পদত্যাগ করেছেন বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি। গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা পৌনে দুইটার দিকে তিনি জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে পদত্যাগপত্র জমা দেন। ইতোমধ্যে জাতীয় সংসদ সচিবালয় তার আসন শূন্য ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপনও জারি করেছে।
রাজধানীর মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনায় উঠে আসে ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির নাম। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন বলে জানা গেছে।
এদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে। অন্যদিকে এ সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়ে সংশ্লিষ্ট ঘটনায় বিএনপি নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে শুধু সাংগঠনিক নয়, আইনি পদক্ষেপ চেয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০২৪ সালের পাঁচ আগস্টের পর থেকেই দলটির অনেক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, দখলবাজিসহ নানা অপকর্মের যুক্ত থাকার অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন সময় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সাংগঠিনক ব্যবস্থাও নিয়েছে দলটি। তবু কিছু নেতাকর্মীর বেপরোয়া আচরণে দলের ভাবমূর্তি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ অবস্থায় অপরাধ কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে বিএনপি জিরো টলারেন্স জনমনে স্বস্তি আনবে। এটা অপরাধ কমাতেও ভূমিকা রাখবে।
বিশ্লেষকরা আরও বলছেন, দলীয় এমপির বিরুদ্ধে দখলবাজির অভিযোগ ওঠায় তাকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন প্রধানমমন্ত্রী। এর মধ্য দিয়ে সব ধরনের অপরাধ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে দল ও সরকারের অবস্থান নিয়ে কঠোর বার্তা দিয়েছেন তিনি।
ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি বিএনপির মনোনয়নে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের সংখ্যা ৫০। সংবিধান অনুসারে, জাতীয় সংসদে দলগুলোর সরাসরি ভোটে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের সংখ্যার অনুপাতে নারী আসন বণ্টন করা হয়। বিএনপির মনোনয়নে এবার ৩৬ জন সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য হয়েছেন। গত ৩০ এপ্রিল সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্যদের গেজেট হয়। আর ৩ মে তারা শপথ নেন। এ হিসাবে পাঁচ মাসের মধ্যে সংসদ সদস্য পদ ছাড়লেন ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি।
পদত্যাগপত্রে যা লিখেছেন মিষ্টি :
স্পিকারকে দেওয়া পদত্যাগপত্রে ফেরদৌসী আহমেদ লিখেছেন, ‘মাননীয় স্পিকার, আমি ফেরদৌসী আহমেদ, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংসদ সদস্য (সংরক্ষিত মহিলা আসন) হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছি। আমি সম্পূর্ণ সজ্ঞানে ও স্বেচ্ছায় জাতীয় সংসদের সদস্য (সংরক্ষিত মহিলা আসন-২৩) পদ থেকে পদত্যাগ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি। অতএব, বিনীত প্রর্থনা এই যে আমার পদত্যাগপত্রটি গ্রহণ করে পদত্যাগ কার্যকর করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে আপনার সদয় মর্জি হয়।’
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের উচ্চপর্যায়ের সূত্র জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান গত বুধবার রাতে ফেরদৌসীকে পদত্যাগের বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছেন। দ্রুততম সময়ের মধ্যে পদত্যাগ না করলে দল থেকে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। এরপর গতকাল বেলা পৌনে দুইটার দিকে জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
বিএনপি ও সরকারের সূত্রগুলোর ভাষ্য, রাড্ডার ঘটনা নিয়ে সরকারও কঠোর অবস্থানে রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী দুই দিন ধরে ঘটনাটি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করছেন। হামলা ও ভাঙচুরে কারা জড়িত ছিলেন, তাদের রাজনৈতিক পরিচয় এবং নেপথ্যে কারা ভূমিকা রেখেছেন, এসব বিষয়ে তথ্য নিয়েছেন। তদন্তে ফেরদৌসী আহমেদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কয়েকজনের সম্পৃক্ততার তথ্যও পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একটি সূত্র বলেছে, রাড্ডার ঘটনাটিকে দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। একটি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান গুঁড়িয়ে দেওয়া, লুটপাট ও জমি দখলের অভিযোগের সঙ্গে দলের নেতা-কর্মীদের নাম আসায় বিষয়টি নিয়ে সরকার বিব্রত। ঘটনার সঙ্গে ফেরদৌসী আহমেদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার তথ্য সামনে আসার পর তার ভূমিকা ও রাজনৈতিক দায়ও আলোচনায় এসেছে। এমন পরিস্থিতিতে তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সংসদ সদস্যের বিষয়েও কঠোর সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
রাড্ডা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে হামলা ও ভাঙচুরের নেপথ্যে স্থানীয় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত কয়েকজনের ভূমিকার তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক সদস্য মোহাম্মদ হানিফ মিয়া এবং ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের সাবেক সদস্যসচিব মোস্তফা জগলুল পাশা অন্যতম। তারা ফেরদৌসী আহমেদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে এলাকায় পরিচিত বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
রাড্ডা সেন্টার গুঁড়িয়ে দেওয়ার পর আলোচনায় আসা ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’-এর কার্যক্রমেও স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন যুক্ত বলে তথ্য পাওয়া গেছে। ফেরদৌসী আহমেদ ২০০৬ সালে শাহ আলী থানার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কমিশনার থাকাকালে ওই সমিতির সভাপতি ছিলেন। তখন ওই সমিতির নামে রাড্ডা সেন্টারের জায়গাটি বরাদ্দ দেওয়ার জন্য গৃহায়ণ ও গণপূর্ত কর্তৃপক্ষের কাছে যে আবেদন করা হয়েছে, তাতে সভাপতি হিসেবে সই করেছিলেন ফেরদৌসী আহমেদ।
রাড্ডাকাণ্ডে আরও সাংগঠনিক ব্যবস্থা :
রাড্ডা সেন্টারের ঘটনা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার মধ্যেই গত বুধবার রাতে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপি, ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদল ও ঢাকা মহানগর পশ্চিম ছাত্রদলের কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। একই দিনে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের ১৪ জনকে বহিষ্কার করা হয়। তবে দলীয় বিজ্ঞপ্তিতে এসব সাংগঠনিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে রাড্ডা সেন্টারের হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনার সরাসরি কোনো সম্পর্কের কথা বলা হয়নি।
আইনি পদক্ষেপ চায় জামায়াত :
এদিকে সরকারের সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়ে সংশ্লিষ্ট ঘটনায় বিএনপি নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে শুধু সাংগঠনিক নয়, আইনি পদক্ষেপ চেয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান।
গতকাল দুপুরে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক পোস্টে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বলেন, রাতের অন্ধকারে রাড্ডা ক্লিনিক দখলের ঘটনায় অবশেষে সরকার ও সরকারি দল বাধ্য হয়ে সাংগঠনিক পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে। কিন্তু এত বড় অপকর্মের জন্য শুধু সাংগঠনিক পদক্ষেপ মোটেই যথেষ্ট নয়।
জামায়াত আমির বলেন, ‘কালপ্রিটদের (অপরাধীদের) বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিয়ে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। দেশবাসী দৃশ্যমান ও বিশ্বাসযোগ্য আইনি পদক্ষেপ দেখতে চায়।’ একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত ও লুণ্ঠিত স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি টেকসইভাবে পুনর্নির্মাণের দায়িত্বও সরকারকে পালন করতে হবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
কেকে/ এমএস