দেশে শিশু নিখোঁজের বিষয়ে হিমশীতল করা তথ্য সামনে এসেছে। গত ছয় মাসে অন্তত ৩ হাজার ৪০০ শিশু নিখোঁজের ঘটনা ঘটেছে। নানাভাবে এসব শিশু নিখোঁজ রয়েছে। কেউ হারিয়ে গেছে। কেউ অপহরণের শিকার হয়েছে। কেউবা আবার বাড়ি বা কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে নিজে নিজে বের হয়ে গেছে। এই তথ্য খোদ শিশু সুরক্ষা নিয়ে কাজ করা ‘মুন এলার্ট’ নামক একটি প্রতিষ্ঠানের। বিষয়টি নজরে আসার পরপরই দেশে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংখ্যাটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; বরং এটি শিশু নিরাপত্তা, মানবপাচার, পারিবারিক সংকট এবং আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার জন্য বড় ধরনের সতর্ক সংকেত। দেশে সবকিছু কার্যকর থাকার পরও এমন ঘটনা মারাত্মক ভয়ের বার্তা দেয়। এ ঘটনায় দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিপর্যয় সামনে এসেছে। সরকারকে বিষয়টি নিয়ে জোরালভাবে কাজ করতে হবে।
জানা গেছে, মুন এলার্ট বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় জরুরি শিশু অনুসন্ধান ও সতর্কতা ব্যবস্থা। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সিআইডির মিসিং চিলড্রেন সেলের উদ্যোগে এটি চালু হয়। যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাম্বার এলার্ট ব্যবস্থার আদলে গড়ে ওঠা এই প্ল্যাটফর্মের লক্ষ্য হলো কোনো শিশু নিখোঁজ বা অপহৃত হওয়ার তথ্য যাচাইয়ের পর দ্রুত সারা দেশে সতর্কবার্তা ছড়িয়ে দিয়ে তাকে উদ্ধারে জনসাধারণ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, গণমাধ্যম এবং প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মকে একসঙ্গে যুক্ত করা। ফেসবুক, ডিজিটাল বিলবোর্ড, সংবাদমাধ্যমসহ বিভিন্ন সামাজিকমাধ্যমে নিখোঁজ শিশুর তথ্য দ্রুত প্রচারের মাধ্যমে উদ্ধারের সময় কমিয়ে আনার চেষ্টা করে মুন এলার্ট।
প্রতিষ্ঠানটি তাদের ওয়েবসাইটে নিখোঁজ অনেক শিশুর বিষয়ে তথ্য শেয়ার করেছে- সেগুলো থেকে কিছু উল্লেখ করা হলো-
নিখোঁজ হওয়া কয়েকজন শিশুর তথ্য : সবশেষ চলতি বছরের গত ৩১ জুলাই সন্ধ্যা আনুমানিক ৭টার দিকে রাজধানীর নিউমার্কেট থানার এলিফ্যান্ট রোডের কাঁটাবন ঢাল এলাকায় অবস্থিত আল-খাইর আইডিয়াল মাদ্রাসা থেকে মো. সিয়াম মিয়া (১০) নামের একটি শিশু নিখোঁজ হয়। পরিবারের তথ্যানুযায়ী, ওই সময়ের পর থেকে শিশুটির আর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। সম্ভাব্য সব জায়গায় খোঁজাখুঁজি করার পর এখন পর্যন্ত তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
ঢাকেশ্বরী থেকে নিখোঁজ ১২ বছর বয়সি জাকারিয়া মেহরাব : গত ২৭ জুলাই রাত আনুমানিক সাড়ে ১০টার দিকে চকবাজার থানার ২৭নং ওয়ার্ড ঢাকেশ্বরীর হোসনি দালান শিয়া গলি এলাকা থেকে ১২ বছর বয়সি মো. জাকারিয়া মেহরাব নিখোঁজ হয়। পরিবারের দাবি- ওই সময় থেকে শিশুটির আর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। সম্ভাব্য সব জায়গায় খোঁজাখুঁজি করেও এখন পর্যন্ত তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
১৩ বছর বয়সি অয়ালিদ হাসান শাওন নিখোঁজ : গত ১১ জুলাই সকাল আনুমানিক ৭টার দিকে যশোর সদরের রেলগেট থেকে মাদ্রাসার উদ্দেশে রওনা দেওয়ার পথে ১৩ বছর বয়সি অয়ালিদ হাসান শাওন নিখোঁজ হয়। পরিবারের তথ্যানুযায়ী, ওই সময় থেকে এখন পর্যন্ত শিশুটির কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
গেন্ডারিয়া থেকে নিখোঁজ আব্দুল হাদি : গত ২৯ জুলাই বিকেল আনুমানিক ৩টার দিকে রাজধানীর গেন্ডারিয়া থানাধীন মুরগিটোলা মোড়, ওয়ার্ড নং-৪৫ এলাকা থেকে আব্দুল হাদি (১২) নামের একটি শিশু নিখোঁজ হয়। পরিবারের তথ্য অনুযায়ী, ওই সময়ের পর থেকে এখন পর্যন্ত শিশুটির কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
