শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬,
১৭ আশ্বিন ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬
শিরোনাম: ● বাংলাদেশকে ৯ গোল দিয়ে আসিয়ান কাপের ফাইনালে ইন্দোনেশিয়া      ● স্বৈরাচার-গুপ্ত দল আবার এক হয়েছে : প্রধানমন্ত্রী      ● যাত্রা শুরু করল বিশেষায়িত ‘সাইবার পুলিশ ইউনিট’      ● ডেঙ্গুতে আরও চারজনের মৃত্যু, হাসপাতালে নতুন ভর্তি ১৯৭৮      ● হামে আরও দুই শিশুর মৃত্যু, নতুন আক্রান্ত ১২১৪      ● সংরক্ষিত আসন-২৩ শূন্য ঘোষণা      ● অরাজকতা সৃষ্টির পাঁয়তারায় কিছু দল : প্রধানমন্ত্রী      
খোলাকাগজ স্পেশাল
গরিবের ডিমও এখন নাগালের বাইরে
শরীফ আহমেদ ইমন
প্রকাশ: শুক্রবার, ২ অক্টোবর, ২০২৬, ৯:৫০ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

মাছ-মাংসের আকাশছোঁয়া দামে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ভরসার শেষ আশ্রয়স্থল ছিল ডিম। পুষ্টির এই সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী উৎসটি ঘিরেও এখন তৈরি হয়েছে বাড়তি অর্থনৈতিক চাপ। বাজারে লাগামহীন দামের জাঁতাকলে পড়ে সাধারণ মানুষের থালা থেকে হারাতে বসেছে আমিষের এই নিয়মিত পদটি।

রাজধানীর বড় বাজার থেকে ফার্মের মুরগির এক হালি বাদামি ডিম ৫০-৫৫ টাকায় কেনা যাচ্ছে। তবে পাড়া-মহল্লার মুদিদোকানে লাগছে ৫৫-৬০ টাকা। দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো সাধারণত একটি-দুটি করে ডিম কেনে। তখন প্রতিটির দাম পড়ছে ১৬ টাকা। গত বছর এই দিনেও যে ডিমের ডজন মিলত ১৩৫ টাকায়, আজ ঠিক এক বছর পর তা কিনতে খরচ করতে হচ্ছে ১৫৫ থেকে ১৬০ টাকা। ফলে সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের আমিষ ও পুষ্টির সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য এই উৎসটি এখন অনেকের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। 

বাজারের হিসাব এখন আর কেবল ‘এক হালি কত’তে আটকে নেই। সাধারণ মানুষের মনে ঘুরেফিরে একটাই বড় প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে— নিত্যদিনের পুষ্টির এই সহজ ও নির্ভরযোগ্য উৎসটি আর কতদিন নাগালের বাইরে থাকবে? খেটে খাওয়া ও স্বল্প আয়ের মানুষের পাতে আমিষের জোগান দেওয়ার এই শেষ ভরসাটুকুও কি তবে একদিন শুধুই বিলাসিতা হয়ে থেকে যাবে? 

খুচরা বিক্রেতারা জানান, বর্তমানে এক ডজন (১২টি) ডিম ১৫৫-১৬০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এক সপ্তাহে ডিমের দাম ডজনে প্রায় ১০ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। ফার্মের মুরগির সাদা ডিমের দাম ডজন ১৪৫-১৫৫ টাকা। হাঁসের ডিম ডজন ১৯০-২০০ টাকায় বিক্রি হয়। বিক্রেতারা মূল্যবৃদ্ধির জন্য মুরগির খাবার ও ওষুধের মূল্যবৃদ্ধি, পরিবহন খরচ বৃদ্ধি, লোডশেডিংয়ের মধ্যে ডিজেল দিয়ে জেনারেটর চালানোর কারণে খরচ বৃদ্ধি ইত্যাদিকে দায়ী করছেন। কেউ কেউ বলছেন, মৌসুমের এ সময়টায় মুরগি ডিম কিছুটা কম পাড়ে। কারণ, আর্দ্রতা ও গরম বেশি থাকে।

বাজারের এমন ঊর্ধ্বমুখী পরিস্থিতিতে ক্রেতাদের মনে জমেছে তীব্র ক্ষোভ। তাদের অভিযোগ, অজুহাত দেখিয়ে ডিমের দাম একবার বাড়িয়ে দিলে তা আর কখনো কমে না। বরং প্রতিবারই নতুন কোনো না কোনো কারণ সামনে এনে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এর দাম আরও বাড়িয়ে দেওয়া হয়।

