শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
৩ আশ্বিন ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শিরোনাম: জামায়াত একাত্তরের ভূমিকা মেনে নিয়েছে : আইনমন্ত্রী      জিএসটি গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা, শুরু ১৯ মার্চ      সোমবার নিউইয়র্ক যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী      একসঙ্গে ৯৯ বিচারককে বদলি—কারা গেলেন কোথায়?      গুলশান-ধানমন্ডিসহ ঢাকার পাঁচ লেকের দূষণ রোধে সমন্বিত উদ্যোগের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর      ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধাপরাধের প্রমাণ পেয়েছে জাতিসংঘ      হাম উপসর্গে আরও দুই শিশুর মৃত্যু, নতুন রোগী ১৩৪৩      
খোলাকাগজ স্পেশাল
পুলিশে স্বৈরাচারের ভূত
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১০:৩০ এএম
ছবি: খোলা কাগজ

ছবি: খোলা কাগজ

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে হাসিনা সরকারের পতনের পর বদলেছে রাষ্ট্রের ক্ষমতার কেন্দ্র। তবে প্রশাসনে এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছেন ফ্যাসিবাদী সরকারের সময়ে সুবিধাভোগী ও বিতর্কিত অনেক পুলিশ কর্মকর্তা। অভিযোগ আছে, খোলস বদলে তারা এখন ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের ছত্রছায়ায় থেকে তৎপরতা চালাচ্ছেন, নানাভাবে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও সসমর্থকদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করছেন। মোটা অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে এসব পুলিশ কর্মকর্তা সুবিধাজনক স্থানে বদলি-পদায়ন নিচ্ছেন বলেও অভিযোগ আছে।

সম্প্রতি এক ওসির অডিও ফাঁসের পর পুলিশ প্রশাসনের ভেতরে কথিত ‘সুবিধাভোগী’ কর্মকর্তাদের তৎপরতা নিয়ে আলোচনা আবারও সামনে এসেছে। পাশাপাশি কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তাকে নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে নানা অভিযোগ। 

ভারতে পলাতক শেখ হাসিনার ফেরা নিয়ে ডিএমপির ক্যান্টনমেন্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রাকিবুল হাসানের একটি অডিও রেকর্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এ বিষয়কে কেন্দ্র করে গতকাল বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) তাকে প্রত্যাহার (ক্লোজ) করা হয়। আদেশে বলা হয়, ক্যান্টনমেন্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল ইসলামকে প্রশাসনিক কারণে সদরদপ্তর ও পুলিশ প্রশাসন বিভাগে সংযুক্ত করা হয়েছে। 

ছড়িয়ে পড়া ওই অডিও রেকর্ডে রাকিবুল হাসানকে বলতে শোনা যায়, ‘জানি যে শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে আসতেছে। কিচ্ছু হবে না আসলে, কিচ্ছু হবে না। আপনারা তো চিন্তা করতে পারছেন, রাস্তার পুলিশ কত দুর্বল। ভয়ানক দুর্বল। আসা উচিত। ডিসেম্বর দেরি হয়ে গেছে। এ মাসে আসা উচিত ছিল। চলে আসলি এই পুলিশ কিচ্ছু করতে পারবে না।’

অডিওতে ওই পুলিশ কর্মকর্তাকে বলতে শোনা যায়, ‘সিনিয়র অফিসার সব বিএনপি করতেছে। আমরা তো বিএনপি করতেছি না। সব সিনিয়ররা বিএনপি করতেছে, আমরা বিএনপি করতেছি না। এই করার জন্য তো আমরা ডিপার্টমেন্টে আসি নাই। তোমরা খাবা-দাবা,... নিয়ে থাকবা আর আমরা এখানে বসে বসে কাজ করব, তা তো হবে না।’

মনির নামে পুলিশের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তার গাড়িচালক থানার ওসি পদায়ন করছেন বলেও বলা হয় ওই অডিওতে। অডিওতে তাকে বলতে শোনা যায়, ‘এগুলো সহ্য করা যায়? আর কী বলব? যারা পেস্টিং পাইতেছে, তার (মনির) কাছে টাকা দিচ্ছে, সকাল বেলা পেস্টিং হইতেছে।’

ওই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে উদ্দেশ করে অডিওর বক্তা বলেন, তার লজ্জা থাকা উচিত। তার চাকরি ছিল না। এখন যে পদে আছেন, সেখানে এক বছর থাকতে পারলে ১০০ কোটি টাকা এমনিতেই হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

