নারীর গোপনাঙ্গ, পুরুষের পায়ুপথ কিংবা পাকস্থলীতে করে ইয়াবা পাচারের ঘটনা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে পুরোনো। কিন্তু শিশুর শরীরকে মাদক পাচারের ‘জীবন্ত চালান’ হিসেবে ব্যবহারের ঘটনা সামনে আসায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রামে ইয়াবা পাচারে এবার ভয়ংকর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে শিশুদের শরীরকেই।
মাদক কারবারিরা ঠিক কখন থেকে এই কৌশল ব্যবহার করছে, তা নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার কর্মকর্তারা। তবে সাম্প্রতিক ঘটনায় স্পষ্ট হয়েছে- আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়াতে মাদক চক্রগুলো পাচারের কৌশলে আরও ভয়ংকর পথে যাচ্ছে।
আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা জানান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে দরিদ্র ও অসহায় পরিবারের শিশুদের টার্গেট করছে মাদক কারবারিরা। মাসে ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা ভাতা, পরিবারের বাজার খরচসহ নানা প্রলোভন দেখিয়ে তাদের মাদক বহনে নামানো হচ্ছে। শুধু বহন নয়, কৌশলে পাকস্থলিতে ইয়াবার প্যাকেট ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি চট্টগ্রামে ৯ ও ১২ বছর বয়সী দুই শিশুর পাকস্থলি থেকে ১৩৩টি প্যাকেট বের হওয়ার ঘটনায় সামনে এসেছে মাদক পাচারকারীদের এই ভয়ংকর কৌশল।
গত ৬ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার সরকারহাটের তৈলার দ্বীপ এলাকা থেকে একটি সিএনজি অটোরিকশায় তল্লাশি চালিয়ে শারমিন আকতার ইসমত আরা (৪০) নামে এক নারীকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। এ সময় তার সঙ্গে থাকা দুই শিশুকে হেফাজতে নেওয়া হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তাদের পাকস্থলিতে ইয়াবা থাকার তথ্য পেয়ে স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। এক্স-রে পরীক্ষায় তাদের পাকস্থলীতে ইয়াবা ট্যাবলেটসদৃশ বস্তু ধরা পড়ে। পরে মলত্যাগের মাধ্যমে ৯ বছর বয়সী শিশুটির পেট থেকে ৬৭টি এবং ১২ বছর বয়সী শিশুটির পেট থেকে ৬৬টি- মোট ১৩৩টি প্যাকেট বের করা হয়। এসব প্যাকেটে পাওয়া যায় ৬ হাজার ৬১৫টি ইয়াবা।
র্যাব কর্মকর্তারা জানান, ইয়াবাগুলো স্বচ্ছ পলিপ্যাকে মোড়ানোর পর কালো স্কচটেপ দিয়ে পেঁচিয়ে লম্বাটে আকার দেওয়া হয়েছিল। পরে কৌশলে শিশুদের দিয়ে সেগুলো গিলিয়ে কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রামের দিকে পাঠানো হয়। র্যাবের তথ্য অনুযায়ী, দুই শিশুকে বান্দরবানের আলীকদম থেকে কক্সবাজারের কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পসংলগ্ন এলাকায় নেওয়া হয়েছিল। সেখানে তাদের ইয়াবার ছোট ছোট প্যাকেট খাওয়ানো হয়।
এর আগে একই শিশুদের ব্যবহার করে আরও দুই দফা চট্টগ্রামে ইয়াবা পাচার করা হয়েছিল। চক্রটির অন্যতম হোতা হিসেবে গ্রেপ্তার শারমিন আকতার ইসমত আরার নাম এসেছে। কক্সবাজারের টেকনাফেও আরেক ব্যক্তি শিশুদের ইয়াবা পাচারে ব্যবহার করছে বলে তথ্য পেয়েছে র্যাব।
র্যাব-৭-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, হতদরিদ্র শিশুদের প্রলোভন দেখিয়ে একটি চক্র ইয়াবা পাচারে ব্যবহার করছিল। কক্সবাজারের উখিয়া থেকে ইয়াবা সংগ্রহ করে কৌশলে শিশুদের খাওয়ানো হতো। পরে তাদের শরীরের ভেতর ইয়াবা বহন করিয়ে চট্টগ্রাম নগরে এনে বিক্রি করা হতো। শিশুদের টাকা দেওয়ার পাশাপাশি পরিবারের বাজার খরচ বহনের প্রলোভনও দেখানো হতো। চক্রটির মূল হোতাদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