রাজধানীর একটি মেসে থাকা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রাফসান আহমেদ বলেন, ‘ডিমের প্রকৃত উৎপাদন খরচ তো এত বেশি নয়। কিন্তু বাজারের সঙ্গে উৎপাদনের বাস্তব চিত্রের কোনো মিল নেই। এর পেছনে পরিষ্কার সিন্ডিকেটের কারসাজি রয়েছে। এই সিন্ডিকেট শক্ত হাতে ভাঙতে পারলে দাম স্বাভাবিকভাবেই কমে আসত। বিশেষ করে আমরা যারা মেসে থেকে পড়াশোনা করি, আমিষের ঘাটতি মেটাতে ডিমই আমাদের প্রধান ভরসা। অথচ বর্তমান বাজারে সেই ডিম কিনে খাওয়াও এখন আমাদের জন্য একপ্রকার বিলাসিতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।’ 

এক বছরে বেড়েছে ২৫-৩০ টাকা : 

বাজারদর বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সালের ১ অক্টোবর ঢাকার বাজারে ফার্মের লাল বা বাদামি ডিমের ডজন ছিল ১৩৫ টাকা। সে হিসাবে প্রতিটি ডিমের দাম পড়ত ১১ টাকা ২৫ পয়সা এবং চারটির দাম ছিল ৪৫ টাকা। একই সময়ে সাদা ফার্মের ডিমের ডজন ছিল ১২৫ টাকা। চলতি বছরের ১ অক্টোবর লাল বা বাদামি ডিমের ডজন বিক্রি হচ্ছে ১৫৫ থেকে ১৬০ টাকায়। বড় বাজারে চারটি ডিমের দাম প্রায় ৫০ টাকা হলেও পাড়া-মহল্লার দোকানে তা ৬০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ডজনপ্রতি দাম বেড়েছে ২৫ থেকে ৩০ টাকা। হালি হিসেবে বেড়েছে ১০ থেকে ১৫ টাকা।

দাম বৃদ্ধির কারণ হিসেবে যা বলছেন ব্যবসায়ীরা : 

ডিমের দাম বাড়ার জন্য উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধিকে প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন ব্যবসায়ীরা। তাদের দাবি, পোলট্রি খাদ্য, ওষুধ, পরিবহনসহ বিভিন্ন উপকরণের দাম বেড়েছে। পাশাপাশি গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ার কারণে বছরের এ সময়ে মুরগির ডিম দেওয়ার হার কিছুটা কমে যায়। খামারের সংখ্যা কমে যাওয়া ও সরবরাহ সংকটও দামের ওপর প্রভাব ফেলেছে। 

ব্যবসায়ীরা বলছেন, বর্তমানে তাদের পর্যায়ে ১০০ ডিমের দাম প্রায় ১ হাজার ১৪০ থেকে ১ হাজার ১৮০ টাকা পর্যন্ত ওঠানামা করছে। সরবরাহ ও বাজার পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে প্রতিদিন দাম পরিবর্তিত হয়।

অন্যদিকে দুই মাসে মুরগির খাদ্যের দাম কেজিতে ১২ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে বলে উল্লেখ করে দেশে ডিম উৎপাদনকারী শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানের একটি ডায়মন্ড এগের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কায়সার আহমেদ বলেন, প্রতি ৮টি ডিম উৎপাদনে এক কেজি খাবার লাগে। সেই হিসাবে দুই হালি ডিমে খরচ বেড়েছে ১২ টাকা। তিনি বলেন, বর্তমানে ফিডের কাঁচামালের একটি অংশই যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসছে। এর কারণ হতে পারে দেশটির সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি। এতে দাম বেশি পড়ছে।

উৎপাদন বাড়লেও কমে না দাম : 

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে প্রায় ২ হাজার ৪৪১ কোটি ডিম উৎপাদিত হয়। বছরে দেশের মানুষের জনপ্রতি ডিমের প্রাপ্যতা ১৩৭টির কিছু বেশি। এ হিসাব নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। 