ওসি পদায়ন নিয়ে অডিওতে ওই ব্যক্তিকে আরও বলতে শোনা যায়, ‘আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) কমিশনার যারা ছিল, তারা ওসি পেস্টিংয়ে টাকা নেয় নাই। যত ওসি বেনজীরের আমলে ছিল, টাকায় কোনো সময় বদলি হয় নাই।’ এখানে তিনি সাবেক আইজিপি ও ডিএমপি কমিশনার বেনজীর আহমেদের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন।

অডিওতে এই পুলিশ কর্মকর্তাকে আরও বলতে শোনা যায়, ‘ডিএমপি, ঢাকা, বাংলাদেশের রাজধানী, ক্যাপিটাল সিটি। এখানকার ওসিরা টাকা দিতে যাবে কেন? এখানে ওসিরা এমনিই যাবে। তোমাদের কাজ করে নিয়ে তোমরা টাকা উঠিয়ে নিবা।’

ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কীভাবে কাজ করে দিয়েছেন, সে অভিজ্ঞতার বিষয়ে ওসি রাকিবুলকে বলতে শোনা যায়, ‘আমি ভাটারায় একটা কাজ করে দিছি এক স্যারকে। স্যার এক কোটি টাকা নিছে। আমি তো জানতাম না।আমার সাথে শুধু সম্পর্কটা আছে। এ-ই হলো অবস্থা! এইভাবে চাকরি করা যাবে নাকি? অযোগ্য লোকগুলোরে কোন জায়গা ঢুকায় (পদায়ন দেয়) আর যোগ্য লোকগুলোকে চিপা-চাপায় রাখছে।’

তবে ছড়িয়ে পড়া সেই অডিও নিয়ে নিজের ফেসবুক প্রোফাইল থেকে একটি পোস্ট দিয়েছে পুলিশ কর্মকর্তা রাকিবুল হাসান। পোস্টে তিনি দাবি করেন, ভাইরাল অডিওটি এআই দিয়ে তৈরি। পোস্টে তিনি লেখেন, অ্যাডভান্স এআই ছাড়া এটা আর কিছু না। এ যুগে এআই দিয়েও ফাঁসানো যায় মানুষকে এই অডিও না শুনলে বুঝাই যাবে না। গণমাধ্যমের প্রতি অনুরোধ যাচাই-বাছাই না করে প্রচারের নামে অপ্রচার করলে একটা মানুষের মানসম্মান ধ্বংস হতে পারে এটাও তাদের জানা দরকার অথচ আমার নামে যে অপ্রচার করা হচ্ছে সেটা আমি কখনো বলিও নাই। আল্লাহ সবার উত্তম মঙ্গল করুন।

এ আলোচনা সমালোচনার মধ্যেই সামজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি পত্রিকার পেপারকাটিং শেয়ার দিয়ে এনসিপি-সমর্থিত ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের সংগঠন ন্যাশনাল ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যালায়েন্সের আহ্বায়ক প্রকৌশলী মো. শেখ জামাল (আবির) পুলিশের আরেক কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসানের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ এনে লিখেছেন— ‘হারুনের ক্যাশিয়ার পুলিশ ইন্সপেক্টর মাহমুদুল হাসান ওরফে জুয়েল এখনো বহাল তবিয়তে, চলছে নতুন বাণিজ্য!’ 

তিনি লিখেন— ‘বহু সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা, রাজনৈতিক সচেতন মানুষ এদের কারনে ধ্বংস হয়েছে, হারুনের ক্যাশিয়ার নামে খ্যাত পুলিশ কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান ওরফে জুয়েল বিতর্কিত ডিআইজি হারুন রশিদের সাথে ১৫ বছর ধরে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছে। কারণ যেখানেই হারুন পোস্টিং পেত সেখানেই মাহমুদকে নিয়ে যেত। সেই মাহমুদুল হাসান এখন বোল পাল্টে হয়ে উঠেছে বিএনপিপন্থি পুলিশ কর্মকর্তা। আর তাকে এ বিএনপি বানানোর পেছনে মূল কারিগর হচ্ছে বিএনপির প্রভাবশালী এক নেতা, যিনি ছিলেন বিএনপি সরকারের সাবেক প্রতিমন্ত্রী। প্রকাশ্যে ও অপ্রকাশ্যে এলাকায় চাহর উঠেছে, তার থেকে ১০ কোটি টাকা নেওয়ার বিনিময়ে তাকে বিএনপিপন্থি হিসেবে পরিচিত করার প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। গত মাসে মাহমুদকে বদলি করে ঢাকায় এসবিতে পদায়ন করা হয়, আর সেই বদলির তদবির করে ঐ বিএনপি নেতা।’

