শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬,
১৭ আশ্বিন ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬
শিরোনাম: ● বাংলাদেশকে ৯ গোল দিয়ে আসিয়ান কাপের ফাইনালে ইন্দোনেশিয়া      ● স্বৈরাচার-গুপ্ত দল আবার এক হয়েছে : প্রধানমন্ত্রী      ● যাত্রা শুরু করল বিশেষায়িত ‘সাইবার পুলিশ ইউনিট’      ● ডেঙ্গুতে আরও চারজনের মৃত্যু, হাসপাতালে নতুন ভর্তি ১৯৭৮      ● হামে আরও দুই শিশুর মৃত্যু, নতুন আক্রান্ত ১২১৪      ● সংরক্ষিত আসন-২৩ শূন্য ঘোষণা      ● অরাজকতা সৃষ্টির পাঁয়তারায় কিছু দল : প্রধানমন্ত্রী      
খোলাকাগজ স্পেশাল
গ্যাস সিলিন্ডার ঘিরে লাগামহীন নৈরাজ্য
রবিউল ইসলাম
প্রকাশ: শুক্রবার, ২ অক্টোবর, ২০২৬, ৯:৩৪ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

রাজধানীর অনেক বাসাবাড়িতে পাইপলাইনের গ্যাসের সংযোগ থাকলেও চুলায় ঠিকমতো গ্যাস মিলছে না। ফলে রান্নার কাজে দিন দিন বাড়ছে এলপিজি সিলিন্ডারের ওপর নির্ভরতা। কিন্তু বিকল্প এই জ্বালানিতেও স্বস্তি নেই। এলপিজি সিলিন্ডারের বাজার ঘিরে চলছে এক ধরনের লাগামহীন নৈরাজ্য। কোথাও কৃত্রিম সংকট তৈরি করে, আবার কোথাও সরবরাহ কম থাকার অজুহাতে নির্ধারিত দামের চেয়ে কয়েকশ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) সেপ্টেম্বর মাসের জন্য ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণ করেছে ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। অথচ খুচরা বাজারে একই সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত। অর্থাৎ ভোক্তাকে সিলিন্ডারপ্রতি বাড়তি গুনতে হচ্ছে ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত। কোথাও কোথাও বেশি দাম দিয়েও সহজে মিলছে না সিলিন্ডার।

বাড়তি দামেও মিলছে না সিলিন্ডার, বাড়ছে ক্ষোভ : 

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় খুচরা দোকানে সিলিন্ডার কিনতে গিয়ে বিক্রেতাদের সঙ্গে গ্রাহকদের বাকবিতণ্ডায় জড়ানোর ঘটনা ঘটছে। ভোক্তাদের অভিযোগ, বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে একশ্রেণির ব্যবসায়ী ইচ্ছামতো দাম আদায় করছেন। বিইআরসির নির্ধারিত দামের কথা বললে অনেক দোকানি সিলিন্ডার নেই বলে জানিয়ে দিচ্ছেন। আবার বেশি দাম দিতে রাজি হলে ঠিকই মিলছে সিলিন্ডার।

বিক্রেতাদের ভাষ্য, তারা নিজেরাই পর্যাপ্ত সরবরাহ পাচ্ছেন না। বেশি দামে কিনতে হচ্ছে বলে বেশি দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। তবে ভোক্তাদের প্রশ্ন, সরবরাহ সংকট থাকলে একই পণ্য বেশি দামে কীভাবে পাওয়া যাচ্ছে এবং নির্ধারিত দামে কেন মিলছে না? 

রাজধানীর মালিবাগ এলাকার বাসিন্দা সালমা পারভীন কয়েক বছর ধরে সেখানে ভাড়া থাকেন। বাসায় পাইপলাইনের গ্যাসের সংযোগ থাকলেও নিয়মিত সরবরাহ না থাকায় চুলা জ্বলে না। বাধ্য হয়ে রান্নার কাজে এলপিজি সিলিন্ডারের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে তাকে। নগরজীবনে সালমা পারভীনের মতো লাখো পরিবারের জন্য রান্নার অন্যতম প্রধান জ্বালানি হয়ে উঠেছে এলপিজি। কিন্তু বাড়তি দামে সিলিন্ডার কিনতে গিয়ে ক্ষুব্ধ তিনি।

শনির আখড়ার চা বিক্রেতা আলম হায়দার জানান, সম্প্রতি তিনি ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার কিনেছিলেন ১ হাজার ৬০০ টাকায়। কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে একই সিলিন্ডারের জন্য তাকে দিতে হয়েছে ২ হাজার ২০০ টাকা। এখন সেই দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ টাকায়।

আমদানি কমেছে ২৫ শতাংশ : 

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্যানুযায়ী, আগস্টে দেশে প্রায় ১ লাখ ৫৮ হাজার টন এলপিজি আমদানি হয়েছিল। ওই মাসে ১৩টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এলপিজি আমদানি করে। আর সেপ্টেম্বরের ২২ তারিখ পর্যন্ত আমদানি হয়েছে প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার ৭৪২ টন। মাসের পুরো হিসাব না হলেও আগের মাসের তুলনায় আমদানির গতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। খাতসংশ্লিষ্টদের হিসাবে, সেপ্টেম্বরের মোট আমদানি আগস্টের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ কমে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

