মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬,
২১ আশ্বিন ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬
শিরোনাম: ● হাম উপসর্গে আরও ৬ জনের মৃত্যু, নতুন শনাক্ত ১৩৯৩      ● ভুল ধরিয়ে দেব, সংশোধন না হলে প্রতিরোধ: গোলাম পরওয়ার      ● জাপান সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান      ● প্রধান শিক্ষক নিয়োগে ১৮ বছরের অভিজ্ঞতার শর্ত বহাল      ● বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস: বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি নামতে পারে ৩.৪ শতাংশে      ● নির্ধারিত দামে এলপিজি না মিললে গণমাধ্যমে তুলে ধরার আহ্বান      ● আজকের শিশুরাই আগামীতে দেশের নেতৃত্ব দেবে: প্রধানমন্ত্রী      
খোলাকাগজ স্পেশাল
ব্যাটারিচালিত রিকশা
গ্যারেজে গ্যারেজে অবৈধ বিদ্যুৎলাইন
শিপার মাহমুদ
প্রকাশ: বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৯:১৪ এএম

রাজধানীর সড়ক ও মহাসড়কজুড়ে অবাধে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ব্যাটারিচালিত রিকশা। অলিগলি থেকে শুরু করে মূল সড়কেও অনিয়ন্ত্রিত চলাচলের কারণে প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা। নানা পদক্ষেপ নিয়েও লাগাম টানা যাচ্ছে না এসব যানবাহনের। এর ওপর দেশজুড়ে যখন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট তীব্র, ঠিক তখনই এসব রিকশার গ্যারেজগুলোতে দেখা গেছে অবৈধ বিদ্যুৎ ব্যবহারের উৎসব।

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের একাধিক রিকশাচালকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অধিকাংশ গ্যারেজেই একটি বৈধ মিটারের আড়ালে লুকিয়ে চালানো হচ্ছে চোরাই সংযোগ। সাধারণত সামনের অংশে বৈধ মিটারে চার্জ দেখিয়ে ভেতরের অংশে গোপনে অবৈধ সংযোগে চার্জ দেওয়া হয় বহু যানবাহন। চালকদের অভিযোগ, বিদ্যুৎ বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর প্রত্যক্ষ মদদেই চলছে এই চোরাই সংযোগের কারবার।

গত রোববার ট্রাফিক তেজগাঁও বিভাগ রাজধানীর রায়েরবাজার এলাকার ছয়টি অটোরিকশা গ্যারেজে অভিযান চালিয়ে চারটিতেই চোরাই বিদ্যুৎ ব্যবহারের প্রমাণ পায়। এ ঘটনায় এক গ্যারেজ মালিককে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে।

এদিকে রাজধানী মোহাম্মদপুর এলাকার অটোরিকশা চালক আনিস খোলা কাগজকে বলেন, অনেক গ্যারেজে বৈধ মিটারের পাশাপাশি অবৈধ বা চোরাই বিদ্যুতের লাইন ব্যবহার করে বিপুলসংখ্যক অটোরিকশার ব্যাটারি চার্জ দেওয়া হচ্ছে। একটি বৈধ মিটারের মাধ্যমে যেখানে ১০টি গাড়ি চার্জ দেওয়া হয়, সেখানে কেউ কেউ আলাদা অবৈধ লাইন তৈরি করে আরও ৫০টি পর্যন্ত গাড়ি চার্জ দিচ্ছেন। তার দাবি, এ ধরনের ঘটনা কমবেশি সব গ্যারেজেই হচ্ছে। 

রাজধানী উত্তরার এলাকার রিকশাচালক মহিউদ্দিন জানান, উত্তরার বাউনিয়া ও আশপাশের এলাকায় অটোরিকশার গ্যারেজগুলোতে এ ধরনের অবৈধ বিদ্যুৎ ব্যবহারের ঘটনা অনেক বেশি। সন্ধ্যার পর বিভিন্ন গ্যারেজে এসব অটোরিকশা চার্জ দেওয়া হয়। 

অন্য একজন রিকশাচালক জানান, তিনি ১৯৯৭ সাল থেকে রিকশা চালানোর সঙ্গে যুক্ত। আগে প্যাডেল রিকশা চালালেও এখন ব্যাটারিচালিত রিকশা চালিয়ে জীবনযাপন করেন। তার অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণের বিভিন্ন গ্যারেজে বৈধ বিদ্যুতের পাশাপাশি অবৈধভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার করে গাড়ি চার্জ দেওয়ার ঘটনা কমবেশি রয়েছে এবং বিষয়টি সবাই জানে। তিনি আরও জানান, কোনো কোনো গ্যারেজে বিপুলসংখ্যক অটোরিকশা রাখা হয় এবং দীর্ঘ সময় ধরে বিদ্যুৎ ব্যবহার করে সেগুলোর ব্যাটারিতে চার্জ দেওয়া হয়। এ কাজে বিদ্যুৎ বিভাগের অনেক কর্মী জড়িত থাকার অভিযোগও করেন তিনি।

