাড়ালেন অনুদানও      ● দেশে হামে মৃত্যু ছাড়ালো ১১০০      ● ডেঙ্গুতে আরও ছয়জনের মৃত্যু, সর্বোচ্চ আক্রান্ত ঢাকা বিভাগে      
খোলাকাগজ স্পেশাল
কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে: পরিচালক প্রশাসন
খাদ্যে কোটি টাকার খেলা গুদামে দুর্নীতির মহোৎসব
শাহ মোহাম্মদ রনি
প্রকাশ: বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৯:৪৯ এএম আপডেট: ৩০.০৯.২০২৬ ১১:২৮ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

খাদ্য অধিদপ্তরে চলে কোটি কোটি টাকার খেলা। গুদামে গুদামে অনিয়ম ও দুর্নীতির মহোৎসব। ঘটে আত্মসাতের ঘটনা। ময়মনসিংহ বিভাগে চলছে তুঘলকি কারবার। সিন্ডিকেটের অবস্থা পোয়াবারো। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের আধিপত্য বেড়েই চলেছে। ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে দ্বন্দ্ব হলেই বেরিয়ে আসে পুকুর চুরির যত ঘটনা। উর্ধ্বতনরা দুর্নীতিবাজদের লাগাম টানতে ব্যর্থ। দ্বন্দ্বের কারণে দুর্নীতির খবর বাইরে ছড়ায়। উর্ধ্বতনরা শুরুতে নড়েচড়ে বসলেও পরে রহস্যজনক কারণে চুপসে যান। এটাই খাদ্য অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ের স্টাইল। এদিকে দুর্নীতিতে জড়ানো কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন খাদ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) রেজা মোহাম্মদ মহসিন। মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) দৈনিক খোলা কাগজকে তিনি এ কথা জানান।

অনিয়ম, দুর্নীতি ও আত্মসাৎ পিছু ছাড়ছে না ময়মনসিংহ, নেত্রকোণা ও জামালপুর জেলা খাদ্য বিভাগের। পরিস্থিতি ‘মগের মুল্লুক’। দুর্নীতিবাজদের লাগাম টানতে ব্যর্থ হওয়ায় বাড়ছে অনিয়ম ও দুর্নীতি। নেত্রকোণার পরিস্থিতি ভয়াবহ। হাতেনাতে অনিয়ম ও দুর্নীতি ধরা পড়ার পর দুই ওসিএলএসডিকে স্ট্যান্ডরিলিজ ও বদলি এবং ভারপ্রাপ্ত জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রককে স্বপদে ফিরিয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বদলি করা হয়। পরে গুরুত্বর অপরাধ প্রমাণ হওয়ায় এক ওসিএলএসডিকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। মঙ্গলবার রাতে (২৯ সেপ্টেম্বর) এ খবর লেখার সময় পর্যন্ত অভিযুক্ত দুই উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বুধবার সংগ্রহ কার্যক্রম শেষ হওয়ার পর তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে।

জানা যায়, নেত্রকোণার দুর্নীতিবাজ ভারপ্রাপ্ত জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. মোয়েতাছেমুর রহমানের সঙ্গে আঁতাত করে কয়েকটি গুদামের ওসিএলএসডি ধান-চাল কেনায় ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি করেন। হাতেনাতে ধরা পড়েন বিরিশিরির ওসিএলএসডি মো. মেহেদী ইসলাম। দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে সিন্ডিকেটের কাছ থেকে ধান কেনায় প্রথমে স্ট্যান্ডরিলিজ পরে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত হন। সূত্র মতে, অভিযুক্ত ওসিএলএসডি মেহেদী সিন্ডিকেটের কাছ থেকে ১ হাজার ৮০০ টনের বেশি ধান কেনেন। ধান ক্রাসিং ও চাল মুভমেন্টের ক্ষেত্রেও ব্যাপক দুর্নীতি করেন। বিরিশিরিতে ১ হাজার ৯৩৭ টন ধান কেনা হয়। প্রতিটন ধানের জন্য ৩ হাজার টাকা ঘুষ নিয়ে ভারপ্রাপ্ত জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রককে ২ হাজার দিয়ে বাকি ১ হাজার করে টাকা হাতিয়ে নেন ‘ধুরন্ধর’ ওসিএলএসডি মেহেদী।