৫ আগস্ট পট পরিবর্তনের পর ওই কর্মকর্তাকে ঢাকা থেকে খাগড়াছড়ির মহালছড়িতে বদলি করা হয় উল্লেখ করে আবির লিখেন— ‘তার (মাহমুদুল হাসান ওরফে জুয়েল) বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগের মধ্যে কয়েকটি গুরুতর অভিযোগ হচ্ছে— ১.গাজীপুর জয়দেবপুর ওসি থাকাকালে পাতারটেকে জঙ্গি নাটকের মাধ্যমে ৭ জন নিরাপদ কিশোর কে হত্যা করেছিল। যারা সবাই মাদ্রাসার ছাত্র। সেই ঘটনার অন্যতম কুশীলব মাহমুদ, যা চ্যানেল২৪-এ সার্চলাইট প্রোগ্রাম বিস্তারিত এসেছে। ২। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের ওসি থাকাকালে বিশ জন পুলিশ কনস্টেবলকে চাকরি দেয়ার নাম করে জালিয়াতি। ৩। অনিয়ম এবং দুর্নীতি করে বিদেশে অর্থ পাচার এবং শত কোটি টাকার মালিক হয়েছে।  ৪। স্ত্রীর নামে আমদানি রপ্তানির লাইসেন্স করে বিদেশে অর্থ পাচার। ৫। গাজীপুরের সাবেক মেয়র মান্নান ও তার অফিসের লোকজনকে জোরপূর্বক ভাবে ধরে এনে চাঁদা আদায়। ৬। চোরাচালান ও রাতের অন্ধকারে সন্ত্রাসীদের গডফাদার হিসাবে কাজ করতো এ জুয়েল, তার এডিসি ও সাঙ্গুপাঙ্গুগুলো, পোস্টে তিনি লিখেন। 

এদিকে মো. আব্দুস সালাম নামে এক অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টের ফেসবুক পোস্টে অভিযোগ করেন— বিএনপি পরিবারের একজন ওসিকে ঢাকা পুলিশ লাইনে সংযুক্ত হতেই কয়েক লক্ষ টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে পুলিশের উপরের টাকাখোর অফিসারদের। অথচ সেই ওসির পরিবারের এক সদস্য গত ১৩/১৪ বছর অফিসিয়ালি বিএনপির দায়িত্বশীল জায়গায় কামলা দিচ্ছে। কমপক্ষে দুজন মন্ত্রীর সুপারিশের পরও তার ঢাকার ভালো কোনো থানায় জায়গা হয়নি।

তার দাবি— মন্ত্রীকেও নয়ছয় বুঝিয়ে পুলিশের সিনিয়র অফিসাররা নিজেদের হেডম দেখাচ্ছে। অথচ ২ বছর আগেও এরা নিজেদের কাপড় ঠিক থাকবে কিনা, সেই ভয়ে কাঁপত। তিনি বলেন, ‘আগেও বলেছি, এখনো বলি, প্রধানমন্ত্রী যতই সৎ উদ্দেশ্য নিয়ে পশ্চিমা স্টাইলে দেশ চালাতে চাচ্ছেন, সেটা অসম্ভব। উনার আশপাশের লোকেরাই প্রভাব বিস্থারে মরিয়া। তারা প্রশাসনে সরকারের গ্রিপ শক্ত করার চেয়ে নিজেদের ব্যক্তিগত চাওয়াকে প্রাধান্য দিচ্ছেন।’

আব্দুস সালাম লিখেন, ‘তারেক রহমানের উন্নয়নের প্ল্যানে যেমন তার আশপাশের লোকের পজিটিভ ভূমিকা আছে। তেমনি তারেক রহমানের সরকারকে ডোবাবেও তাদের দায়িত্বের বাইরে ক্ষমতা বিস্থারের চেষ্টা। যার যে দায়িত্ব, সেটার বাইরে ক্ষমতা দেখানোর অবারিত সুযোগ পেলে এটাই হয়।’

অন্যদিকে চট্টগ্রামের বাঁশখালী থানার ওসি রবিউল হককে নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন উঠেছে। ফাহাদ মোহাম্মদ নামে এক অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টের পোস্টে দাবি করা হয়েছে, ২০১৮ সালে নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ থানায় কর্মরত থাকার সময় রবিউল হক বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদকে ঈদের নামাজে যেতে তার বাড়ির দরজায় বাধা দিয়েছিলেন। ওই ঘটনার সঙ্গে মওদুদ আহমেদের তৎকালীন বক্তব্যের ভিডিও থাকার কথাও পোস্টে বলা হয়েছে। বর্তমানে রবিউল হক বাঁশখালীর ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

তাকে ঘিরে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া, সাধারণ সমর্থকদের হয়রানি, মানবপাচারকারী ও মাদক কারবারিদের সহযোগিতা এবং স্থানীয় দালালদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে।


কেকে/সাশ 



আরও সংবাদ   বিষয়:  পুলিশ   অডিও ফাঁশ   
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলাকাগজ স্পেশাল- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close