কার্যক্রম নিষিদ্ধ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ। দিনটিকে ঘিরে যে কোনো ধরনের নাশকতা, বিশৃঙ্খলা ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতি ঠেকাতে দেশজুড়ে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশসহ দেশের সকল মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার ও রেঞ্জ ডিআইজিদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। এছাড়া দেশের ছয় জেলায় সেনাবাহিনী ও পাঁচ জেলায় বিজিবি মোতায়েন করেছে সরকার। এরই মধ্যে সারা দেশে সাঁড়াশি অভিযান চলছে। বিভিন্ন স্থান থেকেও সম্ভাব্য নাশকতাকারীদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। দিনটিকে ঘিরে প্রতিবাদ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)ও মাঠে থাকবে বলে জানা গেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও তাদের দোসররা দেশে বিশৃঙ্খলা ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির জন্য নানাভাবে অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। অরাজক পরিস্থিতি তৈরি করে ২৩ জুন প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করতে চায় দলটি। এ লক্ষ্যে তারা নানা ধরনের নাশকতার ছক কষেছে। গোয়েন্দা প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উচ্চপর্যায়ের সূত্র জানিয়েছে, যে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি, সংঘাত কিংবা নাশকতা এড়াতে ত্রিমুখী কৌশল নেওয়া হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে মাঠপর্যায়ের প্রতিটি ইউনিটে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে। গোয়েন্দা তথ্য, সাইবার নজরদারি এবং মাঠপর্যায়ে অপারেশনাল প্রস্তুতি—তিন ভাগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে। বাইরে থেকে এসে কেউ যাতে ঢাকায় বিশৃঙ্খলা করতে না পারে, তা প্রতিরোধে এরই মধ্যে ঢাকার প্রবেশমুখগুলোয় দূরপাল্লার গাড়ি ও সন্দেহভাজন লোকজনকে তল্লাশি শুরু হয়েছে।
মাঠপর্যায়ে দেওয়া পুলিশ সদর দপ্তরের এক বার্তায় বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগের কর্মীরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে ভুয়া অডিও-ভিডিও তৈরি করে তা ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ বা টেলিগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মে দলটির নেতাকর্মীরা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করছে। এ বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে দেশের সব মহানগর পুলিশ কমিশনার, রেঞ্জ ডিআইজি এবং জেলা পুলিশ সুপারদের (এসপি) কাছে নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ-সংক্রান্ত চিঠি পাঠিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। চিঠিতে বলা হয়েছে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে আকস্মিক দলীয় পতাকা উত্তোলন এবং ব্যানার নিয়ে প্রকাশ্যে মিছিলের চেষ্টা হতে পারে।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যে কোনো ধরনের নাশকতা বা অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে সরকারকে আরও সতর্ক হতে হবে। পাশাপাশি কঠোর গোয়েন্দা নজরদারি বজায় রাখতে হবে। পুলিশের অতিরিক্ত আইজি খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, আওয়ামী লীগ যাতে নতুন করে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা করতে না পারে, সেজন্য মাঠপর্যায়ে কড়া নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আশঙ্কা থেকেই সতর্কতা জারি করেছি। সারা দেশে এরই মধ্যে আমাদের সাঁড়াশি অভিযান চলছে। বিভিন্ন স্থান থেকেও সম্ভাব্য নাশকতাকারীদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এসএন মো. নজরুল ইসলাম বলেন, রাজধানী ঢাকাকে সুরক্ষিত রাখতে বিশেষ কৌশলগত নিরাপত্তা পরিকল্পনা সাজানো হয়েছে। পতিত ও নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের হুমকিতে নগরবাসীর আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। ধানমন্ডি ৩২ নম্বর, বনানী কবরস্থান, ২৩ বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ের কেন্দ্রীয় কার্যালয় এবং গুলিস্তানসহ রাজধানীর অন্তত ৪২টি পয়েন্টে কঠোর ব্লক চেকিং ও সিসিটিভি নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) পক্ষ থেকেও কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করা হয়েছে। ২১ জুন সকালে মোহাম্মদপুরে র্যাব-২ কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বাহিনীটির অধিনায়ক (অতিরিক্ত ডিআইজি) নাঈমুল হাসান অত্যন্ত কড়া হুঁশিয়ারি দেন। