ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলায় পূর্ব বিরোধ ও নির্বাচনি দ্বন্দ্বের জেরে দুই গোষ্ঠীর মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষে দুইজন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় অন্তত ৪০ থেকে অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। সংঘর্ষের ঘটনায় পুরো এলাকায় চরম উত্তেজনা ও আতঙ্ক বিরাজ করছে।
মঙ্গলবার (২৪ মার্চ) সকাল সাড়ে ১০টা থেকে উপজেলার গোয়ালনগর ইউনিয়নের গোয়ালনগর গ্রামে সংঘর্ষের সূচনা হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা আশপাশের বিভিন্ন গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে এবং দুপুর গড়াতেই পুরো ইউনিয়নজুড়ে রণক্ষেত্রের পরিস্থিতি তৈরি হয়।
নিহতরা হলেন—গোয়ালনগর গ্রামের আক্তার মিয়া এবং হাবিবউল্লাহ (৪০)। নিহত হাবিবউল্লাহ স্থানীয় স্কুলপাড়া এলাকার একটি মসজিদের ইমাম ছিলেন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী কামরুজ্জামান মামুনের সমর্থক হিসেবে পরিচিত। অপরদিকে আক্তার মিয়া বিএনপি নেতা রহিম তালুকদার গোষ্ঠীর সক্রিয় সমর্থক ছিলেন।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন (১২ ফেব্রুয়ারি) গোয়ালনগর উচ্চ বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধের সূত্রপাত হয়। ওইদিন অনিয়মের অভিযোগে বিএনপি সমর্থক জিয়াউর রহমানকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আটক করে এবং পরে ভ্রাম্যমাণ আদালত তাকে ১০ দিনের কারাদণ্ড দেন। এই ঘটনার পেছনে স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থক শিশু মিয়ার সংশ্লিষ্টতা রয়েছে—এমন সন্দেহ থেকে বিরোধ তীব্র আকার ধারণ করে।
এরপর থেকেই দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা অব্যাহত থাকে। একাধিকবার সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও হামলার ঘটনা ঘটে। সর্বশেষ গত সপ্তাহে বড় ধরনের হামলার ঘটনায় কয়েকটি বাড়িঘর ভাঙচুর করা হয় এবং অন্তত ২৫ জন আহত হন। যদিও স্থানীয় সংসদ সদস্যের মধ্যস্থতায় পরিস্থিতি সাময়িকভাবে শান্ত হয়েছিল, তবে ভেতরে ভেতরে প্রতিশোধের প্রস্তুতি চলছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, মঙ্গলবারের সংঘর্ষ পূর্বপরিকল্পিত ছিল। নির্ধারিত দিনে উভয়পক্ষ বিভিন্ন এলাকা থেকে শত শত লোকজন জড়ো করে টেঁটা, বল্লম, তীর-ধনুকসহ দেশীয় অস্ত্র নিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। সংঘর্ষের তীব্রতায় গোয়ালনগর গ্রাম ছাড়িয়ে রামপুর, মাছমা, টেকানগর, ভিটাডুবি, স্কুলপাড়া, শিমেরকান্দি, লালুয়ারটেক, সোনাতোলা, ঝামারবালি ও কদমতলীসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে।
বিস্তারিত জানা যায়, নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যের পক্ষে নেতৃত্ব দেন বিএনপি নেতা রহিম তালুকদার। অপরদিকে স্বতন্ত্র প্রার্থী কামরুজ্জামান মামুনের পক্ষে নেতৃত্ব দেন কাশেম মিয়া। দুই পক্ষের সমর্থকরা দলে দলে সংঘর্ষে অংশ নেয়—ফলে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
সংঘর্ষের সময় ফসলি জমি, খোলা মাঠ এবং গ্রামীণ সড়কজুড়ে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও দেশীয় অস্ত্রের ব্যবহার দেখা যায়। অনেক বাড়িঘর ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগও পাওয়া গেছে—যদিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু নিশ্চিত করেনি প্রশাসন।
আহতদের মধ্যে গুরুতরদের নাসিরনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। এছাড়া অনেক আহত ব্যক্তি স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা নিচ্ছেন। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. শফিকুল ইসলাম জানান, গুরুতর আহত দুইজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।
নাসিরনগরের চাতলপাড় তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ ইন্সপেক্টর আবুল কালাম আজাদ বলেন, “সংঘর্ষে দুইজন নিহত হওয়ার খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে। এলাকায় এখনো উত্তেজনা বিরাজ করছে।”
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুলিশ সুপার শাহ মো. আব্দুর রউফ জানান, “পূর্ব বিরোধের জেরে দুই পক্ষ সংঘর্ষে জড়িয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।”
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সোমবার (২৩ মার্চ) স্থানীয় সংসদ সদস্যের গোয়ালনগর সফরের পর থেকেই এলাকায় নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়—যা শেষ পর্যন্ত বড় ধরনের সংঘর্ষে রূপ নেয়।
উল্লেখ্য, একই বিরোধকে কেন্দ্র করে গত ১৭ মার্চও দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে—এতে অন্তত ২৫ জন আহত হন। সেই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই আবারও প্রাণঘাতী সংঘর্ষে দুইজন নিহত হওয়ায় এলাকায় চরম উদ্বেগ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। তবে স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে যেকোনো সময় আবারও সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়তে পারে।
কেকে/এজে