দেশে হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে শিশুমৃত্যু থামছেই না। গতকাল মঙ্গলবারও হাম ও উপসর্গ নিয়ে আরও ৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে গত দেড় মাসে ৩১৭ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। দেশে হঠাৎ এই হামের প্রাদুর্ভাব অস্বাভাবিক বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। জানা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় হামের টিকা কার্যক্রম শ্লথ হয়ে পড়ে, যার প্রভাবে দীর্ঘ সময় শিশুরা হামের টিকা থেকে বঞ্চিত হয়। আর এতেই প্রায় নির্মূল হয়ে যাওয়া এ রোগ আবারও শিশুদের প্রাণ কাড়তে শুরু করে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এর জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগ আনছেন। এ বিপুল শিশু মৃত্যুর দায় অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বশীলরা এড়াতে পারে না বলে দাবি করছেন তারা।
তবে এমন অভিযোগ মানতে নারাজ তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (স্বাস্থ্য) অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান। তার দাবি, হাম নিয়ে সরকারি বা বেসরকারি কোনো সংস্থা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে সতর্ক করেনি। যদিও ইউনিসেফের কর্মকর্তারা বলছেন, বিষয়টি নিয়ে তারা তৎকালীন সরকারকে সতর্ক করেছিলেন।
বর্তমানে দেশের ৬১টি জেলায় হামে ভুগছে শিশুরা। সরকারি হিসাবে শুধু গত ৫০ দিনেই সন্দেহভাজন ও নিশ্চিত রোগী ৪৭ হাজার ছাড়িয়েছে। গত সোমবার হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে এক দিনে রেকর্ড ১৭ জনের মৃত্যুর খবর দেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, ওই সময়ে হামের টিকাদান মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ায় এমন বিপর্যয়কর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
অভিযোগের মুখে ডা. সায়েদুর রহমানের দাবি, অন্তর্বর্তী সরকারকে কেউ এ নিয়ে সতর্ক করেনি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর), স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ (সিডিসি), জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট কিংবা সংক্রামক রোগ নিয়ে কাজ করা কোনো বেসরকারি সংস্থা—কেউ সাবধান করেনি। দেশের প্রখ্যাত রোগতত্ত্ববিদ ও জনস্বাস্থ্যবিদরাও কোনো সতর্কবার্তা দেননি। যদি সে সময় কোনো দেশি-বিদেশি সংস্থা, কর্তৃপক্ষ বা বিশেষজ্ঞের পক্ষ থেকে বিষয়টি নিয়ে সতর্কতা পাওয়া যেত, তাহলে হয়তো আমরা চালান পৌঁছানোর দিনক্ষণ পুনর্নির্ধারণ করে বিশেষ কর্মসূচি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে পারতাম।
ডা. সায়েদুর রহমানের এমন দাবির সঙ্গে অবশ্য একমত নন ইউনিসেফের কর্মকর্তারা। গতকাল সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে এ নিয়ে কথা বলেছেন জাতিসংঘের সংস্থা ইউনিসেফের ভারপ্রাপ্ত বাংলাদেশ প্রতিনিধি স্ট্যানলি গুয়াভুইয়া। তিনি বলেন, ইউনিসেফ একাধিকবার অন্তর্বর্তী সরকারের উচ্চপর্যায়ের নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠক করেছে। প্রতিটি বৈঠকের পর আনুষ্ঠানিক চিঠির মাধ্যমে টিকার সম্ভাব্য ঘাটতি, রোগের প্রাদুর্ভাব, জটিলতা বৃদ্ধি এবং মৃত্যুহারের ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেছে।
স্ট্যানলি গুয়াভুইয়া আরও জানান, ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকার ৫০ শতাংশ টিকা ওপেন টেন্ডার মেথডে (উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি) কেনার বিষয়টি বিবেচনার সিদ্ধান্ত নেয়। ইউনিসেফ ও তাদের অংশীদারেরা তখন উদ্বেগ জানায় যে, এই প্রক্রিয়ায় সামগ্রিক ক্রয়প্রক্রিয়া সর্বোচ্চ ১২ মাস পর্যন্ত বিলম্বিত হতে পারে। এসব উদ্বেগ সত্ত্বেও উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে এগোনোর সিদ্ধান্ত বহাল রাখা হয়। দুঃখজনকভাবে, এ সিদ্ধান্তের ফলে টিকা সংগ্রহে বিলম্ব ঘটে। ২০২৫ সালে ইউনিসেফ আগাম অর্থায়নের ব্যবস্থা করে টিকা সংগ্রহ ও সরবরাহ নিশ্চিত করে, যাতে তীব্র সংকট মোকাবিলা করা যায়। এর ফলে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত কিছু টিকার মজুত বজায় রাখা সম্ভব হয়। তবে কিছু টিকার ক্ষেত্রে এর আগেই মজুত শেষ হয়ে যায় এবং কিছু টিকার ক্ষেত্রে ২০২৬ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ঘাটতি দেখা দেয়। অর্থছাড়ে বিলম্ব এবং ক্রয়প্রক্রিয়ায় পরিবর্তনের সম্মিলিত প্রভাবে টিকা সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হয়। কারণ, উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে টিকা সংগ্রহ সম্পন্ন করা যায়নি এবং অন্তর্বর্তী সরকার ইউনিসেফকে বরাদ্দ দেওয়া অর্থও ছাড় করতে পারেনি।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর নতুন স্বাস্থ্যমন্ত্রী ইউনিসেফ ও অংশীদারদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে মার্চ মাসে উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি বাতিলের নির্দেশ দেন। এরপর এপ্রিলে আবার ইউনিসেফের মাধ্যমে আগের পদ্ধতিতে টিকা সংগ্রহে ফেরার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
হাম—হামের উপসর্গে আরও ৬ শিশুর মৃত্যু : হাম ও হামের উপসর্গে গত ২৪ ঘণ্টায় (গত সোমবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৮টা) দেশে আরও ৬ শিশু মারা গেছে। এর মধ্যে দুই শিশুর হাম শনাক্ত হয়েছিল, আর চার শিশুর ছিল হামের উপসর্গ।
এ সময় সারা দেশে আরও ১ হাজার ১৮৬ শিশুর শরীরে হামের উপসর্গ দেখা দেওয়ার তথ্য দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। হাম শনাক্ত হয়ে দুই শিশু ঢাকায় মারা গেছে। আর হামের উপসর্গে খুলনা ও রাজশাহীতে দুজন এবং সিলেটে দুজন মারা গেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে ৪২ হাজার ৯৭৯ শিশুর। এ সময় হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ২৯ হাজার ৮৩১ শিশু। তবে এর মধ্যে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে বাড়িতে ফিরেছে ২৬ হাজার ৩৬৮ শিশু।
১৫ মার্চ থেকে দেশে ৫ হাজার ৭২৬ শিশুর শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে বলেও উল্লেখ করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
কেকে/এলএ