মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬,
১৬ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬
শিরোনাম: যুদ্ধবিরতির পরও গাজায় থামেনি ইসরাইলের হামলা, বাড়ছে হতাহত      জাতীয় সংসদে পাস হলো অর্থবিল-২০২৬      লালমনিরহাটের পাঁচ উপজেলার মানুষ পানিবন্ধি      ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আরও ৫ জনের মৃত্যু      এনবিআরের নতুন চেয়ারম্যান আহসান হাবিব      ‘যেকোনো মূল্যে তিস্তা ব্যারেজ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে’      একুশে পদকপ্রাপ্ত শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার আর নেই      
ইচ্ছেডানা
নাসির উদ্দিন হোজ্জার গল্প
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: রোববার, ২৬ এপ্রিল, ২০২৬, ১১:৪৬ এএম
ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

লোকটাকে কেউ ডাকে মোল্লা সাহেব। কেউ ডাকে হোজ্জা। আবার কেউ কেউ বলে মোল্লা নাসিরুদ্দিন হোজ্জা। তবে এই লোকটি সম্পর্কে যিনি ব্যাপক রিসার্চ করেছেন, সেই প্রফেসর মিকাইল বায়ারাম জানান, এই মানুষটির পূর্ণ নাম নাসির উদ্দীন মাহমুদ আল খায়ী। জন্ম ত্রয়োদশ শতাব্দীতে তুরস্কে। মানুষটা ছোটখাটো, বেঁটে। মাথায় পরে পাগড়ি আর গায়ে চড়ায় জোব্বা। সার্বক্ষণিক সঙ্গী একটা গাধা। 

হোজ্জাকে নিয়ে হাজারেরও বেশি গল্প চালু আছে। কোনো গল্পে তাকে মনে হয় খুব বুদ্ধিমান একজন মানুষ। আবার কোনো গল্পে তার আচরণ একেবারেই বোকার মতো হয়। তবে তিনি পরিচিত তার সূক্ষ্ম রসবোধের কারণে। তার নানা কথা আমাদের যেমন হাসায়, তেমনি ভাবায়ও বটে। চলুন, আর কথা না বাড়িয়ে হোজ্জার গল্পগুলো শুনে আসি।

একদিন নাসিরউদ্দিন হোজ্জা একটি মিষ্টির দোকানের সামনে দিয়ে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ মিষ্টির দিকে চোখ পড়াতে তার খেতে ইচ্ছে হলেও টাকা না থাকায় শুধু মিষ্টির ঘ্রাণ নিয়ে চলে যাচ্ছিলেন। কিন্তু দায় সাধল দোকানদার। তিনি মিষ্টির ঘ্রাণ নেওয়াতে হোজ্জার কাছে তার দাম চাইলেন। হোজ্জা পরে দিবেন বলে সেদিনের মতো চলে আসলেন। 

পরের দিন তিনি কিছু মুদ্রার কয়েন থলেতে নিয়ে তার দোকানে গেলেন এবং ঝাঁকাতে শুরু করলেন। দোকারদার বললেন দাও আমার টাকা দাও। হোজ্জা উত্তরে বললেন টাকার ঝনঝনানি শুনতে পাচ্ছেন না? দোকারনদার বললেন হ্যাঁ শুনতে পাচ্ছি। হোজ্জা বললেন তো শোধ হয়ে গেল। 

একদা মোল্লা নাসিরউদ্দিন নিজের জন্য একটা জোব্বা কিনতে গেল একটি দোকানে। তো পছন্দ করার পর দোকানদার জোব্বাটা প্যাকেট করে দিল। মোল্লা জোব্বা নিয়ে চলে আসার সময় ভাবলেন জোব্বা না নিয়ে বরং একটি আলখাল্লা নিয়ে যাই। দোকানিকে বলল, আপনি বরং আমাকে একটি আলখাল্লা দাও। দোকানি আলখাল্লা দেয়ার পর মোল্লা নাসিরউদ্দিন তা নিয়ে বের হয়ে আসার সময় দোকানি ডেকে বলল, হোজ্জা সাহেব আপনি তো আলখাল্লা’র মূল্য পরিশোধ করেননি। তখন মোল্লা উত্তর দিল আমি তো আলখাল্লা’র পরিবর্তে জোব্বা’টা রেখে গেলাম। তখন দোকানি বললেন, আপনি তো জোব্বা’র জন্যও মূল্য পরিশোধ করেননি। প্রতি উত্তরে মোল্লা বললেন, যেটা আমি নেইনি তার জন্য মূল্য পরিশোধ করব কেন? 

