সোমবার, ১০ আগস্ট ২০২৬,
২৬ শ্রাবণ ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

সোমবার, ১০ আগস্ট ২০২৬
শিরোনাম: শহর-গ্রামে ডেঙ্গুর ভয়      চমক আসছে মন্ত্রিসভায়      জিপিএ-৫ এ এগিয়ে ঢাকা, পিছিয়ে বরিশাল      এসএসসি-সমমানে ৬৬৯ প্রতিষ্ঠানে শতভাগ পাস      রাষ্ট্রীয় সম্মানী ভাতার আওতায় আসছে ৮৬,৭০৯টি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান      জিপিএ-৫ কমেছে, এগিয়ে মেয়েরা      সৌদিতে দুই ছেলে নিহত, শেষবার বুকে জড়াতে চান মা      
খোলাকাগজ স্পেশাল
শহর-গ্রামে ডেঙ্গুর ভয়
রবিউল ইসলাম
প্রকাশ: সোমবার, ১০ আগস্ট, ২০২৬, ১:৫৬ পিএম আপডেট: ১০.০৮.২০২৬ ২:০১ পিএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

দেশে প্রতিদিনই এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। আগে ঢাকাকেন্দ্রিক ডেঙ্গুর প্রভাব থাকলেও এখন গ্রাম-গঞ্জে ছড়িয়ে পড়ছে। আগামী সেপ্টেম্বর মাসেও ডেঙ্গু তীব্র হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। অতিরিক্ত জনঘনত্ব ও থেমে থেমে বৃষ্টির কারণে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ছে। আবার সময়মতো ব্যবস্থা না নিয়ে শুধু মৌসুম এলে নামমাত্র কিছু কাজ করায় এ প্রকোপ বেড়ে গেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডেঙ্গু পরীক্ষার কিটের সংকট ও অব্যবস্থাপনা। এতে সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় ব্যাহত হওয়ায় ডেঙ্গুর প্রকোপ ও জটিলতা বাড়ছে।

আবার হাসপাতালে সঠিক সেবা পেতেও অনেক দৌড়ঝাঁপ করতে হয়। অনেক সময় অনেক হাসপাতালে ঠিকমতো সেবা পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। এর মাশুল দিতে হয় রোগী ও তাদের স্বজনদের। ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে গতকাল রোববার পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মোট ৬১ জন মারা গেছেন। আক্রান্ত হয়েছেন ১৯ হাজার ৩৪০ জন। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঘনবসতি, সারা বছর ধরে এডিস মশার প্রজনন এবং মশা নিয়ন্ত্রণে ঘাটতির কারণেই ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ছে। এ পরিস্থিতি সামাল দিতে দেশজুড়ে একটি সমন্বিত ও কেন্দ্রীয় মশা নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। তারা বলছেন, ঢাকা ও এর আশপাশের অঞ্চলে সংক্রমণের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।

গতকাল ডেঙ্গুবিষয়ক সর্বশেষ সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়াদের মধ্যে বরিশাল বিভাগে ৮৪ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ৮৮ জন, ঢাকা বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ৬৬ জন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ১১০ জন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ৯১ জন, খুলনা বিভাগে ১৪০ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ২৭ জন, রাজশাহী বিভাগে ৫৭ জন, রংপুর বিভাগে পাঁচজন এবং সিলেট বিভাগে চারজন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, চলতি বছরে এখন পর্যন্ত মোট ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ১৯ হাজার ৩৪০ জন। এর মধ্যে ৬১ দশমিক ৫ শতাংশ পুরুষ এবং ৩৮ দশমিক ৫ শতাংশ নারী রয়েছেন। আর ডেঙ্গু থেকে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন ১৭ হাজার।

দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে ঢাকা বিভাগ। সংক্রমণ ও মৃত্যু, দুই ক্ষেত্রেই এগিয়ে আছে এই বিভাগ। চলতি বছর এখন পর্যন্ত ঢাকা বিভাগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন ছয় হাজার ৮৭১ জন, যার মধ্যে শুধু ঢাকা শহরেই আক্রান্তের সংখ্যা চার হাজার ৪০৪ জন। সংক্রমণের বিচারে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে বরিশাল বিভাগ, যেখানে আক্রান্ত হয়েছেন তিন হাজার ৬৪৭ জন। এরপর চট্টগ্রামে তিন হাজার ৮২ এবং খুলনায় দুই হাজার ২৭২ জন আক্রান্তের তথ্য পাওয়া গেছে। মৃত্যুর হিসাবেও শীর্ষে রয়েছে ঢাকা বিভাগ, যেখানে এখন পর্যন্ত মারা গেছেন ২৬ জন, তার মধ্যে ২৫ জনই ঢাকা শহরের বাসিন্দা। এরপরই রয়েছে খুলনা বিভাগ, যেখানে মৃত্যু হয়েছে ১২ জনের। চট্টগ্রামে সাত এবং ময়মনসিংহে ছয়জনের মৃত্যুর তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক জি এম সাইফুর রহমান বলেন, ঢাকায় জনসংখ্যার ঘনত্ব, সারা বছর এডিস মশার বংশবিস্তার এবং মশা নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা, এ তিন কারণ একসঙ্গে মিলেই ডেঙ্গুর ঝুঁকি বহুগুণে বাড়িয়ে তুলছে। ঘনবসতিপূর্ণ পরিবেশ, উষ্ণ জলবায়ু এবং মশার প্রজননের অনুকূল স্থান থাকায় ঢাকা মূলত এডিস মশা ও ডেঙ্গু ভাইরাসের সারা বছর বিস্তারের জন্য এক ধরনের আদর্শ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। এ কারণেই শহরটি পরিণত হয়েছে ডেঙ্গুর অন্যতম প্রধান কেন্দ্রস্থলে।

তিনি আরও বলেন, পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়া হয়। প্রতিরোধমূলক উদ্যোগের অভাব স্পষ্ট। ডেঙ্গুর সংক্রমণ যখন তুলনামূলক কম থাকে, তখনই মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদার করা সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হতে পারে, কারণ সে সময় প্রজননস্থলও কম থাকে। তখন নেওয়া পদক্ষেপ বেশি ফলপ্রসূ হয়। কিন্তু মৌসুম শুরুর পরই কার্যক্রম বাড়ানো হয়, ততদিনে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া শুরু হয়ে যায়।

জি এম সাইফুর রহমান বলেন, যেসব দেশে কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনায় মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালিত হয়, সেখানে ভালো ফল পাওয়া যায়। কিন্তু বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন শহরে ভিন্ন ভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলে কার্যক্রমে সমন্বয়ের অভাব দেখা দেয়। ফলাফলও জায়গাভেদে ভিন্ন হয়। এ কারণে বিশেষজ্ঞ কীটতত্ত্ববিদদের সমন্বয়ে একটি জাতীয় মশা নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ গঠন করতে হবে। সারা দেশের কার্যক্রম তদারকি ও নজরদারি করতে হবে। এমন সমন্বিত জাতীয় ব্যবস্থা গড়ে না উঠলে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়তেই থাকবে।

পাশাপাশি তিনি মশা নিয়ন্ত্রণ ও ডেঙ্গু প্রতিরোধে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর আরও সক্রিয় সম্পৃক্ততার আহ্বান জানান। তার মতে, ওয়ার্ড পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষগুলোকে মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে আরও সরাসরি ও সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, আগস্টজুড়েই ডেঙ্গুর সংক্রমণ বাড়তে পারে এবং সেপ্টেম্বরেও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে। সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত মশার প্রজননস্থল ধ্বংস এবং উৎসস্থল ব্যবস্থাপনা।

তিনি বলেন, মূল কৌশল হলো মশার প্রজননস্থল নির্মূল করা। যেসব প্রজননস্থল অপসারণ বা ধ্বংস করা সম্ভব নয়, সেখানে দীর্ঘস্থায়ী কীটনাশক বা মশার বংশবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণকারী উপাদান ব্যবহার করতে হবে। মশা নিয়ন্ত্রণ ও ডেঙ্গু প্রতিরোধে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে। ওয়ার্ড কাউন্সিলরসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও অন্যান্য স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে মশা নিয়ন্ত্রণ এবং ডেঙ্গু প্রতিরোধে আরও সক্রিয়ভাবে যুক্ত করতে হবে।

সব মিলিয়ে বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ থেকে স্পষ্ট, শুধু মৌসুমভিত্তিক তাৎক্ষণিক উদ্যোগ নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি, পরিকল্পিত ও কেন্দ্রীয় মশা নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাই পারে ডেঙ্গুর ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি থেকে দেশকে সুরক্ষিত রাখতে।

কেকে/এলএ



আরও সংবাদ   বিষয়:  ডেঙ্গু  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলাকাগজ স্পেশাল- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close