জনবল ও বাজেট সংকটের দোহাই দিয়ে বছরের পর বছর ধরে ঐতিহ্যবাহী ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান অবহেলিত করে রেখেছে বন অধিদপ্তর। রাজস্ব আহরণের মূল্যবান এই উদ্যানটি এখন ছিনতাইকারী ও বখাটেদের দখলে। গত কয়েক বছর ধরে ইজারা কার্যক্রম বন্ধ থাকায় উদ্যানটি এখন হরিলুটের খনিতে পরিণত হয়েছে দেখভালের দায়িত্বে থাকা স্থানীয় বন বিভাগের কাছে। উদ্যানে দর্শনার্থীদের জিম্মি করে ছিনতাইয়ের ঘটনা এখন নিয়মে পরিণত হয়েছে।
উঠতি বয়সী তরুণ-তরুণীদের কাছে অসামাজিক কার্যকলাপের নিরাপদ জোন এখন ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান। বন বিভাগের নজরদারির অভাবে উদ্যানের বিভিন্ন পয়েন্ট মাদকসেবীদের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। বিগত দিনে উদ্যানের বিভিন্ন কটেজের চালের টিন খুলে নিয়ে বিক্রি করেছে উদ্যানের অসাধু কর্মচারিরা। গাজীপুরের একমাত্র সরকারি এই উদ্যানটির বেহাল দশার কারণে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে গাজীপুরসহ আশপাশের জেলার ভ্রমণপিপাসুরা।
ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান গাজীপুর মহানগরীর ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের মাস্টারবাড়ি এলাকা থেকে রাজেন্দ্রপুর চৌরাস্তা পর্যন্ত বিস্তৃত। উদ্যানটি ১৯৮২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এর মোট আয়তন পাঁচ হাজার হেক্টরের বেশী। এটি একটি ক্রান্তিয়, আদ্র পর্ণমোচী বৃক্ষের বন। এখানকার মূল প্রজাতি শাল। মূল কার্তিত গাছ থেকে পুনরায় গজানোর গুণ থাকায় এগুলোকে গাজারি বন বলা হয়।
বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান ইজারা কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়। উদ্যানে সব ধরনের পিকনিক বন্ধ করা হয়। বন্ধ করা হয় মাইক ও সব ধরনের সাউন্ড সিস্টেম। উদ্যানে আগুন জ্বালানো নিষিদ্ধ করে বন্ধ করা হয় দর্শনার্থীদের জন্য রান্নার ব্যবস্থা। এতে ঐতিহ্যবাহী ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান মলিন হয়ে পড়ে। এক সময় দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখরিত উদ্যানটিতে শুনশান নিরবতা নেমে আসে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানে চম্পা, শাপলা, অর্কিড, জেসমিন ও রজনীগন্ধা নামে পাঁচটি বিশ্রামাগার রয়েছে। ‘চম্পা’ বিশ্রামাগার জাতীয় সংসদ সদস্য, সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও ভিআইপিদের জন্য অনুমোদিত।
বিশ্রামাগারটির প্রবেশমুখে ভিআইপি লেখা সম্বলিত সাইনবোর্ড সাঁটানো হয়েছে। এটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত নয়। বছর পার হতে না হতেই চম্পা বিশ্রামাগারের সৌন্দর্যবর্ধন ও মেরামতরে জন্য কাড়ি কাড়ি অর্থ বরাদ্দ দিচ্ছে বন বিভাগ।
শোভাবর্ধনের নামে বিশ্রামাগার প্রাঙ্গণে প্রাকৃতিক বন ধ্বংস করা হয়েছে। দেশীয় বৃক্ষ কর্তন করে রোপন করা হয়েছে ভিনদেশি বিভিন্ন জাতের ফুল ও শোভাবর্ধনকারী গাছ। ভিআইপিদের জন্য আধুনিক সব সুযোগ সুবিধা রয়েছে বিশ্রামাগার চম্পায়। প্রত্যকটি শৌচাগারে হাই কমোড। গোসলখানায় রয়েছে গিজারের ব্যবস্থা। ফ্লোরে দৃষ্টিনন্দন টাইলস আর দাবি সব আসবাবপত্র।