সূত্র জানায়, নেত্রকোণার বিরিশিরি গুদামে ধান কেনায় অনিয়ম ও দুর্নীতি ধরা পড়ার পরের দিন সরিয়ে দেওয়া হয় মদনের ওসিএলএসডি মো. আনিসুর রহমানকে। অধিদপ্তরের প্রজ্ঞাপনে তাকে জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে বদলি করা হয়। ০৬-০৯-২০২৬ তিনি দায়িত্ব হস্তান্তর করেন। আটপাড়ার ওসিএলএসডি অতিরিক্ত দায়িত্বে ছিলেন। ২১-০৯-২০২৬ অধিদপ্তর থেকে উপ খাদ্য পরিদর্শক শাহাদৎ হোসেনকে পদায়ন করা হয়। তিনি ২৪-০৯-২০২৬ দায়িত্ব বুঝে নেন। কলমাকান্দার ওসিএলএসডি মো. আব্দুল হাই বিরিশিরির অতিরিক্ত দায়িত্বে রয়েছেন। তিনি ১৬-০৮-২০২৬ কলমাকান্দার দায়িত্ব নেন। তাকে নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। যোগদানের পর চাল কেনায় দুর্নীতি করেন। সূত্র মতে, কলমাকান্দা ও বিরিশিরি গুদামে থাকা মজুত চাল নিম্নমানের। গুদামে নিম্নমানের চাল মজুত থাকার পরও টাকার বিনিময়ে তিনি চার্জ নেন।

জানা যায়, বোরো সংগ্রহ মৌসুমে নেত্রকোণার বারহাট্টা গুদামেও অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে। বিরিশিরির মতো সিন্ডিকেটের কাছ থেকে ধান কেনা হয় বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে। এখানে ৫৩৫ টন ধান, অতিরিক্তসহ ৪ হাজার ৫৩৮ টন ৭৫০ কেজি সিদ্ধ ও ২৯৮ টন ৯৮০ কেজি আতপ চাল সংগ্রহ করা হয়। খাদ্য পরিদর্শক আব্দুল হালিম ১৩-০৭-২০২৫ থেকে বারহাট্টার ওসিএলএসডি। সূত্র মতে, নেত্রকোণা খাদ্য বিভাগকে দুর্নীতির আখড়া বানিয়েছেন সাবেক ভারপ্রাপ্ত জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. মোয়েতাছেমুর রহমান। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের প্রভাবে ৩০-০৪-২০২৩ নেত্রকোণায় যোগদান করেন। বিভিন্ন গুদামে চালান দুর্নীতির মহোৎসব। সদর, মদন ও কেন্দুয়া গুদামে অনিয়ম, দুর্নীতি ও আত্মসাতের একাধিক ঘটনা ঘটলেও সিন্ডিকেট নিয়ে বীরদর্পে অনিয়ম ও দুর্নীতি চালিয়ে যান। ৫ আগস্ট পটপরিবর্তনের পর ভাইয়ের দোহাই দিয়ে বিএনপি সেজে খাদ্য মন্ত্রণালয় ও খাদ্য অধিদপ্তরে প্রভাব বিস্তার করেন। রেকর্ড সৃষ্টি করে ৩ বছর ৪ মাস ১৪ দিন নেত্রকোণার দায়িত্বে থাকেন। বদলি হওয়ার পর ১৩-০৯-২০২৬ দায়িত্ব পরিত্যাগ করে নেত্রকোণা ছাড়েন।

