শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬,
১৬ শ্রাবণ ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬
শিরোনাম: ব্যাংক ঋণে ঝুঁকছে সরকার      সম্ভাবনায় সংকটের ছায়া      চড়া দামে দিশেহারা ক্রেতা      ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ভয়ংকর পরিকল্পনা      লটারির মাধ্যমে ৭৬৭ জন উপ-সহকারী প্রকৌশলীকে বদলি      কল ড্রপ কমানোর আহ্বান টেলি যোগাযোগ মন্ত্রীর      হামের উপসর্গ নিয়ে ২৪ ঘণ্টায় চার শিশুর মৃত্যু      
খোলাকাগজ স্পেশাল
দুই সপ্তাহেই ব্যাংক ঋণ ৯২০৯ কোটি টাকা
ব্যাংক ঋণে ঝুঁকছে সরকার
আলতাফ হোসেন
প্রকাশ: শুক্রবার, ৩১ জুলাই, ২০২৬, ১০:৪৮ এএম আপডেট: ৩১.০৭.২০২৬ ১০:৫২ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

প্রত্যাশিত হারে রাজস্ব আদায় না হওয়ায় চলতি অর্থবছরের শুরুতেই ব্যয় নির্বাহে ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা বাড়িয়েছে সরকার। অর্থবছরের প্রথম দুই সপ্তাহেই সরকার ব্যাংকিংব্যবস্থা থেকে ৯ হাজার ২০৯ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নেওয়া হয়েছে ৫ হাজার ৪১৪ কোটি টাকা এবং তফসিলি ব্যাংকগুলো থেকে নেওয়া হয়েছে ৩ হাজার ৭৯৫ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্যে এ চিত্র উঠে এসেছে। তথ্য অনুযায়ী, নতুন অর্থবছরের শুরুতেই সরকারের ব্যাংক ঋণ গ্রহণের গতি বেড়েছে। গত অর্থবছর শেষে সরকারের মোট ব্যাংক ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৮৫ হাজার ৪৭৬ কোটি টাকা। এর আগের অর্থবছরের শেষে এ ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৫০ হাজার ৯০৫ কোটি টাকা। ফলে এক বছরের ব্যবধানে সরকারের ব্যাংক ঋণ বেড়েছে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা।

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকার ব্যাংক খাত থেকে মোট ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। অর্থবছরের মাত্র দুই সপ্তাহেই সেই লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৮ দশমিক ২ শতাংশ ঋণ গ্রহণ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণ গ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা এবং ব্যাংকবহির্ভূত উৎস থেকে ২১ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য ছিল। ব্যাংকবহির্ভূত উৎসের লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে জাতীয় সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রির মাধ্যমে ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা রাখা হয়।

তবে অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে সরকারের ঋণ গ্রহণের চিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা গেছে। জুলাই-মে সময়ে ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে সরকারের নিট ঋণ বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ৩০ হাজার ৫৯১ কোটি ৮০ লাখ টাকা, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৭১ হাজার ২৪৯ কোটি ৯০ লাখ টাকা। বিপরীতে, একই সময়ে ব্যাংকবহির্ভূত উৎস থেকে সরকারের নিট ঋণ হয়েছে মাত্র ২৮৪ কোটি টাকা, যেখানে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ে এ পরিমাণ ছিল ৩৭ হাজার ৮৯৯ কোটি ৪০ লাখ টাকা।

ফলে জুলাই-মে সময়ে ব্যাংকিং ও ব্যাংকবহির্ভূত উভয় উৎস মিলিয়ে সরকারের মোট নিট অভ্যন্তরীণ ঋণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩০ হাজার ৮৭৫ কোটি ৮০ লাখ টাকা, যা পুরো অর্থবছরের বাজেট লক্ষ্যমাত্রার ১০৪ দশমিক ৭ শতাংশ। আগের অর্থবছরের একই সময়ে মোট নিট অভ্যন্তরীণ ঋণ ছিল ১ লাখ ৯ হাজার ১৪৯ কোটি ২০ লাখ টাকা, যা তখনকার বাজেট লক্ষ্যমাত্রার ৯৩ দশমিক ৩ শতাংশ ছিল।

এদিকে জুলাই-মে সময়ে জাতীয় সঞ্চয়পত্র বিক্রির মাধ্যমে সরকারের নিট ঋণ হয়েছে ৮০৫ কোটি ৩২ লাখ টাকা। অথচ আগের অর্থবছরের একই সময়ে সরকারকে সঞ্চয়পত্র খাতে ৫ হাজার ৮৯৩ কোটি ৯০ লাখ টাকা নিট পরিশোধ করতে হয়েছিল।

বিশ্লেষকদের মতে, সাধারণত অর্থবছরের শুরুতে সরকারের রাজস্ব আদায় তুলনামূলক কম থাকে, অন্যদিকে বেতন-ভাতা, উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থছাড়, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং অন্যান্য নিয়মিত ব্যয় অব্যাহত থাকে। ফলে এ সময় সরকারকে নগদ অর্থের চাহিদা মেটাতে ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ঋণ নিতে হয়।