মোল্লা নাসিরউদ্দিন একবার বাজার থেকে খাসির গোশত কিনে আনলেন। স্ত্রীর হাতে দিয়ে বললেন, ‘অনেকদিন গোশত খাইনি। ভালো করে রাঁধো যেন খেয়ে মজা পাই।’ মোল্লা’র স্ত্রীও অনেকদিন গোশত খায়নি। তাই রান্নার পর একটু একটু করে খেতে খেতে সবটা গোশতই খেয়ে ফেলল। মোল্লা খেতে বসলে তার স্ত্রী মুখ কাঁচুমাচু করে বললেন, ‘আজ আর তোমার বরাতে গোশত নাই, সব গোশত বিড়ালে খেয়ে ফেলেছে।’ 

নাসিরউদ্দিন অবাক হয়ে বলল, পুরো এক সের গোশতই বিড়াল খেয়ে ফেলল?’ জি বলল : তাহলে আমি বলছি কি! স্ত্রীর কথা মোটেই বিশ্বাস করল না মোল্লা। তখনই বিড়ালটাকে দাঁড়িপাল্লায় ওজন করে দেখল ওজন ঠিক এক সের। মোল্লা বলল, ‘এটাই যদি সেই বেড়াল হয়, তাহলে গোশত কোথায়? আর এটা যদি গোশতের ওজন হয় তাহলে বেড়ালটা গেল কোথায়?’ 

পাড়ার একজন তাকে সুনজরে দেখতেন না। নাসিরুদ্দিন সবার কাছেই প্রিয় ছিলেন কিন্তু হাবু সাহেবকে কেউ পছন্দ করতেন না, সেই কারণেই তিনি নাসিরুদ্দিনকে হিংসা করতেন। হাবু সাহেবের মেয়ের বিয়ে। পাড়ার সবাইকে নিমন্ত্রণ করেছেন তিনি কিন্তু নাসিরুদ্দিনকে করেননি। নাসিরুদ্দিনও জেদ ধরলেন যেমন করে হোক নেমন্তন্ন খেতে হবে। মোল্লার বুদ্ধি বের করতে দেরি হলো না। একটা খামের ওপর লোকটির নাম লিখে তার ভেতরে এক টুকরো সাদা কাগজ ভরে খামখানার মুখ বন্ধ করে বিয়ে বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত হলেন মোল্লা। 

সকলে খেতে বসবে ঠিক সেই সময়েই উপস্থিত হয়ে বাড়ির মালিকের হাতে খামখানা দিয়ে বললেন, ‘বাদশাহ এই চিঠিখানা পাঠিয়েছেন।’ হাবু সাহেব খুব খুশি। স্বয়ং বাদশাহ নিশ্চয়ই মেয়ে-জামাইকে আশীর্বাদ জানিয়ে চিঠি দিয়েছেন। মনের আনন্দে তিনি মোল্লাকে খুব খাতির-যত্ন করে বসিয়ে খাওয়ালেন। বেশ পেট ভরে খাওয়ার পর নাসিরুদ্দিন লোকটির কাছে বিদায় নিতে গেলে তার চিঠির কথা মনে পড়ল। এতক্ষণ কাজের ব্যস্ততায় খামখানা খোলার সময় হয়নি। 