পার্বতীপুর থেকে নিখোঁজ মোহায়মিনুল ইসলাম : গত ২৭ জুলাই সন্ধ্যা আনুমানিক ৭টা থেকে সাড়ে ৭টার দিকে দিনাজপুর জেলার পার্বতীপুর থানাধীন ১ নম্বর ওয়ার্ডের দৌলতপুর উত্তর এলাকা থেকে ১১ বছর বয়সি শিশু মো. মোহায়মিনুল ইসলাম নিখোঁজ হয়। পরিবারের তথ্য অনুযায়ী, ওই সময় থেকে শিশুটির আর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
উদ্ধার হওয়া অনেক শিশুর তথ্যও প্রকাশ করেছে মুন এলার্ট : মুন এলার্ট কিছু শিশুকে খুঁজে পেয়েছে, যাদের কোনো ঠিকানা এখনো পাওয়া যায়নি। খুঁজে পাওয়া ঐসব শিশুকে বিভিন্ন কেন্দ্রে রাখা হয়েছে। এর মধ্যে খুঁজে পাওয়া একটি ছেলে শিশুর বয়স চার বছর। তার কোনো ঠিকানা মেলেনি। তাকে কুমিল্লার সরকারি শিশু পরিবারে রাখা হয়েছে।
শিশু জুনাইদ উদ্ধার : গত ২৫ জুলাই ঢাকা জেলার উত্তরা পশ্চিম থানাধীন দিয়াবাড়ির নয়ানগর খেলার মাঠ এলাকা থেকে নিখোঁজ হওয়া ৯ বছর বয়সি বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশু জুনাইদকে পুলিশের সাহায্যে উদ্ধার করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার নিখোঁজের সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর শিশুটির সন্ধান মেলে এবং পরবর্তীতে তাকে নিরাপদে উদ্ধার করা সম্ভব হয়। সে বর্তমানে সম্পূর্ণ নিরাপদে রয়েছে।
শিশু আজোয়াদ আয়ান উদ্ধার : গত ২৬ জুলাই ঢাকা জেলার মোহাম্মদপুর থানার নূরজাহান রোড এলাকা থেকে নিখোঁজ হওয়া ৭ বছর বয়সি শিশু আজোয়াদ আয়ানকে উদ্ধার করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার নিখোঁজের সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর শিশুটির সন্ধান মেলে এবং পরবর্তীতে তাকে নিরাপদে উদ্ধার করা সম্ভব হয়। সে বর্তমানে সম্পূর্ণ নিরাপদে রয়েছে।
মুন এলার্টের তথ্যানুযায়ী, নিখোঁজ হওয়া শিশুদের সবাই অপহরণের শিকার নয়। অনেক শিশু পরিবার ছেড়ে চলে যায়, কেউ পথ হারায়, কেউ আবার বিভিন্ন অপরাধচক্রের ফাঁদে পড়ে। তবে প্রতিটি নিখোঁজের ঘটনাকেই ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কারণ, প্রথম কয়েক ঘণ্টাকেই শিশু উদ্ধারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে ধরা হয়।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, অনেক ক্ষেত্রেই নিখোঁজের পর অভিযোগ করতে পরিবার দেরি করে। আবার সামাজিক লজ্জা, পারিবারিক দ্বন্দ্ব কিংবা ভুল ধারণার কারণেও অনেক ঘটনা শুরুতে পুলিশের কাছে পৌঁছায় না। এতে গুরুত্বপূর্ণ সময় নষ্ট হয় এবং শিশুকে উদ্ধারের সম্ভাবনা কমে যায়। এর মধ্যে অপরাধী চক্রগুলো তাদের নিরাপদ স্থানে চলে যায়। অনেক ঘটনায় শিশুর পরিবারে ফোন দিয়ে মোটা অংকের টাকা আদায় করে। অনেক ঘটনায় সংশ্লিষ্ট শিশু হত্যার শিকারও হয়ে থাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো শিশু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাড়ি না ফিরলে অপেক্ষা না করে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানো উচিত। কারণ, দেরি করলে অনেক সময়ই অপরাধী চক্রকে শনাক্ত করতে বেগ পেতে হয়। একটি জায়গা থেকে মোবাইল ফোন বন্ধ করে যদি তারা ভিন্ন জায়গায় চলে যাওয়ার জন্য বেশি সময় পায় তাহলে তাদের শনাক্ত করতে কষ্ট হয়।
শিশু অধিকারকর্মীরা বলছেন, নিখোঁজ শিশুদের একটি অংশ পরে পরিবারের কাছে ফিরে এলেও একটি অংশ মানবপাচার, জোরপূর্বক শ্রম, যৌন নির্যাতন কিংবা সংগঠিত অপরাধচক্রের ঝুঁকিতে পড়ে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী এলাকা, বড় শহর এবং পরিবহন কেন্দ্রগুলোকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
