প্রশাসনে ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তরে সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের সহযোগী বা দোসরদের সক্রিয় থাকার অভিযোগ অনেকবারই উঠেছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও জোটের পক্ষ থেকে অভিযোগ তোলা হয়েছে—প্রশাসনে ঘাপটি মেরে থাকা আওয়ামী লীগের সহযোগীরা দলটিকে পুনর্বাসিত করার চেষ্টা চালাচ্ছে। প্রশাসনের ভেতর থেকেই নাশকতা করতে সাহায্য করা হচ্ছে। নেতাকর্মীদের বিশেষ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। এরপরও বর্তমান সরকার বিষয়গুলো আমলে নেয়নি। অবশেষে সরকার এসব অভিযোগের বিষয়ে কঠোর অবস্থান ও দোসরদের আইনের আওতায় আনতে বিশেষ উদ্যোগ ঘোষণা করেছে।
সরকারের পক্ষ থেকে এরই মধ্যে পুলিশ প্রশাসনকে বিশেষ নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে জানিয়েছেন, পুলিশ বাহিনীর মাঠপর্যায়ে কেউ কেউ এখনো পতিত ফ্যাসিবাদীদের নানা খবর দিয়ে সহযোগিতা করছে। তাদের সামনে কঠোর পরিণতি অপেক্ষা করছে।
আওয়ামী দোসরদের সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগ :
বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে ঝটিকা মিছিল বা গোপন কার্যক্রম পরিচালনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। মাঠপর্যায়ের কিছু ঘটনায় গোয়েন্দা দুর্বলতা বা সমন্বয়হীনতার কথাও উঠে এসেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু কর্মকর্তা অভিযোগ করছেন, ঝটিকা মিছিল ও নাশকতার বিষয়ে আগাম গোয়েন্দা তথ্য না পাওয়ায় মাঠপর্যায়ে সময়মতো পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। অনেকে আবার আর্থিক সুবিধা নিয়ে ঝটিকা মিছিলসহ নানা কার্যক্রম করার সুযোগ করে দিচ্ছেন।
সম্প্রতি রাজধানীর গুলশানের মতো সুরক্ষিত কূটনৈতিক এলাকায় দিনদুপুরে ঝটিকা মিছিলের ঘটনা ঘটে। সেখানেও পুলিশের আগাম তথ্যের ঘাটতি ছিল বলে গুঞ্জন ওঠে। আবার আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও করেন অনেকে। এ ঘটনার জেরে এক আদেশে গুলশান থানার ওসি মো. দাউদ হোসেনকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।
পৃথক আরেক আদেশে গুলশান বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) এম তানভীর আহমেদকেও দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। একইভাবে বরিশালেও সম্প্রতি দলটির ঝটিকা মিছিল ও আকস্মিক ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। সেখানেও গোয়েন্দা তথ্যের ঘাটতি নিয়ে আলোচনা জোরালো হয়। সংশ্লিষ্ট থানার দায়িত্বরত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ ওঠে।
হাসিনাকে নিয়ে ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসির সাপাই :
‘শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে পুলিশ কিছুই করতে পারবে না’—এমন বক্তব্যের একটি অডিও সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়ার পর রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসি মো. রাকিবুল হাসানকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। গত ১৬ সেপ্টেম্বর রাতে অডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এতে ওসি পরিচয়ে এক ব্যক্তিকে সরকার, প্রশাসন, সেনাবাহিনী ও পুলিশ বাহিনী নিয়ে বিভিন্ন মন্তব্য করতে শোনা যায়।
পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা এবং ওসি পদায়নে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও করা হয়। অডিওতে ‘মনির’ নামে পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার গাড়িচালক থানার ওসি পদায়ন করছেন বলেও দাবি করা হয়। এ ছাড়া পদায়নের জন্য অর্থ লেনদেন এবং বিভিন্ন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগও করা হয়।
