দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে দিন দিন শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমছে। শিক্ষার পরিবেশ, মান ও অবকাঠামোগত সংকটের কারণে অনেক সচ্ছল অভিভাবক কিন্ডারগার্ডেন বা বেসরকারি স্কুলগুলোর দিকে ঝুঁকছেন। এ ছাড়া স্বল্প আয়ের অভিভাবকদের মধ্যে মাদ্রাসায় ভর্তি করানোর প্রবণতাও বাড়ছে। এতে শিক্ষার্থীরা হারাচ্ছে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (ডিপিই) সূত্রে জানা গেছে, ২০২০ সালে দেশে প্রাথমিকে শিক্ষার্থী ছিল ২ কোটি ১৫ লাখের বেশি; এর চার বছর পর, ২০২৪ সালে তা কমে দাঁড়ায় ২ কোটি ১ লাখ ৮৩ হাজার জনে। অর্থাৎ চার বছরে প্রাথমিকে শিক্ষার্থী কমে ১৩ লাখের মতো। এদিকে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সাম্প্রতিক প্রতিবেদন বলছে, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে প্রাথমিক স্তরে সামগ্রিক ভর্তি কমেছে ৭ শতাংশ।
শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে অসন্তোষ :
ছোট্ট জিহান সাবাকে ভর্তি করার জন্য নিয়ে আসা হয়েছে রাজধানীর উত্তর যাত্রাবাড়ির লিটল ডায়মন্ড স্কুলে। মেয়ে জিহান সাবাকে নিয়ে আসেন জিনাত আরা। তিনি বলেন, প্রাথমিক স্কুলগুলোতে ছাত্রছাত্রী অনেক। তারা ভীষণ দুষ্ট। তাদের সঙ্গে মারামারি করেছে আমার মেয়ে। তাছাড়া সেখানে পড়াশোনার পরিবেশ ভালো না, এ কারণে তাকে এবার কিন্ডারগার্টেন স্কুলে ভর্তি করার কথা ভাবছি।
এ বিষয়ে লিটল ডায়মন্ড ইংলিশ স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা শাহনাজ নাসরিন বলেন, ‘এখানে ২০ জন ছাত্রের জন্য একজন শিক্ষক নিযুক্ত আছে। তাদের আমরা এমনভাবে প্রস্তুত করি, যাতে তারা পরবর্তীতে মতিঝিল অইডিয়াল বা সেন্ট জোসেপে চান্স পায়। এখানে কোনো মারামারির সুযোগ নেই।’
বাচ্চাদের মারামারির বিষয়ে ব্রাহ্মণচিরণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের (বেগমগঞ্জ স্কুল) প্রধান শিক্ষিকা রোকসানা মমতাজ বলেন, ‘বাচ্চারা তো দুষ্টামি করবেই। অনেক ছাত্র-ছাত্রীকে নিয়ন্ত্রণ করি আমরা। সব সময় তাদের নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। শিশুরা মারামারি করে পরে আবার মিলে যায়। এ বয়সে তো সবাই এ রকমটা করে।’
এদিকে শিক্ষার্থী বেশি হওয়ার কারণে সরকারি প্রাথমিকে ঝরে পড়ার হারও বেশি। এ বিষয়ে ব্রাহ্মণচিরণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা জাকিয়া আক্তার ও সকিনা বলেন, আমাদের বিদ্যালয়ে অল্প সংখ্যক ছাত্রছাত্রী ঝরে পড়ে। তাদের বেশিরভাগই ছিন্নমূল পরিবারের। অনেকে এতটাই গরিব যে টাকা উপার্জনের জন্য অন্য এলাকায় চলে যায়, তখন তাদের শিশু পড়া থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে।
শিক্ষক সংকট :
অভিভাবকদের অভিযোগ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছাত্র সংখ্যার অনুপাতে শিক্ষক কম। এ কারণে ছাত্রদের সঠিকভাবে পাঠদান করা সম্ভব হয় না। তাই তারা তাদের সন্তানদের কিন্ডারগার্টেন স্কুলে ভর্তি করেন। বিশেষ করে সচ্ছল অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করছেন না।
এ বিষয়ে স্কলার্স প্রি-ক্যাডেট অ্যান্ড হাইস্কুলের প্রিন্সিপাল শিরিন আক্তার বলেন, ‘আমরা ১৫-২০ জন ছাত্রের জন্য একজন শিক্ষক/শিক্ষিকা নিয়োগ দিয়েছি। আমরা বাচ্চাদের খুব যত্ন সহকারে পড়াই। পাঠদানের বিষয়ে আমরা ছাত্রদের আভিভাবকদের কাছে দায়বদ্ধ।’
অপরদিকে ধোলাইপাড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আনিসুর রহমান আনিস বলেন, ‘আমরা আমাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করি। কিন্তু, অসংখ্য ছাত্রছাত্রী প্রায় এক হাজারের ওপরে, বিপরীতে আমরা মাত্র ২০ জন শিক্ষক। এরপরও আমরা ভালোভাবে পাঠদান করার চেষ্টা করছি। শ্রমজীবী মানুষের শিশুদের জন্য বিশেষভাবে চেষ্টা করা হয়। আমাদের স্কুলে ঝড়ে পড়ার হার কম।’
