দেশে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের হাওয়া বইতে শুরু করেছে। সরকারের ঘোষিত পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আগামী নভেম্বরের মাঝামাঝি সময় থেকেই এ নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। প্রথম পর্যায়ে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।
দেশের ৪ হাজার ৫৮০টি ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন সাত ধাপে অনুষ্ঠানের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। প্রথম ধাপের সম্ভাব্য তারিখ ১২ নভেম্বর নির্ধারণ করে সাতটি ধাপে এ নির্বাচন করার প্রাথমিক পরিকল্পনা (রোডম্যাপ) ঘোষণা করা হয়েছে।
সোমবার নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ এ রোডম্যাপ ঘোষণা করেন। এর আগেও চলতি বছরেই স্থানীয় নির্বাচন শুরু করার কথা জানিয়ে আসছিল নির্বাচন কমিশন। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকেও ডিসেম্বরের আগেই নির্বাচন শুরু করার কথা জানিয়েছিল।
স্থানীয় সরকারের পাঁচ স্তরের নির্বাচনের মধ্যে সামনে ১৩টি সিটি করপোরেশন, ৩৩০টি পৌরসভা, প্রায় ৫০০টি উপজেলা এবং সাড়ে চার হাজারের বেশি ইউনিয়ন পরিষদের বিভিন্ন পদে নির্বাচন রয়েছে। ইসি ইউপি নির্বাচন দিয়েই এ ভোটপর্ব শুরু করতে চায়। সবশেষ ২০২১ সালের ২১ জুন থেকে শুরু হয়ে ২০২২ সালের বিভিন্ন ধাপে এ নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছিল।
নির্বাচন কমিশনার সানাউল্লাহ জানান, প্রথম ধাপে ৮০ উপজেলার ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন দিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে। মোট ৭ ধাপে এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। প্রথম ধাপ ১২ নভেম্বর, দ্বিতীয় ধাপ ১৩ ডিসেম্বর ও ৩য় ধাপের নির্বাচন হবে ৩০ ডিসেম্বর। আর আগামী বছরের ১৭ জানুয়ারি ৪র্থ ধাপ, ৪ ফেব্রুয়ারি ৫ম ধাপ, ২২ এপ্রিল ৬ষ্ঠ ধাপ এবং ৭ম ধাপের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে ২৭ মে।
আরেক নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ পরিকল্পনার বিষয়টি স্পষ্ট করে বলেন, আগামী নভেম্বরের মাঝামাঝি সময় থেকেই দেশের স্থানীয় সরকার নির্বাচন কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করা হবে। এর প্রাথমিক পর্যায়ে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা পর্যায়ক্রমে সারা দেশে কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন করবে কমিশন।
গত মাসেই প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিন জানিয়েছিলেন, নির্বাচন উপযোগী ইউপিগুলোর মধ্যে প্রথম ধাপের তফসিল সেপ্টেম্বরের মধ্যে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তফসিল ঘোষণার পর সাধারণত ভোটের জন্য দুই মাস সময় রাখা হয়। নির্বাচনসংক্রান্ত কাজে ভোটার সভারেন্টি প্রতিষ্ঠা করতে চাই। নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু ভোট হবে। আমাদের কমিটমেন্টের ঘাটতি নেই। জাতীয় নির্বাচন যেভাবে করেছি, যে স্ট্যান্ডার্ডে করেছি তার চেয়ে ভালো বৈ কিছু হবে না। আমরা স্বাধীন, নিরপেক্ষ, গ্রহণযোগ্য কাজ করতে রাষ্ট্রপতির সহযোগিতা চেয়েছি।
দেড় দশক পর বাড়ছে প্রার্থীর জামানত ও ভোটের ব্যয় :
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে সমন্বয় রেখে স্থানীয় সরকারের ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে প্রার্থীর জামানত ও ভোটের ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে ইসি। প্রায় দেড় দশক পর প্রার্থীর ভোটের ব্যয় দ্বিগুণ এবং জামানত পাঁচগুণ করা হচ্ছে। এবার ইউনিয়ন পরিষদে প্রার্থী হতে চেয়ারম্যান পদে ২৫ হাজার টাকা ও সদস্য পদে ৫ হাজার টাকা করা হচ্ছে। সেইসঙ্গে চেয়ারম্যান প্রার্থীর নির্বাচনি ব্যয় ১০ লাখ টাকা ও সদস্য প্রার্থীর ব্যয় ২ লাখ টাকা নির্ধারণ প্রস্তাব করেছে নির্বাচন কমিশন।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, প্রদত্ত ভোটের এক অষ্টমাংশ ভোট না পেলে জামানত বাজেয়াপ্তের বিধান রয়েছে। এটা স্পষ্ট করে এবার ১৫ শতাংশ ভোট না পেলে জামানত বাজেয়াপ্তের বিষয়টি প্রস্তাব করা হয়েছে। সেইসঙ্গে প্রার্থী নির্বাচনি ব্যয় (ব্যক্তিগত ও ভোটের ব্যয়) আলাদা আলাদা থাকলেও এবার একীভূত করে ব্যয় সুনির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে।