এদিকে, মুন এলার্ট চালুর পর কয়েকটি উল্লেখযোগ্য উদ্ধার অভিযানে সফলতাও এসেছে। এর মধ্যে ঢাকার মিরপুর থেকে নিখোঁজ এক শিশুকে মাত্র ২৩ ঘণ্টার মধ্যে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিল। এ ছাড়া ফেসবুক ও অন্যান্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সতর্কবার্তা দেখে সাধারণ মানুষের তথ্যের ভিত্তিতেও কয়েকটি শিশু পরিবারের কাছে ফিরে এসেছে।
সংশ্লিষ্টরা স্বীকার করেন, দেশের প্রতিটি থানা, ব্যাংকের ডিজিটাল ডিসপ্লে, পরিবহন কেন্দ্র এবং স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ সমন্বয় এখনো গড়ে ওঠেনি। ফলে জাতীয় পর্যায়ের এই সতর্কতা ব্যবস্থা এখনো পুরো সক্ষমতায় পৌঁছাতে পারেনি।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, মুন এলার্ট কার্যকর করতে শুধু প্রযুক্তি নয়, প্রয়োজন জনসচেতনতা। মানুষ যদি সতর্কবার্তাকে গুরুত্ব দেয়, সন্দেহজনক কিছু দেখলে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানায় এবং নিখোঁজ শিশুর তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে দেয়, তাহলে উদ্ধারের হার আরও বাড়তে পারে।
শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর মতে, নিখোঁজের সংখ্যা কমাতে পরিবার, বিদ্যালয়, স্থানীয় প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে অনলাইন নিরাপত্তা, শিশুদের ডিজিটাল সচেতনতা এবং মানবপাচার প্রতিরোধেও জোর দিতে হবে।
সচেতনতা ও করণীয় : বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো শিশু বা কোনো ব্যক্তি নিখোঁজ হলে নিকটস্থ থানায় জিডি (সাধারণ ডায়েরি) করা বাধ্যতামূলক। এটি চেপে রাখা বা কোনো কারণে ভয় পেয়ে চুপ থাকা উচিত নয়। প্রয়োজনে মূলধারার সংবাদমাধ্যমের সঙ্গেও যোগাযোগ করা যেতে পারে। বিষয়টি সামাজিকমাধ্যমেও ছড়িয়ে দেওয়া জরুরি।
বাসামালিকের সঙ্গে ঘরে ঢুকলেও আর বের হয়নি ইব্রাহিম:
রাজধানীর পল্লবী থেকে গত দুই মাসে হারিয়ে গেছে দুজন শিশু। এ ঘটনায় দুটি মামলা হলেও আজ পর্যন্ত এর কূলকিনারা হয়নি। গত ১৩ মে সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিটে পল্লবী থানা এলাকা থেকে নিখোঁজ হয় ৫ বছর বয়সি শিশু ইব্রাহিম। ঘটনার চার দিন পর সংগ্রহ করা এক সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়- সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিটে ইব্রাহিমরা যে বাসায় ভাড়া থাকে সেই বাসামালিকের পেছনে পেছনে বাসায় প্রবেশ করে ইব্রাহিম। এর ১০ মিনিট পর শিশু কণ্ঠের একটি চিৎকার শোনা যায়। কিন্তু রাত ১২টা পর্যন্ত ঐ সিসিটিভি ফুটেজে ইব্রাহিমকে বের হতে বা তাকে আর দেখা যায়নি। তাহলে ইব্রাহিম গেল কোথায়?
এ ঘটনায় ভুক্তভোগী ইব্রাহিমের বাবা বলেন, আমাদের সঙ্গে কারও কোনো ঝামেলা ছিল না। এমন কেন ঘটল বুঝতে পারছি না। এ ঘটনায় মামলা করলাম। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী শুধু তদন্ত করছে। কিন্তু কোনো কূলকিনারা হলো না। এমনকি বাড়িওয়ালাকেও আইনের আওতায় আনা হলো না। মা বাড়িওয়ালাকে দায়ী করে বলেন, তাকে (বাড়িওয়ালা) আইনের আওতায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করলেই থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে।
এদিকে এ মামলাটির তদন্তের দায়িত্বে থাকা পল্লবী থানার উপপরিদর্শক মিজানুর রহমান মিজান বলেন, মামলাটি আমি তদন্ত করছিলাম। এর মধ্যে বাদী ডিবিতে আবেদন করায় মামলাটি ডিবিতে চলে যায়।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার এনএম নাসিরুদ্দিন খোলা কাগজকে বলেন, ‘শিশু নিখোঁজের আলাদা কোনো পরিসংখ্যান নেই। তবে হারিয়ে যাওয়ার ঘটনায় করা সাধারণ ডায়েরি (জিডি) আমরা সংরক্ষণ করি। এসব জিডিতে শিশু, নারী, বয়স্কসহ সব বয়সি মানুষের তথ্য রয়েছে। এসব ঘটনায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’
কেকে/এলএ