তবে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণ দ্রুত বাড়তে থাকলে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহের ওপর চাপ সৃষ্টি হতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। কারণ সরকার বেশি ঋণ নিলে ব্যাংকগুলোর তহবিলের একটি বড় অংশ সরকারি খাতে চলে যায়, যার ফলে শিল্প, ব্যবসা ও বিনিয়োগের জন্য ঋণপ্রাপ্তি কিছুটা সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। একইসঙ্গে বাজারে তারল্যের পরিস্থিতির ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সরাসরি ঋণ গ্রহণ বাড়লে তা অর্থ সরবরাহ বৃদ্ধির মাধ্যমে মূল্যস্ফীতির ওপরও চাপ সৃষ্টি করতে পারে। 

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বাজেট বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সরকারের স্বল্পমেয়াদি অর্থায়নের প্রয়োজন হয়। রাজস্ব আদায় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা কমে আসবে বলে তারা আশা প্রকাশ করেছেন। একইসঙ্গে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) রাজস্ব আহরণ বাড়াতে কর প্রশাসনের আধুনিকায়ন, করের আওতা সম্প্রসারণ এবং কর ফাঁকি রোধে বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে।

এদিকে চলতি অর্থবছরের বাজেটে রাজস্ব আদায়ের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু সেই লক্ষ্য অর্জন না হলে সরকারের ঋণ গ্রহণের প্রয়োজন আরও বাড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন। সেক্ষেত্রে ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়ার পাশাপাশি সামষ্টিক অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকের ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে সরকারের জন্য সবচেয়ে টেকসই সমাধান হলো রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, করজাল সম্প্রসারণ, ব্যয়ের দক্ষতা নিশ্চিত করা এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা। একইসঙ্গে অভ্যন্তরীণ ঋণের পাশাপাশি স্বল্পসুদে বৈদেশিক অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানো গেলে ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর চাপ কমানো সম্ভব হবে।

চিন্তা আরও বাড়িয়েছে সরকারের ব্যয় ব্যবস্থাপনা। পরিচালন ব্যয় দ্রুত বাড়লেও সেই হারে বাড়ছে না রাজস্ব আহরণ। ফলে ব্যয় মেটাতে সরকারকে ক্রমেই ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে। 

তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছর থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আয় বেড়েছে প্রায় দেড় গুণ। কিন্তু একইসময়ে সরকারের ব্যাংক ঋণ প্রায় চার গুণ বেড়ে ৩২ হাজার কোটি টাকা থেকে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৫ কোটি টাকায়।

যদিও অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, চলতি বাজেটে স্থানীয় ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৪ থেকে ৫ হাজার কোটি টাকা কমানো হয়েছে। এটিকে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের অংশ। এ ধারা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের ঋণগ্রহণ আরও কমবে এবং বেসরকারি খাতে ঋণ বিতরণের পরিমাণ অনুপাতে বাড়বে। সরকারের ঋণনির্ভরতা ধীরে ধীরে কমে এলে ব্যাংকিং খাতে বেসরকারি বিনিয়োগের সুযোগ বাড়বে যা কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে আরও শক্তিশালী করবে।

অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ খোলা কাগজকে বলেন, বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে ঋণ নেওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবে কোন প্রকল্প নেওয়া হবে এবং কীভাবে তা অর্থায়ন করা হবে, সে ক্ষেত্রে যথাযথ হিসাব-নিকাশ ও অগ্রাধিকার নির্ধারণ জরুরি। প্রকল্প বাছাই এমনভাবে করতে হবে, যাতে ঋণনির্ভরতা যতটা সম্ভব কম থাকে।

তিনি বলেন, দেশের রাজস্ব আহরণে দুর্বলতা তো রয়েছেই। এর পাশাপাশি প্রকল্প নির্বাচন ও বাস্তবায়নেও কাঠামোগত সমস্যা রয়েছে। আগে যে সমস্যা ছিল সেই সমস্যা থেকে এ সরকার এখনো বের হইতে পারেনি। 

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) নতুন নির্বাহী পরিচালক হলেন ড. ফাহমিদা খাতুন বলেছেন, ‘আমাদের মূল সমস্যা যে পরিমাণ ব্যয় হচ্ছে, তার বিপরীতে সেই পরিমাণ রাজস্ব আয় হচ্ছে না। রাজস্ব আহরণ প্রত্যাশা অনুযায়ী না বাড়ায় সরকারকে অর্থের জোগান দিচ্ছে অভ্যন্তরীণ উৎস, বিশেষ করে ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর ক্রমেই বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এ প্রবণতা অর্থনীতির জন্য চাপ তৈরি করতে পারে।’

কেকে/এলএ



আরও সংবাদ   বিষয়:  ব্যাংক ঋণ   সরকার  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close