তাসফিয়া ক্লাস টুতে পড়ে। ফেব্রুয়ারি মাস এলেই তার মায়ের কাছে প্রতিরাতে ঘুমাবার আগে বাংলাভাষার আদ্যোপান্ত নিয়ে একটা করে গল্প শোনে । গল্প শুনে তার মনটা খুশিতে ভরে যায় আবার কষ্টও পায়! মা যখন কথা বলেন, তাসফিয়ার তখন মনে হয় শব্দগুলো যেন গান হয়ে নেচে ওঠছে। অপরদিকে ভাষা শহিদদের জন্যও চোখে জল আসে!
একদিন স্কুলে ম্যাডাম ক্লাসে সবাইকে জিজ্ঞেস করলেন,-- ‘তোমাদের সবচেয়ে প্রিয় ভাষা কোনটা?’ সবাই একসাথে বলল,-- ‘বাংলা!’ কিন্তু তাসফিয়া আলাদাভাবে বলল,-- ‘ম্যাডাম, বাংলা আমার মায়ের ভাষা।’ ম্যাডাম হেসে বললেন,-- ‘ তাসফিয়া খুব সুন্দর কথা বলেছ তুমি। তোমার কেন এমনটা মনে হয়?’
তাসফিয়া একটু ভেবে বলল,-- ‘কারণ মা যখন আমাকে ডাকেন ‘মা রে’, ‘সোনা রে’ তখন সব কষ্টই আমার দূর হয়ে যায়। বাংলা ভাষায় মা হাসেন, মা বকেন, মা আদর করেন, এজন্যই আমি বাংলা ভাষাকে আমার মায়ের ভাষা বলি।’
সেদিন বাড়ি ফিরে তাসফিয়া মাকে সব বলল। মা তাসফিয়ার মাথায় হাত রেখে বললেন,-- ‘এই ভাষার জন্য অনেক মানুষ কষ্ট সহ্য করেছেন, মা। আরও বললেন-- ১৯৫২ সালের পুরো ফেব্রুয়ারি মাস ছিল উত্তাল, পাকিস্তানি শাসক উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার জন্য উঠে পড়ে লাগে কিন্তু বাংলার দামাল ছেলেরা প্রতিবাদে ফেটে পড়ে, দিনটি ছিল ২১ ফেব্রুয়ারি, সেদিন সালাম, রফিক, জব্বার ও শফিকসহ নাম না জানা অনেকেই ঢাকার রাজপথে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে প্রতিবাদ মিছিল বের করলে পুলিশের গুলিতে তারা শহিদ হন। তাই বাংলা আমাদের খুব আদরের এবং অহংকারের।’ পৃথিবীর ইতিহাসে ভাষার জন্য কোথাও আন্দোলন সংগ্রাম হয়নি কিন্তু আমাদের দেশে হয়েছিল, মা!
পরের দিন স্কুলে ভাষা দিবস উপলক্ষে অনুষ্ঠান ছিল। অনুষ্ঠানে তাসফিয়াকে একটি ছোটো গল্প বলতে হবে, এই কথা শুনে সে ভয় পেয়ে গেল; কিন্তু মা বললেন,-- ‘ভয় পেয়ো না। নিজের ভাষায় কথা বললে ভয় থাকে না; ভয়কে জয় করতে হবে, মা।’
পরেরদিন ২১ ফেব্রুয়ারি, যথারীতি অনুষ্ঠান শুরু হলো, একসময় তাসফিয়ার নাম ঘোষণা করা হলো; তাসফিয়া ভয়ে ভয়ে মঞ্চে উঠল এবং বলতে থাকল-- ‘বাংলা আমার মায়ের ভাষা। এই ভাষায় আমি হাসি, কাঁদি এবং স্বপ্ন দেখি। বাংলাভাষা আছে তাই আমি মনের কথা সুন্দর করে প্রকাশ করতে পারি।’
ছোট্ট তাসফিয়ার এই কথাগুলো শুনে সবাই হাততালি দিল। তাসফিয়ার ভয় তখন কোথায় যে উড়ে গেল, সে নিজেও বুঝতে পারল না। নির্ভয়ে সে আরও একটি বাংলা ছড়াও আবৃত্তি করল। আবারও হাততালি পেল। একটি পুরস্কারও পেল।
অনুষ্ঠান শেষ হলে হাসিমুখে বাসায় ফিরল। বাসায় ফিরেই মা-কে জড়িয়ে ধরে বলল,-- ‘মাগো, আমি বাংলাভাষা ভীষণ ভালোবাসি।’ মা হেসে বললেন,-- ‘বাংলাভাষাকে ভালোবাসলে মানুষকেও ভালোবাসা যায়, বাংলাভাষা সুন্দর বলেই আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার স্বীকৃতি পেয়েছে।’ ঠিক আছে মা, রাতে ঘুমানোর আগে বাংলাভাষা নিয়ে আরও গল্প করব, এখন হাতমুখ ধুয়ে এসে খেয়ে দেয়ে আরাম করো।’
এভাবেই মায়ের কাছে গল্প শুনে শুনে তাসফিয়া জেনেছে-- বাংলা শুধু ভাষা নয়, বাংলা তার মায়ের ভাষা, বাংলা তার আদরের ভাষা, বাংলা তার অহংকারের ভাষা।
কেকে/ এমএস