সরকারি হাসপাতালে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা আধুনিক চিকিৎসা যন্ত্রপাতি বছরের পর বছর অচল। কোথাও যন্ত্রের মোড়কই খোলা হয়নি, কোথাও প্রশিক্ষিত জনবল নেই, আবার কোথাও রিএজেন্ট বা খুচরা যন্ত্রাংশের অভাবে থমকে আছে সেবা। এরই মধ্যে পরীক্ষার জন্য রোগীদের ছুটতে হচ্ছে বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে। ফলে একদিকে সরকারের বিপুল বিনিয়োগ কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ছে, অন্যদিকে বাড়ছে সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যয়। স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্টদের একাংশের অভিযোগ, এ অচলাবস্থাকে ঘিরে বছরের পর বছর ধরে একটি কমিশননির্ভর রেফারেল সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, যার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী দরিদ্র রোগীরা।
গতকাল শনিবার চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে (চমেক) আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিতের বক্তব্যে এই দীর্ঘদিনের বাস্তবতা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তিনি বলেছেন, গত ১৫ বছরে অপরিকল্পিতভাবে চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনা, দুর্নীতি এবং সমন্বিত পরিকল্পনার অভাবে দেশের সরকারি হাসপাতালে কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতি অচল অবস্থায় পড়ে আছে। কোথাও ১০ বছর আগে কেনা যন্ত্রের মোড়কও খোলা হয়নি, কোথাও যন্ত্র আছে কিন্তু চালানোর লোক নেই, আবার কোথাও রিএজেন্টের অভাবে সেবা বন্ধ।
এই বক্তব্যকে তাৎপর্যপূর্ণ মনে করছেন স্বাস্থ্য খাতের বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে গণমাধ্যম, নিরীক্ষা প্রতিবেদন এবং রোগীদের অভিযোগে যে চিত্র উঠে এসেছে, প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য তা-ই প্রতিফলিত করেছে। এখন প্রয়োজন কেবল বক্তব্য নয়, বরং দায় নির্ধারণ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
চমেকে আধুনিক যন্ত্র, কিন্তু সেবা মিলছে না : দেশের অন্যতম বৃহৎ সরকারি হাসপাতাল চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রতিদিন প্রায় পাঁচ হাজার রোগী চিকিৎসা নেন। অথচ শয্যা রয়েছে মাত্র ২ হাজার ২০০টি। রোগীর এ বিপুল চাপের মধ্যে উন্নত চিকিৎসা যন্ত্রপাতির সর্বোচ্চ ব্যবহার হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে প্রায়ই ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। হাসপাতাল-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র জানায়, এমআরআই, সিটি স্ক্যান, উন্নত ল্যাব পরীক্ষা কিংবা বিশেষায়িত রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে যন্ত্র বিকল, রিএজেন্ট সংকট বা জনবলের অভাবের কারণে অনেক সময় সেবা সীমিত হয়ে পড়ে। এতে রোগীদের বাইরে পরীক্ষা করাতে বাধ্য হতে হয়।
রোগী কোথায় যায় : হাসপাতালের বাইরে অপেক্ষমাণ রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সরকারি হাসপাতালে পরীক্ষা সম্ভব না হলে অনেককে নির্দিষ্ট বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। একাধিক রোগী দাবি করেন, সরকারি হাসপাতালে স্বল্প খরচে হওয়ার কথা যে পরীক্ষা, বাইরে গিয়ে তার জন্য কয়েক গুণ বেশি অর্থ গুনতে হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিকার নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিদের অভিযোগ, সরকারি হাসপাতালের যন্ত্রপাতি দীর্ঘদিন অচল থাকলে এর আর্থিক সুবিধা শেষ পর্যন্ত বেসরকারি খাতই পেয়ে থাকে। তবে কমিশনের বিনিময়ে রোগী পাঠানোর অভিযোগের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন বলেও তারা মত দেন।
যন্ত্র কেন চলে না : স্বাস্থ্য প্রকৌশল ও হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যার মূল কারণ কয়েকটি- প্রয়োজন নিরূপণ ছাড়াই যন্ত্র কেনা; প্রশিক্ষিত মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারের ঘাটতি; রক্ষণাবেক্ষণের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব; রিএজেন্ট ও খুচরা যন্ত্রাংশ সরবরাহে অনিয়ম বা বিলম্ব; যন্ত্র চালুর পর নিয়মিত তদারকির অভাব। তাদের মতে, যন্ত্র কেনার সময়ই পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় জনবল নিশ্চিত না করলে কয়েক কোটি টাকার যন্ত্রও অল্প সময়ের মধ্যে অকেজো হয়ে যায়।
শিক্ষক-চিকিৎসক সংকটও ভয়াবহ : চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের উদাহরণ তুলে ধরে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী জানান, কলেজটিতে প্রায় ২০০টি অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক ও সহকারী অধ্যাপকের পদ শূন্য। একইসঙ্গে দেশের বিভিন্ন মেডিকেল কলেজে বেসিক সায়েন্স বিষয়ের শিক্ষকেরও তীব্র সংকট রয়েছে। চিকিৎসক, নার্স ও মেডিকেল টেকনোলজিস্টের ঘাটতি পূরণ ছাড়া আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
জবাবদিহির প্রশ্ন : স্বাস্থ্য খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন সবচেয়ে জরুরি হলো দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে থাকা সব উচ্চমূল্যের চিকিৎসা যন্ত্রপাতির একটি জাতীয় অডিট করা। কোন হাসপাতালে কত যন্ত্র আছে, কতগুলো সচল, কতগুলো অচল, কেন অচল এবং দায় কার, এসব তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। একইসঙ্গে সরকারি হাসপাতাল থেকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে রোগী রেফার করার অভিযোগগুলোও স্বাধীনভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।
রাষ্ট্রের অর্থে কেনা যন্ত্র যদি বছরের পর বছর ব্যবহারই না হয়, আর রোগীকে যদি শেষ পর্যন্ত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দ্বারস্থ হতে হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই সমস্যা কি কেবল অব্যবস্থাপনা, নাকি এর আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে উঠেছে এক অদৃশ্য ‘রেফারেল অর্থনীতি’? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করাই এখন স্বাস্থ্য খাতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
কেকে/এলএ