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ২০২২ সালের খানা আয়-ব্যয় জরিপে জানায়, দেশের মানুষের জনপ্রতি দৈনিক ডিম গ্রহণের পরিমাণ ১২ দশমিক ৭ গ্রাম, যা ২০১৬ সালের তুলনায় কম। ২০১৬ সালে ছিল ১৩ দশমিক ৬ গ্রাম। কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে মূল্যবৃদ্ধিকে দায়ী করা হয়। কারণ, ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর দেশে অন্যান্য পণ্যের সঙ্গে ডিমের দাম বাড়তে থাকে। কারণ, তখন খাদ্যের দাম বেড়ে যায়। 

এর আগে বছরজুড়ে ডিমের ডজন ৮৫ থেকে ১২০ টাকার মধ্যে থাকত। এখন বছরজুড়ে ডিমের দাম ডজন ১২৫ থেকে ১৬০ টাকার মধ্যে ওঠানামা করে। কখনো কখনো দর আরও বেড়ে যায়। যেমন ২০২৪ সালের অক্টোবরের মাঝামাঝিতে ডিমের ডজনপ্রতি দর ২০০ টাকায় উঠেছিল। 

সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাবে, গতকাল ডিমের হালি ছিল ৫০-৫৫ টাকা, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ১১ শতাংশ বেশি। 

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ডিমের দাম নিয়ন্ত্রণে ২৭ সেপ্টেম্বর পোলট্রি খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠক করে। বৈঠক শেষে জানানো হয়, ডিমের উৎপাদন খরচ এবং উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যায় পর্যন্ত সরবরাহের বিভিন্ন ধাপে কতটা মূল্য সংযোজন ও মুনাফা হচ্ছে, তা পর্যালোচনা করবে সরকার। 

বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের বলেন, ডিমের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর সরাসরি চাপ পড়ে। 

সবজি থেকে তেল-মুরগি-মাছ— কিছুতেই মিলছে না স্বস্তি : 

ডিমের বাজার তো বটেই, এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চড়ছে শাকসবজি, ব্রয়লার মুরগি, সব ধরনের মাছ আর ভোজ্যতেলের দামও। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতিতে সাধারণ মানুষের পকেট কাটছে প্রতিদিন। শুধু ডিম বা চাল-ডাল নয়, এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চড়ছে শাকসবজি, ভোজ্যতেল, ব্রয়লার মুরগি থেকে শুরু করে সব ধরনের মাছের দামও। সব মিলিয়ে বাজারের কোনো সেক্টরেই এখন স্বস্তির দেখা মিলছে না। 

বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বেশিরভাগ সবজির কেজি এখন ১০০ টাকার আশপাশে বা তার ওপরে বিক্রি হচ্ছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে রান্নার প্রধান উপাদান ভোজ্যতেলের বাড়তি চাপ। বোতলজাত ও খোলা সয়াবিন তেলের দাম চড়ার পাশাপাশি বাজারে এর সরবরাহ নিয়েও রয়েছে নানা টালবাহানা। 

অন্যদিকে, সাধারণ মানুষের আমিষের চাহিদা মেটানোর প্রধান মাধ্যম ব্রয়লার মুরগি প্রতি কেজি ১৯০ থেকে ২০০ টাকা এবং সোনালী মুরগি ৩১০ থেকে ৩২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পাঙাশ, তেলাপিয়া কিংবা রুই-কাতলার মতো চাষের মাছ কিনতে গেলেও কেজিতে ২০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত বেশি গুনতে হচ্ছে ক্রেতাদের।

ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, ‘ডিমের দাম বাড়ার বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে বৈঠক আলোচনা হয়েছে। সেখানে বলা হচ্ছে, ভোক্তারা যেন সহনীয় দামে ডিম কিনতে পারেন এবং খামারিরাও যেন লোকসানে না পড়েন। পাশাপাশি মধ্যস্বত্বভোগী বা সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে এর কোনো প্রভাব বাজারে দেখা যাচ্ছে না। বরং দাম আরও বেড়েছে।’ 

নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় প্রতিটি জিনিসের এমন চড়া দামের কারণে স্বল্প ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষের জীবনযাত্রা প্রায় ওলোটপালট হয়ে গেছে। আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের হিসাব মেলাতে না পেরে অনেকেই এখন বাধ্য হয়ে থালায় পদের পরিমাণ কমিয়ে দিচ্ছেন। সাধারণ মানুষের একটাই প্রশ্ন— নিত্যপণ্যের এই আগুনঝরা বাজার থেকে পরিত্রাণ মিলবে কবে?  

কেকে/ এমএস


আরও সংবাদ   বিষয়:  বাজার দর   ডিম  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলাকাগজ স্পেশাল- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close