সার উৎপাদন বন্ধ। কারখানার ভেতরে চলছে যন্ত্রপাতি মেরামত, ধোয়ামোছা ও পরিষ্কারকাজ। আর ঠিক এই সময়েই কাফকো (কর্ণফুলী ইউরিয়া ফার্টিলাইজার কোম্পানি)-সংলগ্ন ড্রেনের পানি নিয়ে নতুন করে উঠেছে গুরুতর অভিযোগ। সেই পানি খাল হয়ে ঢুকছে পাশের মৎস্যঘেরে। এরপরই মরছে মাছ।
গতকাল শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) দুপুরে চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার বৈরাগ ইউনিয়নের শাহাদাতনগর এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে কয়েকটি ঘেরে বিপুল পরিমাণ মরা মাছ ভেসে থাকতে দেখা গেছে। চাষিদের দাবি, এতে অন্তত ২০ জনের প্রায় ৩৫ লাখ টাকার মাছ নষ্ট হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কাফকোর দিক থেকে আসা ড্রেনের পানি ঘেরের পানিতে মেশার পরই পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটে। পানিতে মাছের মৃত্যুর পাশাপাশি দুর্গন্ধও ছড়িয়ে পড়ে। ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের আশঙ্কা, কারখানার মেরামত ও পরিষ্কারকাজে ব্যবহৃত রাসায়নিকযুক্ত পানি যথাযথভাবে শোধন না করে বাইরে ছেড়ে দেওয়ার কারণেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
মেরামতকাজ চলতেই বিপর্যয়
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গ্যাসসংকটের কারণে কাফকোতে বেশ কিছুদিন ধরে সার উৎপাদন ব্যাহত ও বন্ধ রয়েছে। উৎপাদন বন্ধ থাকলেও কারখানার বিভিন্ন ইউনিটে চলছে রক্ষণাবেক্ষণ, যন্ত্রপাতি পরিষ্কার, ধোয়ামোছা ও ওভারহোলিংয়ের কাজ। এসব কাজে বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক ব্যবহারের প্রয়োজন হয়।
চাষিদের অভিযোগ, মেরামতকাজের পর ব্যবহৃত কেমিক্যালযুক্ত পানি যথাযথ শোধন না করেই অভ্যন্তরীণ নালা দিয়ে বাইরে বের করে দেওয়া হয়েছে। সেই পানি খাল হয়ে আশপাশের মৎস্যঘের ও জলাশয়ে পৌঁছেছে। পানির সঙ্গে রাসায়নিক মিশে যাওয়ার পরই মাছ মরতে শুরু করে বলে দাবি তাদের।
এখন মাছ, আগেও মরেছে মহিষ
স্থানীয়দের কাছে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো- এমন অভিযোগ এবারই প্রথম নয়। এর আগেও কাফকো-সংলগ্ন এলাকায় বিষাক্ত পানি পান করে বেশ কয়েকটি মহিষ মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, কারখানার দিক থেকে আসা দূষিত পানি খাল ও জলাশয়ে মিশে যাওয়ার পর ওই পানি মহিষসহ গবাদিপশুর নাগালে চলে যায়। বিষাক্ত পানি পান করার পর একাধিক মহিষ অসুস্থ হয়ে মারা যায় বলে দাবি স্থানীয়দের।
শুধু তাই নয়, ওই সময় এলাকায় অ্যামোনিয়ার মতো ঝাঁঝালো গন্ধ ছড়িয়ে পড়ার অভিযোগও ওঠে। স্থানীয়দের ভাষ্য, কারখানার আশপাশে বাতাস ও পানিতে তীব্র রাসায়নিক গন্ধ অনুভূত হতো। এতে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও আতঙ্ক তৈরি হয়।
‘কয়েক দশকের পেশা, এবার সব শেষ’
ক্ষতিগ্রস্ত চাষি মো. ঈসমাইল (৪৫) বলেন, ‘কয়েক দশক ধরে এই পেশায় আছি। এর আগেও কাফকোর বর্জ্যপানির কারণে আমাদের মাছ মারা গিয়েছিল। কারখানা কর্তৃপক্ষকে বারবার সতর্ক করেও কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি। এবারও লাখ লাখ টাকার মাছ চোখের সামনে মরে গেল। এই ক্ষতিপূরণ এখন কে দেবে?’ চাষিদের ভাষ্য, ঘেরগুলোতে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ চাষ করা হয়েছিল। মাছ বিক্রি করেই তাদের পরিবারের দৈনন্দিন খরচ চলে। হঠাৎ বিপুল পরিমাণ মাছ মারা যাওয়ায় তাদের মূলধন ও প্রত্যাশিত আয়- দুটিই অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের মধ্যে রয়েছেন- মো. বাবুল হক খান, মো. খায়রুল বশর, মো. জসীম উদ্দীন, মো. সাবা, মো. আনোয়ার, এমদাদ হোসেন, মেহেদী হোসেন, মো. নেজাম উদ্দীন, মো. সাগর, মো. জাহাঙ্গীর আলম, মো. ফারুক, আমিরুজ্জামান, মো. আবু কালাম, মোজাম্মেল, মো. মারুফ, মো. টিপু, মো. খায়রুন্নবী, মো. গিয়াস উদ্দিন ও মো. সেলিম খান।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন
কারখানার মতো বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠানে উৎপাদন বন্ধ থাকলেও রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিষ্কারকাজ থেকে বর্জ্য তৈরি হতে পারে। সেই বর্জ্যরে রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ, সংরক্ষণ, শোধন এবং নিরাপদ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা থাকার কথা। কিন্তু স্থানীয় চাষিদের অভিযোগ, কাফকোর মেরামতকাজের সময় বের হওয়া রাসায়নিকযুক্ত পানি সেই ব্যবস্থার বাইরে চলে গেছে।
ক্ষতির মুখে ২০ পরিবার
চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ইকবাল হায়দার চৌধুরী বলেন, এসব ঘেরের ওপর প্রায় ২০টি পরিবারের জীবিকা নির্ভরশীল। কাফকোর দায়িত্বহীনতার কারণে বিষাক্ত পানি ছেড়ে চাষিদের এভাবে পথে বসিয়ে দেওয়া কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। তিনি ঘটনার তদন্ত ও ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণের দাবি জানান।
চাষিদের দাবি, শুধু মাছ মরে যাওয়ার হিসাব করলেই হবে না। ঘেরের পানি দূষিত হওয়ায় নতুন করে মাছ ছাড়া যাবে কি না, ঘেরের মাটি ও পানির গুণগত মান কী অবস্থায় আছে- সেটিও পরীক্ষা করতে হবে। প্রয়োজনে ঘেরগুলোতে পুনরায় মাছ চাষের উপযোগিতা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
অভিযোগ পেলে নমুনা পরীক্ষা করবে মৎস্য বিভাগ
আনোয়ারা উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মো. রাশিদুল হক বলেন, এ বিষয়ে এখনো কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। লিখিত অভিযোগ পেলে দ্রুত সরেজমিনে পরিদর্শন করে পানির নমুনা পরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে অভিযোগের বিষয়ে কাফকোর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. ফারুখ আহমদের বক্তব্য জানতে ১৮ সেপ্টেম্বর একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
কেকে/সাশ