যদিও জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক এক সভায় এলপিজি অপারেটররা দাবি করেন, দেশে এলপিজির সরবরাহ ও মজুত পরিস্থিতি ভালো রয়েছে এবং বর্তমানে কোনো ধরনের সংকট নেই। কিন্তু আমদানি কমে যাওয়া, কার্গো না পাওয়ার অভিযোগ এবং খুচরা বাজারে সিলিন্ডারের বাড়তি দাম—এই তিন বাস্তবতার মধ্যে কতটা সামঞ্জস্য রয়েছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মন্ত্রীর ঘোষণাতেও ফিরছে না স্বস্তি : 

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, দেশে এলপিজির সংকট নেই। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ দুদিন আগে জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে এক জরুরি ভার্চুয়াল বৈঠকে বলেছেন, দেশে এলপিজি সরবরাহে কোনো ঘাটতি নেই। তবে কোথাও কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রি করা হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে জেলা প্রশাসকদের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।

বিইআরসির তথ্যানুযায়ী, দেশে এলপিজি ব্যবসার লাইসেন্স রয়েছে ৫২টি প্রতিষ্ঠানের। এর মধ্যে ৩২টি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব সিলিন্ডারজাতকরণ প্ল্যান্ট রয়েছে। আমদানির সক্ষমতা রয়েছে ২৩টি প্রতিষ্ঠানের। তবে নিয়মিত এলপিজি আমদানি করে মূলত ৮ থেকে ৯টি প্রতিষ্ঠান।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত বছরের শেষ তিন মাসে এলপিজি আমদানি কমে যাওয়ায় বাজারে সংকট তৈরি হয়েছিল। এবারও আমদানি কমতে শুরু করায় সরবরাহব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। ফলে সরকার সংকট নেই বললেও বাজারের বাস্তব চিত্রে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।

দাম বাড়ছে কেন : 

আমদানিকারকদের দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির দাম বেড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটায় কার্গো সংকট তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে জাহাজভাড়াও।

এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) দাবি, যেসব প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি আমদানি চুক্তি রয়েছে, তারাও চুক্তিবদ্ধ পরিমাণের তুলনায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কম সরবরাহ পাচ্ছে। খোলাবাজার বা স্পট মার্কেট থেকেও কার্গো সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

বিইআরসির মূল্য নির্ধারণের সময় আমদানি প্রিমিয়াম হিসেবে ১৬০ ডলার ধরা হয়েছিল। আমদানিকারকদের দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে সেই প্রিমিয়াম বেড়ে এখন ২৬০ থেকে ৪০০ ডলারে পৌঁছেছে। ফলে বিইআরসির নির্ধারিত দামে এলপিজি বিক্রি করলে আমদানিকারকদের লোকসান গুনতে হচ্ছে।

কার্যকর তদারকির দাবি : 

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন গণমাধ্যমকে বলেন, বিইআরসি, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর বা সংশ্লিষ্ট কোনো সংস্থার কার্যকর তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না। এলপিজির বাজারে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যে বেশি দাম দিলে পণ্য পাওয়া যাচ্ছে, অথচ নির্ধারিত দামে পাওয়া যাচ্ছে না।

তিনি বলেন, বাজারকে এভাবে ব্যবসায়ীদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হলে তারা নিজেদের মতো করে বাজার নিয়ন্ত্রণ করবে। ভোক্তারা কোনো জায়গা থেকে সহায়তা না পেয়ে অসহায়ভাবে তাদের কাছ থেকেই পণ্য কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। দীর্ঘদিন ধরে সিন্ডিকেটের কথা বলা হলেও সরকার কেন কার্যকরভাবে তা ভাঙতে পারছে না, সেটি বড় প্রশ্ন। বাজারে এ ধরনের অনিয়ম চলতে থাকলে শেষ পর্যন্ত এর খেসারত দিতে হচ্ছে ভোক্তাকেই।

তিনি আরও বলেন, সমস্যাটি শুধু এলপিজির ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয়। মুদি, কসমেটিকস, টয়লেট্রিজসহ প্রায় সব ধরনের পণ্যের দামই বাড়ছে। তেলের দাম বাড়ার পর আটা, সুজি, চিনি, চাল, পোলাওয়ের চালসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এমনকি ডিজেলের দাম বাড়ানোর আগেও বাজারে সংকট দেখা যায়।

এ অবস্থায় এলপিজির বাজারে প্রকৃত সরবরাহ পরিস্থিতি, আমদানি ও মজুতের হিসাব এবং খুচরা পর্যায়ে নির্ধারিত দামের চেয়ে অতিরিক্ত মূল্য নেওয়ার অভিযোগ—সবকিছু একসঙ্গে খতিয়ে দেখে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভোক্তারা।

কেকে/ এমএস


আরও সংবাদ   বিষয়:  গ্যাস সিলিন্ডার   নৈরাজ্য  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলাকাগজ স্পেশাল- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close