খোঁজ নিয়ে আরো জানা গেছে, জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত বিশ্রামাগার শাপলা, রজনীগন্ধা ও জেসমিনের বেহাল দশা। বিশ্রামাগারগুলো জরাজীর্ণ, ছাদের পলেস্তর খসে পড়ছে। অধিকাংশ আসবাবপত্র ভাঙাচুরা। শৌচাগারগুলোর বেহাল দশা। ঠিক নেই সাপ্লাই পানির সংযোগ। বিশ্রামাগারগুলোর প্রাঙ্গণ ঝোপঝাড়ে ভরা। বিশ্রামাগারগুলোর টেকসই উন্নয়নে নেই বরাদ্দ। বিশ্রামাগারগুলো দেখভালের জন্য পর্যাপ্ত জনবল নেই। বিশ্রামাগারগুলোতে বিগত দিনে বেশ কয়েকটি দুর্ধর্ষ ডাকাতির ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। রাত গভীর হলেই এসব বিশ্রামাগারে ডাকাত আতঙ্ক বিরাজ করছে।
অনুসন্ধান বলছে, শিক্ষাসফর ও অভিভাবক ব্যতীত স্কুল-কলেজের পোশাক পড়ে উদ্যানে দর্শনার্থী প্রবেশের অনুমতি নেই। অথচ স্কুল-কলেজ শিক্ষার্থীরা অবাধে উদ্যানে প্রবেশ করছে। জড়িয়ে পড়ছে মাদকের নেশায়। স্কুল-কলেজের পোশাক পড়ে উঠতি বয়সীরা লিপ্ত হচ্ছে অসামাজিক কার্যকলাপে। উদ্যানের শাপলা বিশ্রামাগার, চিড়িয়াখানাসংলগ্ন লেকপাড়, বনশ্রী ১-৪, পানির ঘর, ৭-৯ নম্বর, পলাশ, সোনালু এবং ২ নম্বর গেইট এলাকা ছিনতাইপ্রবণ। এসব এলাকায় দর্শনার্থীদের জিম্মি করে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। বিগত দিনে দর্শনার্থীদের কুপিয়ে জখম করে ছিনতাইয়ের ঘটনাও ঘটেছে। জাতীয় উদ্যানে সরকারি আগ্নেয়াস্ত্র থাকলেও বনকর্মীরা টহল দেয় না।
অনুসন্ধান আরো বলছে, জাতীয় উদ্যানের সুবিশাল লেক রয়েছে। টিকেট কেটে লেকটিতে সৌখিন মৎস্যশিকারিদের মাছ শিকারের সুযোগ বন্ধ রয়েছে। বিগত দিনে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সৌখিন মৎস্য শিকারিরা উদ্যান লেকে মাছ শিকারে আসতো। রাজস্ব আহরণের এই খাতটি বিভাগীয় বন কর্মকর্তার নির্দেশে বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। উদ্যানে বেড়াতে আশা দর্শনার্থীদের জন্য নেই শৌচাগারের ব্যবস্থা। নেই সুপেয় পানির ব্যবস্থা। উদ্যানের একমাত্র ক্যান্টিন গত কয়েক বছর ধরে তালাবদ্ধ। দেখভালের অভাবে উদ্যানের সুবিশাল লেকটির এখন বেহাল দশা।
ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানে কর্মরত দুইজন কর্মচারী জানান, দর্শনার্থীদের প্রবেশের টিকিটের টাকা ঠিক মতো জমা দেয়া হয় না। বিগত দিনে মাছ শিকারের টিকিটের টাকা আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে। এই কারণে উদ্যানের লেকে মাছশিকার বন্ধ করেছে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ। উদ্যানে একজন রেঞ্জ কর্মকর্তা ও বিট কর্মকর্তা থাকলেও তারা অলস সময় পার করছেন। উদ্যানটি রক্ষণাবেক্ষণে তাদের কোন উদ্যোগ নেই। তারা শুধু বাজেটের অপেক্ষায় থাকে লুটপাটের জন্য।
ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. আরিফুল ইসলাম বলেন, উদ্যানটির আয়তন ২ হাজার হেক্টর। উদ্যানে জনবল কমপক্ষে ৪০ জন থাকার কথা থাকলেও বর্তমান জনবল ১৪ জন। জনবল সংকটের কারণে উদ্যান দেখভালে সমস্যা হচ্ছে।
কেকে/ এমএস