সেক্ষেত্রে এবার চেয়ারম্যান প্রার্থীর ব্যয়সীমা প্রস্তাব করা হয়েছে ১০ লাখ টাকা। বিদ্যমান বিধিমালায় প্রার্থীর ব্যক্তিগত ব্যয় রয়েছে ৫০ হাজার টাকা আর নির্বাচনি ব্যয় রয়েছে ৫ লাখ টাকা। আর সদস্য (মেম্বার) পদে ব্যক্তিগত খরচ ১০ হাজার টাকা ও ভোটের ব্যয় ১ লাখ টাকা রয়েছে বিদ্যমান বিধিতে। ইসি এবার প্রস্তাব রেখেছে—সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থীর ব্যয় হবে ২ লাখ টাকা।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীর জামানত ২০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫০ হাজার টাকা করা হয়; ব্যয়সীমাও ১০ টাকা ভোটারপ্রতি বিবেচনায় ২৫ লাখ টাকার বেশি ব্যয়ের সুযোগ উন্মুক্ত রাখা হয়। এর ধারাবাহিকতায় বিদ্যমান স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) নির্বাচন বিধিমালায় করণিকসহ ছোটখাটো মিলিয়ে ২১টি সংশোধন প্রস্তাব সরকারের কাছে পাঠিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
কমিশনের অন্য প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে—নির্বাচনি দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের হুমকি, ভীতি-প্রদর্শন ও বাধা প্রদানের শাস্তির বিধান। ভোটার দৃষ্টি প্রতিবন্ধী হন অথবা শারীরিক প্রতিবন্ধী হন বা অন্য কোনো প্রকারে শারীরিকভাবে সহায়তা সুস্পষ্টীকরণ। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর নির্বাচনি অপরাধ ও আচরণবিধি লঙ্ঘনজনিত বিষয় তদারকিতে নির্ধারিত সংখ্যক উপয্ক্তু কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে তদারকি কমিটি গঠন। অনিয়ম হলে তদন্ত সাপেক্ষে নির্বাচনের ফলাফল স্থগিত। পুনরায় ভোট গ্রহণে কমিশনের ক্ষমতা। নির্বাচন বিধিমালা লঙ্ঘন করলে সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে কমিশন কর্তৃক প্রার্থিতা বাতিলের ক্ষমতার বিধান।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আচরণবিধি :
এর আগে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন, উপজেলা ও জেলা পরিষদের জন্য প্রায় অভিন্ন আচরণবিধি জারি করে নির্বাচন কমিশন। নতুন বিধিমালায় নির্বাচনি প্রচারে পোস্টার নিষিদ্ধ রাখা হয়। তবে ব্যানার, লিফলেট, ফেস্টুন ও সীমিত সংখ্যায় বিলবোর্ড ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়। প্রচারের সময় মাইক ও ভ্রাম্যমাণ বাহন ব্যবহারে নির্ধারণ করে সময়সীমা দেওয়া হয়।
প্রচারে পোস্টার নয়, বিলবোর্ডে সীমা :
নতুন আচরণবিধিতে নির্বাচনি প্রচারে পোস্টার ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ব্যানার, লিফলেট, ফেস্টুন ও বিলবোর্ড ব্যবহারের সুযোগ থাকলেও এগুলোর আকার ও ব্যবহারের সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। ব্যানারের সর্বোচ্চ আকার ১০ ফুট বাই ৪ ফুট। লিফলেট ও হ্যান্ডবিল হতে হবে এ-ফোর আকারের—৮ দশমিক ২৭ ইঞ্চি বাই ১১ দশমিক ৬৯ ইঞ্চি। ফেস্টুনের সর্বোচ্চ আকার ১৮ ইঞ্চি বাই ২৪ ইঞ্চি। বিলবোর্ডের প্রচার অংশের সর্বোচ্চ আকার ১৬ ফুট বাই ৯ ফুট। সিটি করপোরেশন ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রতি ওয়ার্ডে একটি করে বিলবোর্ড ব্যবহারের সুযোগ থাকবে।
উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রতি ইউনিয়ন বা পৌর ওয়ার্ডে একটি করে, তবে পুরো নির্বাচনি এলাকায় সর্বোচ্চ ২০টি বিলবোর্ড ব্যবহার করা যাবে।
জেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রতি থানা বা উপজেলায় একটি করে বিলবোর্ড ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে। প্রচারের সামগ্রী হতে হবে সাদা-কালো। ফেস্টুন ও হ্যান্ডবিলে পলিথিনের আবরণ বা পিভিসি ব্যবহার করা যাবে না। প্রচারসামগ্রীতে মুদ্রণের তারিখ থাকতে হবে। প্রতীকের দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতা ছয় ফুটের বেশি হতে পারবে না। প্রচারে জীবন্ত প্রাণীও ব্যবহার করা যাবে না।