নজর এড়াতে ‘শরীরের ভেতরেই’ চালান
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে পাকস্থলীর ভেতর ইয়াবা বহনের ঘটনা আগের তুলনায় আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। এর আগে পেঁয়াজ, কাঁচা মরিচ, গাড়ির টায়ার, টিফিন বক্স, জুতা, সিলিন্ডার কিংবা মোবাইলের ব্যাটারির ভেতর ইয়াবা পাচারের কৌশল ব্যবহার করা হতো। এসব পদ্ধতিতে পাচারকারীরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ধরা পড়ায় এখন আরও ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেছে নেওয়া হচ্ছে। ইয়াবা স্কচটেপ দিয়ে পেঁচিয়ে লম্বা করে কালো জামের মতো বানিয়ে কলা বা জুসজাতীয় পানীয়ের সঙ্গে গিলে ফেলে বাহকরা। পরে মলত্যাগের মাধ্যমে তা বের করা হয়।
কর্মকর্তারা জানান, পেটে থাকা প্যাকেটের কোনো একটি ছিদ্র বা লিক হলে মুহূর্তেই শরীরে মারাত্মক বিষক্রিয়া হতে পারে। বাইরে থেকে কোনো লক্ষণ প্রকাশ না পেলেও ইয়াবা বহনকারী ব্যক্তি মারা যেতে পারে। গত কয়েক বছরে রোহিঙ্গাসহ স্থানীয় কয়েকজনের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে এভাবে ইয়াবা বহন করতে গিয়ে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের অতিরিক্ত পরিচালক মো. জাহিদ হোসেন মোল্লা বলেন, শিশুদের সঙ্গে নিয়ে নারীরা বেশি ইয়াবা পাচার করে থাকে। পরিবারের সদস্যরাও বিভিন্ন সময় শিশুদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে ইয়াবা পাচারের সময় গ্রেপ্তার হয়েছেন। নারী-পুরুষের পাকস্থলীতে ইয়াবা পাচারের ঘটনা বিভিন্ন সময় ধরা পড়লেও শিশুদের পাকস্থলীর ভেতর ইয়াবা পাচারের ঘটনা এবারই প্রথম ধরা পড়েছে।
টাকার ফাঁদে শিশুরা
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সাবেক সভাপতি ও সহকারী অধ্যাপক মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, দরিদ্র ও পড়ালেখার বাইরে থাকা শিশুরা নানা প্রলোভনে পড়ে মাদক পাচারে জড়িয়ে যাচ্ছে। মূল হোতারা অর্থসহ বিভিন্ন ধরনের লোভ দেখিয়ে তাদের ব্যবহার করছে। তার মতে, প্রথমে মাদক পাচারের মূল হোতাদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করতে হবে। পাশাপাশি সন্তানদের গতিবিধির বিষয়ে অভিভাবকদেরও সতর্ক থাকতে হবে।
শিশু ও মানবাধিকার কর্মী এবং সাউথ এশিয়ান ভয়েস ফর চিলড্রেনের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, দরিদ্র, অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে মাদক পাচারে ব্যবহার করছে চক্রগুলো। প্রাপ্তবয়স্ক বাহকদের তুলনায় শিশুদের কম টাকায় কাজে নামানো যায়। অনেক ক্ষেত্রে ৪ থেকে ৮ হাজার টাকা কিংবা সামান্য মজুরির বিনিময়ে তাদের ব্যবহার করা হচ্ছে। শিশু ধরা পড়লে প্রাপ্তবয়স্কদের মতো কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকি কম- এমন ধারণাও পাচারকারীদের মধ্যে রয়েছে। তাই শিশুদের নিরাপদ আশ্রয়, মানসম্মত শিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করার পাশাপাশি স্কুল ও কমিউনিটি পর্যায়ে সচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
কেকে/ এমএস