সূত্র জানায়, দুর্নীতিতে পিছিয়ে নেই জামালপুর। ভারপ্রাপ্ত জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের আসকারা ও সবুজ সংকেত পেয়ে কোনো কোনো ওসিএলএসডি ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি করেন। তাদের মধ্যে ইসলামপুর গুদামের বিতর্কিত ওসিএলএসডি ‘সেই’ দীপক সরকার অন্যতম। ১ হাজার ৬৮০ টন ধান এবং অতিরিক্তসহ ৭ হাজার ৭৬৪ টন ৯৩০ কেজি সিদ্ধ চাল সংগ্রহ করেন। টাকার বিনিময়ে সিন্ডিকেট করে ১ হাজার টনের বেশি ধান কেনা হয় বলে সূত্র দাবি করেছে। চাল কেনা ও ধান ক্রাসিংয়ের ক্ষেত্রেও দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। সূত্র মতে, সংগ্রহের কোনো কোনো সময় ইসলামপুরে ৩ দিনের মধ্যে ৩০০ থেকে ৩৫০ টন ধান-চাল সংগ্রহ দেখানো হয়। গুদামের অবস্থান ও সড়ক যোগাযোগের কারণে ওই সময়ের মধ্যে উল্লেখিত পরিমাণ ধান ও চাল কেনা অসম্ভব।

জানা যায়, ভারপ্রাপ্ত জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. আসাদুজ্জামান খান ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদারকে ‘ম্যানেজ’ করে ২৮-০৪-২০২৪ জামালপুরে যোগদান করেন। তার কারণে ক্যাডার কর্মকর্তারা জামালপুর যেতে পারেনি। ২ বছর ৫ মাসে পছন্দের ওসিএলএসডি দিয়ে অনিয়ম ও দুর্নীতি করিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। রাজশাহী বিভাগের সিরাজগঞ্জের দায়িত্ব নেওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছেন। নিজ এলাকার সখিপুর-বাসাইল আসনের এমপি মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রী আহমেদ আযম খানকে দিয়ে কলকাঠি নাড়াচ্ছেন। ২০২৪ সালে যেমনটি করেছিলেন একই আসনের ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের এমপি অনুপম শাহজাহান জয়কে দিয়ে। সূত্র মতে, আসাদুজ্জামান এসি ফুড হওয়ার আগে ০৪-০১-২০১৭ থেকে ১৬-০৫-২০১৯ পর্যন্ত পাবনার ঈশ্বরদীর এসএমও, ১৩-০৬-২০১৯ থেকে ৩০-০৯-২০২১ পর্যন্ত জামালপুরের সিংহজানীর এসএমও, ১১-১০-২০২১ থেকে ২৮-০১-২০২৪ পর্যন্ত বকশীগঞ্জ উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ছিলেন। এসি ফুড হিসেবে পদোন্নতি পেয়ে রাজশাহীর ভারপ্রাপ্ত জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক হিসেবে বদলি হন। গ্রুপিংয়ের কারণে টিকতে না পারায় জামালপুরে যোগদানের আগে পর্যন্ত আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় ঢাকায় কর্মরত ছিলেন।

সূত্র জানায়, আজ ৩০ সেপ্টেম্বর শেষ হতে যাওয়া বোরো সংগ্রহ মৌসুমে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা গুদামে। এখানে ৮৫০ টন অতিরিক্তসহ ২ হাজার ৭৬৫ টন ধান, অতিরিক্তসহ ৮ হাজার ৬৯১ টন ৭৭০ কেজি সিদ্ধ ও ২৯০ টন আতপ চাল কেনা হয়। সূত্র মতে, সিন্ডিকেট করে ২ হাজার টনের বেশি ধান কেনেন ‘ধুরন্ধর’ ওসিএলএসডি মহিউদ্দিন আল-আতাহার। ধান ক্রাসিং, চাল কেনা ও মুভমেন্ট নিয়েও তিনি ব্যাপক দুর্নীতি করেন। এ খবর লেখার সময় পর্যন্ত ময়মনসিংহ বিভাগের বিভিন্ন গুদামের অনিয়ম ও দুর্নীতি ধামাচাপা দেওয়ার প্রাণান্ত চেষ্টা চালানো হয়। এদিকে ভারপ্রাপ্ত জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের অদক্ষতার কারণে নেত্রকোণায় অপরাধের মাত্রা বেড়েছে। একই পরিস্থিতি জামালপুরের। দুই ফ্যাসিস্টের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ দীর্ঘ দিনের। তারা এর আগেও অনিয়ম ও দুর্নীতি করে অদৃশ্য খুঁটির জোরে পার পেয়ে যান।

কেকে/ এমএস


আরও সংবাদ   বিষয়:  গুদাম   দুর্নীতি   মহোৎসব  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলাকাগজ স্পেশাল- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close