দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় চূড়ান্ত অনুমোদন পেয়েছে বহুল আলোচিত পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প। প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৩ হাজার ৪৭৪ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। সরকারের আশা, এই প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও উত্তরাঞ্চলের পানি সংকট, কৃষি এবং নৌ-ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসবে।
বুধবার (১৩ মে) সচিবালয়ের মন্ত্রিসভা কক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত একনেক সভায় মোট ১৬টি উন্নয়ন প্রকল্প উপস্থাপন করা হয়। এর মধ্যে ১১ নম্বরে ছিল পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প।
সভা সূত্রে জানা গেছে, মূলত ভারতের ফারাক্কা বাঁধের কারণে শুষ্ক মৌসুমে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে যে তীব্র পানি সংকট তৈরি হয়, তা মোকাবিলায় প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। কয়েক দশকের সমীক্ষা ও পরিকল্পনার পর অবশেষে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে এগোলো সরকার।
একনেক সভা শেষে পানি সম্পদ মন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি সাংবাদিকদের বলেন, “দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অঞ্চল, ২৪টি জেলার প্রায় ৭ কোটি মানুষ এ প্রকল্পের সুফল পাবে। জনস্বার্থ বিবেচনায় প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।”
পরিকল্পনা অনুযায়ী, পদ্মা ব্যারাজের মাধ্যমে পাঁচটি নদীর পানিপ্রবাহ পুনরুজ্জীবিত করা হবে। শুষ্ক মৌসুমে এসব নদীতে প্রায় ৮০০ কিউসেক মিটার পানি সরবরাহ করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাউবো)। চলতি বছর থেকে শুরু হয়ে ২০৩৩ সালের জুনের মধ্যে প্রথম ধাপের কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পুরো প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৫০ হাজার ৪৪৩ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। তবে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি (পিইসি) ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সুপারিশ করায় প্রথম ধাপে ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকার কাজ অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় পদ্মা ব্যারাজ ও গড়াই অফ-টেকে জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা হবে। এসব কেন্দ্র থেকে মোট ১১৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া প্রথম ধাপে ১৩৫ দশমিক ৬ কিলোমিটার গড়াই-মধুমতি নদী এবং ২৪৬ দশমিক ৪৬ কিলোমিটার হিসনা নদী ব্যবস্থার ড্রেজিং ও পুনঃখনন করা হবে।
এছাড়া ১৫টি স্পিলওয়েসহ গড়াই অফ-টেক, ফিশ পাস, নেভিগেশন লক ও ৩৬ দশমিক ৬ মেগাওয়াট ক্ষমতার জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা হবে। চন্দনা অফ-টেকে চারটি এবং হিসনা অফ-টেকে পাঁচটি স্পিলওয়ে নির্মাণের পাশাপাশি ১৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ অ্যাফ্লাক্স বাঁধ নির্মাণ করা হবে।
সরকারের ধারণা, এই প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে প্রতি বছর প্রায় ২৩ লাখ ৯০ হাজার টন ধান উৎপাদন এবং প্রায় ২ লাখ ৩৪ হাজার টন মাছ উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও নদীভিত্তিক অর্থনীতিতে গতি আসবে।
পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প দেশের মোট ভূখণ্ডের প্রায় ৩৭ শতাংশ এলাকায় প্রভাব ফেলবে। প্রথম ধাপে খুলনা, ঢাকা, রাজশাহী ও বরিশাল বিভাগের অন্তত ১৯ জেলা ও ১২০ উপজেলার মানুষ সরাসরি উপকৃত হবে। এর মধ্যে রয়েছে কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনা, সাতক্ষীরা, ফরিদপুর, রাজবাড়ী, পাবনা, রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ একাধিক জেলা।
উল্লেখ্য, পদ্মার ওপর ব্যারাজ নির্মাণের ধারণা নতুন নয়। ১৯৬০ সাল থেকে ২০০০ সালের মধ্যে সম্ভাব্য স্থান নির্ধারণে চারটি সমীক্ষা পরিচালিত হয়। পরে ২০০৫ সালে বিস্তারিত সম্ভাব্যতা যাচাই শুরু হয় এবং দেশি-বিদেশি পরামর্শকদের সমন্বয়ে গঠিত কনসোর্টিয়াম ২০১৩ সালে সেই সমীক্ষা শেষ করে।
কেকে/ এমএস