সকালটা অন্য দিনের মতো ছিল না। চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রসূতি ওয়ার্ডে একের পর এক নবজাতককে কোলে নিয়ে বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন মায়েরা। কারও কোলে ফুটফুটে কন্যাশিশু, কারও কোলে সদ্যোজাত পুত্র। হাসপাতালের করিডোরে স্বজনদের ব্যস্ততা, মায়েদের মুখে স্বস্তির হাসি আর নবজাতকদের ক্ষীণ কান্না মিলিয়ে তৈরি হয়েছিল এক আনন্দঘন পরিবেশ।
এই দৃশ্য কোনো এক দিনের বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। গত ১০ দিনে ফটিকছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে স্বাভাবিক প্রসবের মাধ্যমে জন্ম নিয়েছে ৮৭টি নবজাতক। জন্মের পর মা ও শিশু সুস্থ থাকায় অধিকাংশ পরিবারই হাসিমুখে হাসপাতাল ছেড়েছে।
উপজেলার রোসাংগিরি ইউনিয়নের বাসিন্দা আব্দুল জলিল বলেন, ‘স্ত্রীকে নিয়ে রাতে হাসপাতালে এসেছিলাম। শুরুতে অনেক ভয় ছিল। কিন্তু চিকিৎসকদের সহযোগিতায় স্বাভাবিক প্রসবের মাধ্যমে আমাদের একটি কন্যাসন্তান জন্ম নিয়েছে। মা ও সন্তান দুজনেই সুস্থ আছে। হাসপাতালের সেবায় আমরা খুবই সন্তুষ্ট।’
দেশজুড়ে যখন সিজারিয়ান প্রসবের ক্রমবর্ধমান হার নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে, তখন ফটিকছড়ির এই সরকারি হাসপাতাল স্বাভাবিক প্রসবকে কেন্দ্র করে গড়ে তুলেছে এক ভিন্ন বাস্তবতা। এখানে প্রসূতি মায়েদের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, প্রয়োজনীয় পরামর্শ, দক্ষ সেবাদান ও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতি স্বাভাবিক প্রসবের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়িয়েছে।
হাসপাতালের পরিসংখ্যানও সেই চিত্রই তুলে ধরে। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে এখানে স্বাভাবিক প্রসবের মাধ্যমে জন্ম নিয়েছে ৮২৮টি শিশু। ২০২৫ সালে এ সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৯৩১। আর গত পাঁচ বছরে প্রায় ১৯ হাজার নবজাতক এই হাসপাতালের মাধ্যমে পৃথিবীর আলো দেখেছে।
প্রসূতি বিভাগের নার্সিং সুপারভাইজার কৃষ্ণা প্রভাত দেবী বলেন, ‘নিরাপদ মাতৃত্বসেবা নিশ্চিত করতে হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা দিন-রাত কাজ করে যাচ্ছেন।’
তিনি বলেন, ‘হাসপাতালে প্রসূতি সেবা, অ্যান্টেনাটাল কেয়ার (এএনসি), পোস্টনাটাল কেয়ার (পিএনসি) ও প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে সিজারিয়ান সেবাও দেওয়া হয়। একদিনে ২১টি শিশুর জন্ম হওয়ার অভিজ্ঞতাও রয়েছে হাসপাতালটির। এমনকি বিদ্যুৎ সংকটের সময়ও মোমবাতির আলোয় প্রসূতি মায়েদের সেবা দিতে হয়েছে স্বাস্থ্যকর্মীদের। নবজাতকদের কোনো জটিলতা দেখা দিলে তাৎক্ষণিকভাবে শিশু বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে।’
কৃষ্ণা প্রভাত দেবী জানান, প্রতিটি জন্মের পেছনে রয়েছে একেকটি পরিবারের অপেক্ষা, উদ্বেগ আর স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন পূরণের নেপথ্যে কাজ করছেন হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা। দিন-রাতের হিসাব না করে তারা প্রসূতি মায়েদের পাশে থাকছেন। কখনো ব্যস্ত প্রসবকক্ষে, কখনো নবজাতকের স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণে, আবার কখনও মায়ের পরবর্তী পরিচর্যায়।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের শিশু স্বাস্থ্য কনসালট্যান্ট ডা. মো. জয়নাল আবেদীন মুহুরী বলেন, ‘গত ২৪ ঘণ্টায় জন্ম নেওয়া ১৭টি নবজাতককেই পর্যবেক্ষণ করেছি। সবচেয়ে আনন্দের বিষয় হলো-সব শিশুই সুস্থ রয়েছে এবং নিরাপদে বাড়ি ফিরে গেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সরকারি হাসপাতালের সেবার প্রতি মানুষের আস্থা আরও বাড়লে ভবিষ্যতে স্বাভাবিক প্রসবের হার বাড়বে।’
প্রসূতি সেবায় ধারাবাহিক সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে ২০০৮-২০১৫ সাল পর্যন্ত জাতীয় পর্যায়েও পুরস্কার পেয়েছে ফটিকছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। তবে হাসপাতালটির সবচেয়ে বড় অর্জন হয়তো কোনো পুরস্কার নয় বরং প্রতিদিন সুস্থ মা ও নবজাতককে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার সক্ষমতা।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. তৌহিদুল আলম বলেন, ‘ফটিকছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স দীর্ঘদিন ধরে স্বাভাবিক প্রসবকেন্দ্রিক উন্নত স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসছে। প্রসূতি সেবায় বিশেষ অবদানের জন্য হাসপাতালটি জাতীয় পর্যায়ে পুরস্কারও অর্জন করেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘গত ১০ দিনেই ৮৭টি নবজাতকের স্বাভাবিক প্রসব সম্পন্ন হয়েছে। এটি আমাদের সেবার প্রতি মানুষের আস্থা এবং হাসপাতালের সক্ষমতারই প্রতিফলন।’
কেকে/এমকে