যুদ্ধে কোনোভাবেই ইরানকে বাগে আনতে পারছে না যুক্তরাষ্ট্র। বরং ইরানের প্রত্যাঘাতে দিশেহারা আমেরিকা ও তার মিত্ররা। এ অবস্থায় একদিকে আলোচনার প্রস্তাব, অন্যদিকে হুমকির কৌশল নিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনোরকম আলোচনার কথা নাকচ করেছে ইরান। বরং তারা প্রতিরোধ যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া ঘোষণা দিয়েছে।
এদিকে ইরানকে আলোচনায় ফিরতে আবার হুমকি দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। গতকাল বৃহস্পতিবার তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেন, ‘বেশি দেরি হওয়ার আগে’ যুদ্ধ বন্ধের আলোচনা শুরু হোক। ট্রাম্পের এ হুমকি এমন সময়ে এলো, যখন ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) নৌপ্রধান আলিরেজা তাংসিরিকে হত্যা করা হয়েছে বলে দাবি করেছে ইসরায়েল।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট সামাজিক মাধ্যমে বলেন, ‘বেশি দেরি হয়ে যাওয়ার আগেই বিষয়টি (আলোচনা) গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে তাদের (ইরান)। কারণ একবার এটি ঘটলে, ফেরার কোনো পথ নেই এবং এটি ভালো দেখাবে না!’ তিনি দাবি করেন, ইরান ‘সামরিকভাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে, সেখান থেকে ফেরার কোনো সুযোগ নেই’।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) নৌপ্রধান আলিরেজা তাংসিরিকে হত্যা করা হয়েছে জানিয়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, তাংসিরিকে হত্যা করা ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ‘সহযোগিতার আরেকটি উদাহরণ’।
এর আগে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষমন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ দাবি করেন, ইসরায়েলি বাহিনী বিমান হামলা চালিয়ে আলিরেজা তাংসিরিকে হত্যা করেছে। তাংসিরি হরমুজ প্রণালিতে অচলবস্থা সৃষ্টি করা ও সেখানে মাইন পেতে রাখায় মূল ভূমিকা পালন করেন বলে উল্লেখ করেন কাৎজ।
এদিকে ইরানের পক্ষ হয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছে ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতি। প্রয়োজন হলে যে কোনো সময় যুদ্ধ শুরু করার সামরিক প্রস্তুতি রয়েছে বলেও জানিয়েছে এ গোষ্ঠী।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে হুতির এক নেতা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, ‘আমরা সামরিকভাবে সম্পূর্ণ প্রস্তুত। সব ধরনের বিকল্পসহ প্রস্তুত আছি আমরা।’
তিনি বলেন, ‘এখন পর্যন্ত ইরান ভালো করছে এবং শত্রুকে প্রতিদিন পরাজিত করছে। যদি এর বিপরীত কিছু ঘটে, আমরা বিষয়টি বুঝতে পারব।’
হুতির ওই নেতা আরও বলেন, তারা পুরো পরিস্থিত পর্যবেক্ষণ করছেন। কখন এগিয়ে যাওয়ার উপযুক্ত সময় সেটা সহজেই বুঝতে পারবেন।
হুতি গোষ্ঠী এ যুদ্ধে যুক্ত হলে একটি নতুন ফ্রন্ট খুলে যাবে। হুতিদের সুস্পষ্ট লক্ষ্য হবে ইয়েমেনের উপকূলের বাইরের বাব আল-মান্দেব প্রণালি। এ প্রণালি হয়ে সুয়েজ খালের দিকে সমুদ্রযান চলাচল করে। তখন হরমুজ প্রণালির পর আরেকটি জলপথেও হয়তো নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারবে ইরান। সেটা হলে বৈশ্বিক জ্বালানি পরিস্থিতি আরও অস্থির হবে। এর আগেও বিভিন্ন সময়ে হুতি গোষ্ঠী ওই জলপথে ট্যাংক ও জাহাজে হামলা চালিয়েছে।
অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ও দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফকে হত্যার তালিকা বা ‘হিট লিস্ট’ থেকে সরিয়ে নিয়েছে ইসরায়েল। যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পাকিস্তানের এক বিশেষ অনুরোধের পর এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আলোচনার বিষয়ে অবগত পাকিস্তানের একটি সূত্র গতকাল বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছে।
ইরানের উপস্বাস্থ্যমন্ত্রী আলী জাফারিয়ান আল-জাজিরাকে জানিয়েছেন, যুদ্ধে এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ১ হাজার ৯৩৭ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ২৪০ জন নারী এবং ২১২ জন শিশু। উপস্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, যুদ্ধে এ পর্যন্ত ২৪ হাজার ৮০০-এরও বেশি মানুষ আহত হয়েছে। যার মধ্যে প্রায় ৪ হাজার নারী এবং ১ হাজার ৬২১টি শিশু রয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। জবাবে ইসরায়েলে ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইরান।
