দেশের শিল্প ও অবকাঠামো খাতের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চ্যালেঞ্জও বাড়ছে। আইন ও নীতিমালা থাকলেও বাস্তবে তার প্রয়োগে ঘাটতি, নিরাপত্তাবিষয়ক সচেতনতার অভাব ও দক্ষতার সংকটের কারণে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির ঝুঁকি রয়ে গেছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, টেকসই উন্নয়ন ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হলে নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার বিকল্প নেই।
বৃহস্পতিবার (২১ মে) রাজধানীর রমনায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশের (আইইবি) সদর দপ্তরের শহীদ প্রকৌশলী ভবনের কাউন্সিল হলে আয়োজিত ‘স্ট্রেনদেনিং অকুপেশনাল সেফটি অ্যান্ড ওয়ার্কফোর্স এক্সিলেন্স ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব কথা বলেন।
আইইবির অকুপেশনাল সেফটি বোর্ড অব বাংলাদেশ (ওএসবিবি) এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আইইবির প্রেসিডেন্ট ও রাজউকের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মোহাম্মদ রিয়াজুল ইসলাম রিজু বলেন, ‘দেশে নিরাপত্তা-সংক্রান্ত অনেক আইন ও নীতিমালা থাকলেও তার কার্যকর প্রয়োগ খুব কম দেখা যায়।’
সড়ক নিরাপত্তার উদাহরণ তুলে ধরে রিয়াজুল ইসলাম বলেন, ‘এখনও অনেক মোটরসাইকেল চালক হেলমেট ব্যবহার করেন না, আবার চালক হেলমেট পরলেও যাত্রীরা অনেক সময় তা ব্যবহার করেন না। অনেক গাড়িচালকও সিটবেল্ট ছাড়া গাড়ি চালান, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়।’
তিনি আরও বলেন, ‘বহু ভবনে অগ্নিনিরাপত্তার জন্য ফায়ার এক্সিট থাকলেও সেখানে মালামাল রেখে চলাচলের পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়। এতে জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত বের হওয়ার সুযোগ ব্যাহত হয়।’
‘শুধু আইন করলেই হবে না, তার বাস্তবায়নও নিশ্চিত করতে হবে। নিরাপত্তা বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়াতে সরকার, পেশাজীবী সংগঠন ও গণমাধ্যমকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।’
স্বাগত বক্তব্যে আইইবির সম্মানী সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. প্রকৌশলী মো. সাব্বির মোস্তফা খান বলেন, ‘বিশেষ করে শিপবিল্ডিং শিল্পে শ্রমিকদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল। অনেক শ্রমিক পর্যাপ্ত সুরক্ষা সরঞ্জাম ছাড়াই ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করেন, ফলে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির আশঙ্কা থেকেই যায়।’
তিনি আরও বলেন, ‘দেশে নিরাপত্তা সংস্কৃতি গড়ে তুলতে শিশুদের ছোটবেলা থেকেই নিরাপত্তাবিষয়ক শিক্ষা দিতে হবে।’
একই সঙ্গে শ্রমিক ও সংশ্লিষ্ট কর্মীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন রিয়াজুল ইসলাম।
আধুনিক নিরাপত্তা সরঞ্জামের ব্যবহার, ঝুঁকি মোকাবিলা ও জরুরি পরিস্থিতিতে করণীয় বিষয়ে প্রশিক্ষণ দুর্ঘটনা কমাতে কার্যকর হতে পারে বলে মত দেন তিনি।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধে ওএসবিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. প্রকৌশলী সৈয়দা সুলতানা রাজিয়া বলেন, ‘বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে তৈরি পোশাক, নির্মাণ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, কৃষি ও উৎপাদনমুখী শিল্পে শ্রমিকদের অবদান গুরুত্বপূর্ণ। তবে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা, অগ্নিকাণ্ড, স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং দক্ষতার ঘাটতি এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।’
তিনি আরও বলেন, ‘শিল্পপ্রতিষ্ঠানে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, জরুরি নির্গমন পথ, নিরাপদ বৈদ্যুতিক সংযোগ ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।’
পাশাপাশি শ্রমিকদের নিয়মিত নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ, মহড়া ও সচেতনতা কার্যক্রম চালানোর আহ্বান জানান তিনি। হেলমেট, গ্লাভস, মাস্ক ও সেফটি ড্রেস ব্যবহারে বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলেন সুলতানা রাজিয়া।
তিনি আরও বলেন, ‘দক্ষতার অভাব কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। তাই প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণ, কারিগরি শিক্ষা ও শিল্পখাতভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়ন কার্যক্রম বাড়াতে হবে।’
চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন ও ডিজিটাল দক্ষতায় শ্রমশক্তিকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার ওপর জোর দেন তিনি।
সৈয়দা সুলতানা রাজিয়ার সভাপতিত্বে ও ওএসবিবির সদস্য সচিব অধ্যাপক ড. প্রকৌশলী মো. ইকবাল হোসেনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন আইইবির ভাইস প্রেসিডেন্ট (এসঅ্যান্ডডব্লিউ) প্রকৌশলী নিয়াজ উদ্দিন ভূঁইয়া।
কেকে/এমএ