খামখানা খুলে তো তিনি থ! জিজ্ঞেস করলেন, ‘মোল্লা সাহেব, বাদশাহ তো কিছুই লিখেননি। এর মধ্যে তো রয়েছে শুধু একখানা সাদা কাগজ।’ মোল্লা বললেন, ‘এর জবাব তো আমি দিতে পারব না, আমাকে চিঠিখানা হাতে দিয়ে পৌঁছে দিতে বললেন, আমি পৌঁছে দিয়েছি। আমার কাজ এখানেই শেষ। 

এক লোকের বউয়ের সঙ্গে খুব ঝগড়াঝাটি হতো। বউটি ছিল ভীষণ ঝগড়াটে। কোনদিন সে তার স্বামীকে সুখে থাকতে দিতো না। একদিন সেই ভদ্রলোক কোন উপায় না দেখে কিছু পয়সা ও জামাকাপড় পোঁটলায় বেঁধে কোথাও চলে যাওয়ার জন্য মনস্থ করে রাস্তায় বেরিয়ে পড়লো। নাসিরুদ্দিন সেই লোকটিকে মুখ ভার করে রাস্তার ধারে এমনভাবে বসে থাকতে দেখে প্রশ্ন করলেন, ‘ তোমার কী হয়েছে? কেন তুমি এমনভাবে রাস্তার ধারে বসে আছো?’ 

লোকটি বলল, ‘জীবন একেবারে বিষের মত হয়ে গেছে আমার স্ত্রীর জন্য মোল্লা সাহেব! হাতে কিছু পয়সা আছে বটে কিন্তু মনে সুখ নেই। তাই দেশে দেশে ঘুরতে বেরিয়েছি। যেখানে কোনো সুখের সন্ধান পাব, সেখানেই থেকে যাব।’ লোকটির পাশে তার পোঁটলায় টাকাকড়ি জিনিসপত্র সব রাখা ছিল। তার কথা শেষ হতে না হতেই নাসিরুদ্দিন সেই বোঁচকাটা নিয়ে দৈড়ে পালাতে লাগলেন। মোল্লাকে পোঁটলাটা নিয়ে পালিয়ে যেতে দেখে লোকটিও তার পেছনে প্রাণপণ দৌড়াতে লাগল। 

কিন্তু মোল্লা খুব দৌড়াতে পারতেন এবং বুদ্ধিও আছে- এমন অবস্থায় নাসিরুদ্দিনকে ধরে কার সাধ্য! দেখতে দেখতে তিনি রাস্তা ছেড়ে জঙ্গলে ঢুকে হাওয়া হয়ে গেলেন। এভাবে লোকটিকে ধোঁকা দিয়ে তিনি আবার সেই রাস্তায় ফিরে পোঁটলাটা রাস্তার মাঝখানে রেখে একটা গাছের আড়ালে লুকিয়ে রইলেন। 

এদিকে লোকটিও কিছুক্ষণ পরে সেখানে এসে হাজির। তাকে এখন আগের চেয়েও বেশি দুঃখিত দেখাচ্ছে। কিন্তু রাস্তায় তার পোঁটলাটি পড়ে আছে দেখে মহা আনন্দে চিৎকার করে পোঁটলার উপর ঝাপিয়ে পড়লো। এতক্ষণে সে যেন প্রাণ ফিরে পেল। 

গাছের আড়াল থেকে নাসিরুদ্দিন বেরিয়ে এসে বললেন, “দুঃখীকে সুখের সন্ধান দেয়ার এও একটা উপায় দেখতে পেলাম, কী বলো ভাইয়া।” এই বলে মোল্লা সাহেব লোকটির দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে চলে গেলেন। 

হোজ্জা একবার স্মৃতিশক্তি বাড়ানোর জন্য এক হেকিমের কাছ থেকে ওষুধ নিয়েছিলেন। কয়েক মাস পর হোজ্জা তার হেকিমের কাছে গেলেন ওই ওষুধ আনার জন্য। “আচ্ছা, গতবার তোমাকে কী ওষুধ দিয়েছিলাম, একেবারেই মনে করতে পারছি না।” “তাহলে ওই ওষুধ এখন থেকে আপনি নিজেই খাবেন”, হোজ্জা বিনীত গলায় বললেন।

কেকে/ এমএস


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close