কারাগারে আ.লীগ নেতাদের বিশেষ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ :
কারাগারে আলো-বাতাস ও বিদ্যুৎহীন সেলে রাখা এবং শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ করেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সাবেক নেতা গাজী সালাউদ্দিন তানভীর।
তিনি দাবি করেন, কারাগারে থাকা অবস্থায় কারারক্ষী ও কয়েদিরা তাকে ‘জুলাই জঙ্গি’ বলে গালিগালাজ করতেন। কারারক্ষীদের বড় একটি অংশ আওয়ামী লীগের সমর্থক এবং তাদের বাড়ি সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে। বগুড়া জেলা কারাগারে তাকে অপরিচ্ছন্ন ও আলো-বাতাসহীন একটি সেলে রাখা হয়েছিল। কারাগারে থাকাকালে বিভিন্নভাবে তাকে নির্যাতন করা হয়। আশপাশের সেলে থাকা আওয়ামী লীগের কয়েদিরাও তাকে উদ্দেশ্য করে কটূক্তি করতেন।
এ ছাড়া কারাগারে আওয়ামী লীগের নেতাদের বিশেষ সুবিধা দেওয়া এবং তাদের রাতে গাড়িতে করে বাইরে নিয়ে গিয়ে ভোরে ফিরিয়ে আনার অভিযোগও করেন তিনি।
আওয়ামী দোসরদের আইনের আওতায় আনলে পুরস্কার : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, পুলিশ বাহিনীর মাঠপর্যায়ে কেউ কেউ এখনো পতিত ফ্যাসিবাদীদের নানা খবর দিয়ে সহযোগিতা করছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের সামনে কঠোর পরিণতি অপেক্ষা করছে। গণতান্ত্রিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে, জনপ্রত্যাশার ওপর দাঁড়িয়ে, দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ওপর দাঁড়িয়ে গঠিত সরকারের ভিত্তি অত্যন্ত শক্তিশালী। নিষ্ঠার সঙ্গে কর্তব্য পালন করতে হবে। রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায়ও অভিযুক্ত করতে আমরা পিছপা হব না। আশা করি মেসেজটা পেয়েছেন। আমি তৃণমূল পর্যায় থেকে আইজিপি পর্যন্ত সবাইকে এ মেসেজ দিতে চাচ্ছি। সমাজের প্রয়োজনে, রাষ্ট্রের প্রয়োজনে আমরা কঠোর হতে বাধ্য হব। গতকাল শনিবার ঢাকার রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে পুলিশ পদক বিতরণ অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে এ হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
সালাহউদ্দিন বলেন, আজকের দিনে এসে মাঠপর্যায়ে কর্তব্য পালন না করার, অবহেলা করার এবং ক্ষেত্রমতো ফ্যাসিবাদী শক্তিকে কেউ কেউ গোপনে সংবাদ দিয়ে, অন্যভাবে সহযোগিতা করার তথ্য আমাদের কাছে আছে। কোনো পুলিশ অফিসার, যে পদধারী হোক, যদি জনপ্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়, তাহলে তার পরিণতি ভালো হবে না। যারা পতিত ফ্যাসিবাদী শক্তি, তারা পুলিশ বাহিনীকেও অপব্যবহার করেছে। অনেকে বাধ্য হয়ে অবৈধ, বেআইনি নির্দেশ পালন করেছেন। আমরা সুযোগ দিয়েছি সংশোধনের, জনআস্থা অর্জনের। ছোটখাটো ভুল-ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখা হবে। জনগণ এখন আমাদের রাজা-বাদশাহ দেখতে চায় না। তারা জনবান্ধব পুলিশ দেখতে চায়। কোথাও এমন কোনো কাজ করবেন না, যা জনগণের কাছে অগণতান্ত্রিক লাগে।
তিনি আরও বলেন, পুলিশে শিগগিরই সাইবার সিটিকউরিটি ইউনিট গঠন করা হবে। এ ইউনিটে প্রধানের দায়িত্ব পালন করবেন একজন অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক। বাংলাদেশ পুলিশকে আরও আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হবে। সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় স্বতন্ত্র সাইবার ইউনিট চালু করা হচ্ছে। একইসঙ্গে মনে রাখতে হবে, প্রযুক্তি যতই আধুনিক হোক, পুলিশের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো মানুষের আস্থা অর্জন।
কেকে/ এমএস