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে দেশে অবস্থানরত নেতাকর্মীদের মাঠে নামানোর পরিকল্পনা রয়েছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের। দেশের বাইরে পালিয়ে থাকা নেতারাই উসকানিমূলক কর্মসূচি ঘোষণা করে দেশের তৃণমূল নেতাকর্মীদের মাঠে নামানোর চেষ্টা করছে।
ঢাকার নিরাপত্তায় মাঠে থাকবে ১৮ হাজার পুলিশ : আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে রাজধানীতে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। গত রোববার রাতে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ডিএমপির ১৮ হাজারেরও বেশি অফিসার ও ফোর্স মাঠে থেকে নিরলসভাবে দায়িত্ব পালন করবে। রাজধানীজুড়ে ২০০টির বেশি কৌশলগত স্থানে পুলিশের বিশেষ পিকেট ও চেকপোস্ট ডিউটি পরিচালনা করা হবে।
এ ছাড়া দেশের ছয় জেলায় মোতায়েন করা সেনাবাহিনীকে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দিয়েছে সরকার। এই ছয় জেলায় সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন বা তার চেয়ে বড় পদের কর্মকর্তারা এই ক্ষমতা পাবেন বলে গতকাল সোমবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে। কোস্টগার্ড ও বিজিবিতে প্রেষণে থাকা সমপদমর্যাদার কর্মকর্তারাও এ ক্ষমতার প্রয়োগ করতে পারবেন। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও গাজীপুর মহানগর এলাকা এবং নারায়ণগঞ্জ, গোপালগঞ্জ ও ফরিদপুর জেলায় ২২ থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত সেনা কর্মকর্তারা ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা পাবেন। এর আগে রোববার সকালে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে দেশের ছয় জেলায় সেনাবাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার।
এদিকে দেশের পাঁচ জেলায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েন করা হয়েছে। জেলাগুলো হলো কক্সবাজার, মাদারীপুর, শেরপুর, গাজীপুর ও মৌলভীবাজার। গতকাল সন্ধ্যায় বিজিবির জনসংযোগ কর্মকর্তা শরীফুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
এ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, ‘গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ মাফিয়া দল আওয়ামী লীগের অপতৎপরতা রুখতে ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার অ্যাক্টের আওতায় ছয় জেলায় সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।’ গতকাল সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ কথা বলেন। তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সব সময়ই সতর্ক থাকতে হয়। আজ থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত সেনাসদস্যদের আইন মোতাবেক বেসামরিক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
১১ দলীয় ঐক্যের প্রতিবাদ সমাবেশ : গুম, খুন ও জুলাই গণহত্যার বিচারের দাবিতে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য। গতকাল সকালে মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান জোটের সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আযাদ। তিনি বলেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিন বিকেলে রাজধানীর বিজয়নগরে প্রতিবাদ সমাবেশ ডেকেছে ১১ দলীয় ঐক্য, যেখানে উপস্থিত থাকবেন শীর্ষ নেতারা। একই দাবিতে আগামী ৪ জুলাই সব জেলায় বিক্ষোভ মিছিলের ঘোষণাও দিয়েছে জোটটি।
ধানমন্ডি ও গাজীপুরে ৪০ নেতাকর্মী গ্রেপ্তার : গতকাল ধানমন্ডি মডেল থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ-সংগঠনের ১০ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে ডিএমপি পুলিশ।
এছাড়া গাজীপুর মহানগরের বিভিন্ন এলাকায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে ৩০ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে জিএমপি।
কেকে/এলএ