সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, জ্বালানি নিরাপত্তা ও জনসেবাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। এছাড়া তারুণ্যের ক্ষমতায়ন ও কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও তথ্যপ্রযুক্তি, সামাজিক সুরক্ষা, কৃষি, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ এবং বৈদেশিক সম্পর্ক জোরদারে সরকার একাধিক উদ্যোগ নিয়েছে। এসব উদ্যোগের মধ্যে কিছু ইতোমধ্যে বাস্তবায়ন হয়েছে, আবার কিছু রয়েছে পরিকল্পনা, প্রস্তাব বা বাস্তবায়নাধীন পর্যায়ে।
গতকাল বুধবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ‘প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং’ আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রম তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন। মূলত, গত সাত মাসে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন বহুমুখী ও কল্যাণমুখী পদক্ষেপের চিত্র দেশবাসীর সামনে তুলে ধরতেই এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রেস সচিব সালেহ শিবলী, অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন, প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব সুজন মাহমুদ, প্রধানমন্ত্রীর সহকারী প্রেস সচিব আশরোফা ইমদাদ, নাজমুল হক খান ও আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ শাহরিয়ার পামির উপস্থিত ছিলেন। সংবাদ সম্মেলন পরিচালনা করেন প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব-১ জাহিদুল ইসলাম রনি।
সরকারের পক্ষ থেকে অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অগ্রগতি তুলে ধরে বলা হয়েছে, মূল্যস্ফীতির চাপ কমানোর পাশাপাশি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা চলছে। আন্তর্জাতিক ঋণমান নির্ধারণকারী সংস্থা মুডিস বাংলাদেশের ঋণমানের পূর্বাভাস ‘নেতিবাচক’ থেকে ‘স্থিতিশীল’ করেছে। রাজনৈতিক ও বৈদেশিক চাপ কমে আসা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ার কারণে ঝুঁকির ভারসাম্যে পরিবর্তন এসেছে।
তারুণ্যের ক্ষমতায়ন, শিক্ষা ও তথ্যপ্রযুক্তি উদ্ভাবন
মাহ্দী আমিন জানান, তরুণদের উদ্যোক্তা ও কর্মসংস্থানমুখী করতে নানা উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বাংলাদেশ ব্যাংকের আওতায় ৫০ কোটি টাকার বিশেষ ঋণ তহবিল গঠন করে উপজেলা পর্যায়ে প্রতি বছর ৫ হাজার তরুণ উদ্যোক্তাকে প্রারম্ভিক মূলধন দেওয়ার কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।
জামানতবিহীন সুদমুক্ত ই-লোন, অনলাইন স্টার্টআপ তহবিল ও জাতীয় বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার চালুর উদ্যোগ রয়েছে। সাইবার নিরাপত্তায় রিপোর্টিং ও রেটিং ব্যবস্থা চালুর পাশাপাশি কম দামে স্মার্টফোন উৎপাদনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে কারিগরি শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন প্রকল্প, নতুন পাঠ্যবই, প্রযুক্তি পার্ক সক্রিয়করণ এবং কক্সবাজারে ব্লু ইকোনমি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগও রয়েছে।
বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের কল্যাণ ও জীবনমান উন্নয়ন
বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের জীবনমান উন্নয়নে একাধিক উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য ২০২৬ সালের নতুন পে-স্কেল অনুমোদন, মোবাইল ভাতা সম্প্রসারণ এবং অবসরপ্রাপ্তদের নিট পেনশন বৃদ্ধির ব্যবস্থা করা হয়েছে। বাবা-মায়ের সম্পত্তি দানের পরও তাদের ভোগদখল ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইন করা হয়েছে।
সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের স্থায়ী তহবিল বাড়ানোর উদ্যোগের পাশাপাশি ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও ইমাম-মুয়াজ্জিনদের ভাতা সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। কড়াইল, ভাসানটেক ও সাততলা বস্তি পুনর্বাসন, আধুনিক মিট প্রসেসিং সেন্টার স্থাপন, পশু চিকিৎসক নিয়োগ এবং প্রবাসীদের এনআইডি-পাসপোর্ট সেবা সহজীকরণের উদ্যোগও রয়েছে।
নারীর অগ্রযাত্রা, সর্বজনীন কল্যাণ ও সামাজিক সুরক্ষা
নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা জোরদারে বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। সাইবার পরিসরে নারীর হয়রানি ও সহিংসতা প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে যৌথ কাঠামো গঠনের উদ্যোগ রয়েছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে নারী শিক্ষার্থীদের শতভাগ উপবৃত্তি ও পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। চা শ্রমিক নারীদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তায় রেইনকোট বিতরণ করা হয়েছে। প্রবাসী শ্রমিকদের আইনি সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক আইন সংস্থার সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। কারাবন্দিদের পরিবারের সঙ্গে নিরাপদ ভার্চুয়াল সাক্ষাতের ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। পাশাপাশি দুর্ঘটনায় আহত সেনাসদস্যদের চিকিৎসা ও শহীদ পরিবারের আর্থিক সহায়তায় প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পরিবেশবান্ধব জ্বালানি, কৃষি ও জলবায়ু সহনশীল শিল্পায়ন