মাইক, ক্যারাভান ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম :
নির্বাচনি প্রচারে মাইক বা শব্দবর্ধক যন্ত্র ব্যবহারের সময় দুপুর ১২টা থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে একটির বেশি মাইক ব্যবহার করা যাবে না। একই সময়সীমায় ক্যারাভান বা ভ্রাম্যমাণ বাহনেও প্রচারের সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে জেলা পরিষদ নির্বাচনে মাইক ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের সুযোগ থাকলেও এর ব্যয় নির্বাচনি ব্যয়ের হিসাবে দেখাতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে ভুয়া তথ্য, বিকৃত ছবি বা বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট প্রচারের ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ রাখা হয়েছে।
এনআইডি-মোবাইল নম্বর সংগ্রহে নিষেধাজ্ঞা :
আচরণবিধিতে বলা হয়, প্রার্থীর পক্ষে বা বিপক্ষে ভোটারদের প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে ভোটারের নিজের বা পরিবারের সদস্যদের ব্যক্তিগত জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) নম্বর সংগ্রহ করা যাবে না। মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসে (এমএফএস) লেনদেনের উদ্দেশ্যেও ভোটারের মোবাইল নম্বর সংগ্রহ নিষিদ্ধ করা হয়।
প্রচারে থাকবেন না ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ’ ব্যক্তিরা :
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থীর পক্ষে প্রচারে ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ’ ব্যক্তিদের অংশ নেওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা রাখা হয়। তালিকায় প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, মন্ত্রী, চিফ হুইপ, বিরোধীদলীয় নেতা, সংসদ উপনেতা, বিরোধীদলীয় উপনেতা, প্রতিমন্ত্রী, হুইপ, উপমন্ত্রী বা সমমর্যাদার ব্যক্তি, সংসদ সদস্য এবং সিটি মেয়রের পাশাপাশি মেয়রের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি বা প্রশাসকদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রার্থী ছাড়া চেয়ারম্যান, মেয়র, প্রশাসক বা স্থানীয় সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তি নির্বাচনি প্রচারে অংশ নিতে পারবেন না।
আচরণবিধি ভাঙলে জরিমানা, প্রার্থিতা বাতিলের সুযোগ :
নতুন আচরণবিধিতে নিয়ম লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড এবং জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। ইউপি আচরণবিধি লঙ্ঘনে সর্বোচ্চ ৬ মাসের কারাদণ্ডের পাশাপাশি জরিমানা ১০ হাজার টাকা বহাল রাখা রয়েছে।
পাঁচ ধরনের নির্বাচনে আলাদা বিধান :
ইউনিয়ন পরিষদ : প্রতি ওয়ার্ডে একটি বিলবোর্ড ব্যবহার করা যাবে। নির্বাচনি প্রচারে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যয় নির্বাচনি ব্যয়ের মধ্যে দেখাতে হবে। মাইক ব্যবহার করা যাবে দুপুর ১২টা থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত। আগে বিলবোর্ড ব্যবহারের সুযোগ ছিল না; এবার তা সীমিত পরিসরে যুক্ত হয়েছে।
উপজেলা পরিষদ : প্রতি ইউনিয়ন বা পৌর ওয়ার্ডে একটি করে এবং পুরো নির্বাচনি এলাকায় সর্বোচ্চ ২০টি বিলবোর্ড ব্যবহার করা যাবে। নির্বাচনি ক্যাম্পের সংখ্যাও সীমিত করা হয়েছে। নির্বাচনি ক্যাম্প স্থাপনেও সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয়ভাবে একটি, প্রতি ইউনিয়নে একটি এবং পৌরসভা এলাকায় প্রতি তিন ওয়ার্ডের একটির বেশি ক্যাম্প করা যাবে না।
পৌরসভা : প্রতি ওয়ার্ডে একটি করে বিলবোর্ড ব্যবহার করা যাবে। দুপুর ১২টা থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত মাইক, ক্যারাভান বা ভ্রাম্যমাণ বাহনে প্রচার চালানো যাবে।
জেলা পরিষদ : প্রতি থানা বা উপজেলায় একটি করে বিলবোর্ড ব্যবহার করা যাবে। এ নির্বাচনে মাইক ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়নি।
সিটি করপোরেশন : প্রতি ওয়ার্ডে একটি করে বিলবোর্ড ব্যবহার করা যাবে। নির্বাচনি প্রচারে পোস্টার নিষিদ্ধ। ব্যানার, লিফলেট, ফেস্টুন ও বিলবোর্ডের আকারও নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।
কেকে/ এমএস