এসব অভিযোগের বিষয়ে শিক্ষাবিদ ও সাবেক তত্ত্ববধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অনেক আগে থেকেই অব্যস্থাপনা চলছে। অসংখ্য শিক্ষক ছুটি নিয়ে বিদেশে গিয়ে আর ফিরে আসেননি, কিন্তু তাদের অ্যাকাউন্টে বেতন ঢুকছে। ছাত্র সংখ্যার তুলনায় শিক্ষক কম। কোভিডের সময় থেকেই শিক্ষক সংকট লেগেই আছে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছাত্র ভর্তির প্রতি জোর দেওয়া হলেও শিক্ষক নিয়োগে জোর নেই।
তিনি বলেন, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার পরিবেশ থাকলেও শিক্ষক নেই, আবার শিক্ষক থাকলে পরিবেশ নেই— এ রকম একটি দ্বৈত সংকট চলছে। এটা মূলত এখন গরিব মানুষের স্কুল হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে। এ কারণে সচ্ছল পরিবারগুলো তাদের সন্তানদের কোচিং করাচ্ছেন বা গাইড বই পড়াচ্ছেন। অনেকে সন্তানদের বেসরকারি কিন্ডারগার্টেন স্কুল ও মাদ্রাসায় ভর্তি করছেন। আমরা অনুরোধ করেছি সমন্বিত শিক্ষা ব্যবস্থা প্রণয়ন করতে, যাতে বৈষম্য কমে। কিন্তু, শিক্ষার থেকে কোনো কিছু সঠিকভাবে এগুচ্ছে না।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংকটের সমাধানের বিষয়ে তিনি বলেন, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার পরিবেশ ঠিক রাখতে সাধারণ জনগণকে ভূমিকা রাখতে হবে। সরকারি আমলারা সব দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নিলে সমাধান হবে না, এ বিষয়ে নজরদারির জন্য আমজনতাকেও সম্পৃক্ত করতে হবে। উদাহরণ স্বরূপ যেসব বিদ্যালয়ে ‘মিড ডে মিল’-এর কমিটিতে ছাত্রছাত্রীদের মায়েদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, সেখানে খাবারের মান নিয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠেনি। একইসঙ্গে শিক্ষকদের নিয়োগে ও প্রশিক্ষণে দুর্নীতি দূর করতে হবে। শিক্ষায় শুধু বাজেট বাড়িয়ে বা অবকাঠামো নির্মাণ করে সমস্যার সমাধান হবে না, শিক্ষকদের দক্ষতা বাড়াতে পদক্ষেপ নিতে হবে। ঝড়ে পড়া বাচ্চাদেরও আবারও স্কুলে ফিরিয়ে আনতে হবে।
এসব সমস্যার সমাধানের বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রফেসর ড. তাপস কুমার বিশ্বাস বলেন, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছাত্র ও শিক্ষকের অনুপাত ধীরে ধীরে একটি সহনশীল পর্যায়ে আসবে। সরকার শিক্ষক নিয়োগ দিচ্ছে, ভবিষ্যতে আরও শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে। আগে নিয়োগপ্রাপ্ত টিচাররা দুর্বল, তাদের প্রশিক্ষণ, মনিটরিং ও স্কুল ম্যানেজমেন্টের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখত হবে। স্কুলেই ছাত্রদের পাঠদান সম্পন্ন করতে হবে। শিক্ষকরা যাতে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করে তার জন্য সরকার ও সাধারণ জনগণকে সমন্বিত ভূমিকা রাখতে হবে। একইসঙ্গে ‘মিড ডে মিলে’ পুষ্টিকর খাবার দিতে হবে। কারণ নিম্নবিত্ত পরিবারের অনেক শিশু সকালে না খেয়ে স্কুলে আসে। এ কারণে তারা যদি সুষম খাবার না পায়, তবে সঠিকভাবে পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারবে না। তাই প্রত্যেক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ‘মিড ডে মিল’ বাধ্যতামূলক করতে হবে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ইউনিটের পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) মো. আব্দুল হালিম ভুঁঞা বলেন, আমরা চেষ্টা করি প্রতিটি জেলা ধরে ধরে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অভিযান চালাতে। এর মাধ্যমে বেশিরভাগ শিক্ষক এখন সচেতন হয়েছেন এবং সঠিকভাবে পাঠদান করছেন। কিন্তু, কিছু ক্ষেত্রে সমস্যা রয়ে গেছে। বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়ন পরীবিক্ষণ ইউনিটের জনবল কম, তারপরও আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। অনেক সময় আমরা শাস্তি হিসেবে বিভিন্ন শিক্ষককের পদানবতি করে থাকি। অনেককে সাসপেন্ডও করা হয়েছে। এভাবে আমরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোকে শৃংখলার মধ্যে আনতে চেষ্টা করছি। ধীরে ধীরে এসব বিদ্যালয়ের অন্যান্য সংকটও কেটে যাবে। কারণ এসব বিষয়ে সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সময় লাগবে।
কেকে/এআই