চলমান যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন পাকিস্তান। এ প্রক্রিয়ায় তুরস্ক, মিসরসহ আরও কয়েকটি দেশ যুক্ত রয়েছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার এ কথা জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, মধ্যস্থতার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান করছে পাকিস্তান।
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) বলেছে, তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে তাদের অভিযানের ‘৮২তম ধাপ’ শুরু করেছে।
ইরানের সংবাদমাধ্যম তাসনিম নিউজ এজেন্সির বরাত দিয়ে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
আইআরজিসির পক্ষ থেকে বলা হয়, গতকাল ভোরে এ সর্বশেষ ধাপের অভিযান শুরু হয়েছে। এ অভিযানে বিপুল পরিমাণ ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে। হামলার মূল লক্ষ্য ছিল ইসরায়েলের সামরিক নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র ও মৃত সাগরের দক্ষিণে অবস্থিত দেশটির পারমাণবিক অবকাঠামো সংশ্লিষ্ট শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো।
ইরাকে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস দেশটিতে বসবাসরত মার্কিন নাগরিকদের জন্য একটি নতুন নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করেছে।
সতর্কবার্তায় দাবি করা হয়েছে, ইরাকের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা মার্কিন নাগরিক ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোতে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো ‘ব্যাপক’ হামলা চালিয়েছে। এমনকি ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চলেও এসব হামলা হয়েছে।
ইরাকের বর্তমান পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে দূতাবাস মার্কিনদের দ্রুত দেশ ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে। একইসঙ্গে নাগরিকদের বাগদাদে অবস্থিত দূতাবাস কিংবা ইরবিলে অবস্থিত কনস্যুলেট জেনারেলে না যাওয়ার জন্যও অনুরোধ করছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, প্রায় চার সপ্তাহ ধরে চলা যুদ্ধ বন্ধ করতে ইরান এখন একটি চুক্তি করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে।
তবে তার এ দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেছেন, তার দেশ যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রস্তাব পর্যালোচনা করছে ঠিকই, কিন্তু সংঘাত নিরসনে কোনো আলোচনায় বসার ইচ্ছা তাদের নেই।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি কোনো সংলাপ বা আলোচনা হয়নি। তবে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে বিভিন্ন বার্তা আদান-প্রদান করা হয়েছে।
যুদ্ধ বন্ধে পাকিস্তানে ইরানের সঙ্গে বৈঠকের প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র
এর কিছুক্ষণ পরই ওয়াশিংটনে এক অনুষ্ঠানে ট্রাম্প বলেন, ‘ইরানের নেতারা প্রকৃতপক্ষে আলোচনা করছেন এবং তারা একটি চুক্তি করতে খুবই মরিয়া। কিন্তু তারা সেটা বলতে ভয় পাচ্ছেন। কারণ নিজ দেশের মানুষ তাদের মেরে ফেলতে পারে। আবার আমাদের হাতে মারা পড়ার ভয়ও তাদের আছে।’
এদিকে লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ বলেছে, তারা বেশ কিছু বিশেষ ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে মধ্য তেল আবিবের কিরিয়া এলাকায় অবস্থিত ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর সদর দপ্তর লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।
এ ছাড়া তেল আবিবের উত্তরে ইসরায়েলি সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার একটি স্থাপনাতেও হামলা চালানোর দাবি করেছে হিজবুল্লাহ।
স্থানীয় সময় গত বুধবার দিবাগত রাতে এ হামলা চালানো হয় বলে হিজবুল্লাহ তাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানিয়েছে।
হিজবুল্লাহ আরও জানিয়েছে, দক্ষিণ লেবাননে অনুপ্রবেশকারী ইসরায়েলি সেনাদের সঙ্গে তাদের যোদ্ধাদের লড়াই চলছে। ইসরায়েলও জানিয়েছে, গতকাল সেখানে তাদের আরও এক সেনা ‘গুরুতর আহত’ হয়েছেন।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে হুঁশিয়ার করে বলেছে, তারা যেন পরাজয় মেনে নেয়। অন্যথায় দেশটিকে আগের চেয়ে অনেক বেশি ‘কঠোর আঘাত’ সহ্য করতে হবে।
অন্যদিকে তেহরান আলোচনার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে এবং লড়াই চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে।
কেকে/এসএ