জ্বালানি ও কৃষি খাতে দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা বাড়াতে বড় পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। গ্যাস সংকট মোকাবিলায় ১৫০টি নতুন কূপ খনন এবং পরবর্তী ধাপে আরও ১৫০টি কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এলএনজি সরবরাহ বাড়াতে এফএসআরইউ সংখ্যা পাঁচটিতে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। জাতীয় গ্রিডে নতুন সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত করা, ডিজেলচালিত সেচপাম্প সৌরশক্তিতে রূপান্তর, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতে প্রণোদনা এবং বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কৃষকের সার সরবরাহ নিশ্চিত করতে উদ্বৃত্ত মজুত রাখা হয়েছে। বন্ধ ইউরিয়া কারখানা ও রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প পুনরুজ্জীবন, নদীর পলিমাটি দিয়ে পরিবেশবান্ধব ইট উৎপাদন এবং চামড়া শিল্পনগরীর দূষণ নিয়ন্ত্রণেও পদক্ষেপ চলছে।
আধুনিক স্বাস্থ্য অবকাঠামো ও জনস্বাস্থ্য
স্বাস্থ্যসেবার পরিধি বাড়াতে রাজধানীসহ আট বিভাগীয় শহরে ১৫ তলা বিশেষায়িত জেনারেল হাসপাতাল নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাপনা মডেলে পরিচালনার উদ্যোগের পাশাপাশি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সাশ্রয়ী ডায়ালাইসিস সেবা সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের শয্যা বাড়ানো এবং রংপুরে বিশেষায়িত বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি সেন্টার নির্মাণের উদ্যোগ রয়েছে। ন্যাশনাল ই-হেলথ প্ল্যাটফর্ম চালুর পরিকল্পনা, কমিউনিটি ক্লিনিকে ওষুধ ও সরঞ্জাম সরবরাহ, হাম-রুবেলার টিকাদান এবং নিজস্ব ভ্যাকসিন উৎপাদন কারখানা স্থাপনের কার্যক্রম চলছে। ডেঙ্গু মোকাবিলায় দেশব্যাপী পরিচ্ছন্নতা অভিযানও শুরু হয়েছে।
স্মার্ট ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও যোগাযোগ অবকাঠামো
যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও যানজট নিরসনে একাধিক প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথে বৈদ্যুতিক ট্রেন চালুর সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও নকশা সম্পন্ন হয়েছে। ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম সিটি গেট পর্যন্ত চার লেনের নিরবচ্ছিন্ন এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। মহাসড়কে ক্যাশলেস স্বয়ংক্রিয় টোল ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ রয়েছে।
ঢাকার যানজট কমাতে কারওয়ান বাজারের পাইকারি কাঁচাবাজার ও ফুলবাড়িয়া বাস টার্মিনাল স্থানান্তরের কার্যক্রম চলছে। ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় ডিজিটাল নিবন্ধন ও কিউআর ট্র্যাকিং চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি মহাসড়কে লাইফ সাপোর্ট অ্যাম্বুলেন্স নেটওয়ার্ক, বৈদ্যুতিক গাড়ির চার্জিং স্টেশন এবং ঢাকার নদী-খাল পুনরুদ্ধারে টাস্কফোর্স গঠনের উদ্যোগ রয়েছে।
প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন, জনকূটনীতি ও বৈদেশিক সম্পর্ক
সুশাসন, বিচার, প্রশাসন ও বৈদেশিক সম্পর্ক জোরদারে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। জুলাই অভ্যুত্থানের ঘটনায় আদালতের রায়, শহীদ পরিবারের সদস্যদের সরকারি চাকরি এবং সংসদীয় স্থায়ী কমিটি কার্যকর করার উদ্যোগ রয়েছে। সরকারি নথিতে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর নামের আগে অতিরিক্ত সম্মানসূচক শব্দ ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান আইডি, থানাকে আধুনিক সেবাকেন্দ্রে রূপান্তর, বিশেষ ট্রাইব্যুনাল ও ভূমি অফিসে বায়োমেট্রিক হাজিরার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিদেশি ঋণ পরিশোধ, রেমিট্যান্স বৃদ্ধি, ইইউর বাণিজ্য বাধা নিরসন, শ্রমবাজার সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ সুরক্ষা চুক্তি এবং আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তার পাশাপাশি প্রতিরক্ষা ও যোগাযোগ সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগও রয়েছে।
মাহ্দী আমিন বলেন, ১৬ বছরের শাসনপরবর্তী ধ্বংসস্তূপ থেকে বাংলাদেশ পুনর্গঠনে মাত্র সাত মাসে সব সমস্যার শতভাগ সমাধান সম্ভব না হলেও নির্বাচিত ও জবাবদিহিমূলক সরকার সর্বোচ্চ আন্তরিকতা ও সদিচ্ছা নিয়ে কাজ করছে। দল-মত ও বিভেদ ভুলে সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর, মানবিক ও নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তোলাই লক্ষ্য।
কেকে/ এমএস