এর মধ্যেই গড়ে উঠেছে কথিত নম্বরপ্লেট ও সংগঠননির্ভর একটি ব্যবস্থা। বিভিন্ন সংগঠনের নামে নম্বরপ্লেট দেওয়ার পাশাপাশি চাঁদাবাজির অভিযোগও রয়েছে। রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে একটি বিকল্প নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা তৈরি হয়েছে, যা ই-রিকশার বিস্তারকে আরও উৎসাহিত করছে।

এ সব বিষয়ে কথা হলে উত্তরা ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মো. কামাল হোসেন লাল চাঁন খোলা কাগজকে বলেন, ‘অনেক গ্যারেজে বৈধ সংযোগের পাশাপাশি গোপনে অতিরিক্ত লাইন ব্যবহার করে বিপুলসংখ্যক রিকশা-অটোর চার্জ দেওয়া হচ্ছে— এ অভিযোগ এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। তবে এ ধরনের অবৈধ সংযোগের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আমরা প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে ও স্থানীয় এমপিসহ থানা পর্যায়ের নেতাকর্মীদেরও লিখিতভাবে জানিয়েছি।’ তার ভাষ্য— বিদ্যুৎ বিভাগের ভেতরের লোকজনের সহায়তা ছাড়া এই চোরাই সংযোগ চালানো অসম্ভব।

কামাল হোসেন লাল চাঁন আরও বলেন, ‘নতুন করে অবৈধ গাড়ি বা গ্যারেজ গড়ে ওঠা ঠেকাতে প্রশাসন ব্যবস্থা নিলে সংগঠনের পক্ষ থেকেও সহযোগিতা করা হবে। একই সঙ্গে অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার পাশাপাশি নতুন করে যাতে এমন সংযোগ দেওয়া না হয়, সে বিষয়েও প্রশাসনের পদক্ষেপ চাওয়া হয়েছে সংগঠনের পক্ষ থেকে।’

সংগঠনের সভাপতি আবু বকর সিদ্দিক খোলা কাগজকে জানান, তাদের সংগঠনের মূল উদ্দেশ্য হলো মালিকদের স্বার্থ রক্ষা, চালকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং রাস্তায় যানজট ও বিশৃঙ্খলা কমানো। তবে প্রশাসনিক সহযোগিতার অভাব ও কিছু গ্যারেজ মালিকের অতিরিক্ত লাভের প্রবণতার কারণে সংগঠনের পরিকল্পনা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।

অটোরিকশার পেছনে মালিক সমিতির স্টিকার লাগানোর বিষয়ে তিনি বলেন, ‘স্টিকারটি মূলত মালিক সমিতির পরিচয় বহন করে এবং এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট এলাকার অটোরিকশাগুলোকে সংগঠনের আওতায় আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে স্টিকার ব্যবহারের বিনিময়ে আর্থিক লেনদেন করা হয় না।’ এ সময় তিনি আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক সরকারের সময় প্রতিটি রিকশার বিপরীতে বিভিন্ন অঙ্কের টাকা দেওয়ার কথা উল্লেখ করেন। 

দুই সিটি করপোরেশনের হিসাব বলছে, ঢাকায় নিবন্ধিত প্যাডেলচালিত রিকশা রয়েছে প্রায় ২ লাখ ১৩ হাজার। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে প্রায় ১ লাখ ৮২ হাজার এবং উত্তর সিটিতে ৩০ থেকে ৩১ হাজার। কিন্তু এর বাইরে চলাচলকারী রিকশার বড় অংশই অনিবন্ধিত। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের ২০১৯ সালের গবেষণায় ঢাকায় রিকশার সংখ্যা প্রায় ১১ লাখ বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। আর ব্যাটারিচালিত ই-রিকশার বর্তমান সংখ্যা নিয়ে সরকারি সংস্থাগুলোর কাছে নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই। 

এ বিষয়ে বুয়েটের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহা. মোসলেহ উদ্দীন হাসান বলেন, ব্যাটারিচালিত রিকশা মূলত একটি ‘মেকানিক্যাল থ্রি-হুইলার’। তাই একে যান্ত্রিক যানবাহনের আইনেই সাজাতে হবে, কেবল ‘রিকশা’ বিবেচনা করে সহানুভূতি দেখানোর সুযোগ নেই।
 
তবে তার মতে, হঠাৎ করে অভিযান চালিয়ে কিংবা একদিনে ই-রিকশা সরিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। ফুটপাতকে হাঁটার উপযোগী করতে হবে, গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে এবং মানুষের স্বল্প দূরত্বের চলাচলের বিকল্প তৈরি করতে হবে। তখন মানুষ অনেক ক্ষেত্রে ই-রিকশার পরিবর্তে হেঁটেই গন্তব্যে যেতে আগ্রহী হবে।

কেকে/ এমএস


আরও সংবাদ   বিষয়:  ব্যাটারিচালিত রিকশা   গ্যারেজ   অবৈধ বিদ্যুৎলাইন  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলাকাগজ স্পেশাল- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close