দেশে রাসায়নিক সারের চরম সংকট চলছে। কৃষকের হাতে সার নেই, ডিলারের কাছে গেলে মিলছে ‘সার শেষ’—এমন অভিযোগ। এমন পরিস্থিতিতে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্ত দিয়ে মিয়ানমারে পাচার হচ্ছে বিপুল পরিমাণ সার। সীমান্তের দুর্গম পাহাড়ি পথ ব্যবহার করে সংঘবদ্ধ চক্র দেশের বাজার থেকে সার সংগ্রহ করে তা পাচার করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে— দেশে পর্যাপ্ত সার মজুত রয়েছে, কোনো সংকট নেই। পাশাপাশি বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড (বিজিবি) অবৈধ সার পাচার রোধে সীমান্ত ও উপকূলীয় রুটে কঠোর নজরদারি এবং বিশেষ অভিযান অব্যাহত রেখেছে।
সম্প্রতি বিজিবির অভিযানে নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম, বাইশফাড়ি, চাকঢালা ও রেজুপাড়া সীমান্ত এলাকা থেকে ৪ হাজার ৪০১ কেজি ইউরিয়া ও টিএসসি সার জব্দ করা হয়েছে। বিজিবির ভাষ্য অনুযায়ী, গত আগস্ট মাসেই এসব সার বিভিন্ন অভিযানে জব্দ করা হয়। এর আগে উপজেলার সোনাইছড়ির সীমান্তসংলগ্ন এলাকা থেকেও ১০০ বস্তা ইউরিয়া সার জব্দ করা হয়েছিল।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মিয়ানমারে সরকার ও বিদ্রোহীদের মাঝে চলমান সংঘাতের কারণে রাখাইন রাজ্যে এক ধরনের সংকট চলছে। আরাকান আর্মি শাসিত ওই রাজ্যের কৃষকরা জমিতে সার প্রয়োগে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন। যে কারণে মিয়ানমারে ইউরিয়া সারের বেশ কদর রয়েছে। সেখানে প্রতি বস্তা ইউরিয়া সার দ্বিগুণ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
নাইক্ষ্যংছড়ির বিভিন্ন এলাকার কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বোরোসহ বিভিন্ন মৌসুমে সার কিনতে গিয়ে তাদের ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। অনেক সময় ডিলারের কাছে গেলে চাহিদা অনুযায়ী সার পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানানো হয়। আবার কোথাও সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগও রয়েছে।
বাইশারী ইউনিয়নের করলিয়ামুরার কৃষক মো. ছৈয়দ আলম বলেন, ‘সার নিতে ডিলারের কাছে গেলে অনেক সময় বলা হয় সার শেষ। কৃষকের জন্য বরাদ্দের সার যদি সত্যিই শেষ হয়ে যায়, তাহলে সীমান্তে এত সার কোথা থেকে যাচ্ছে— এটাই আমাদের প্রশ্ন।’
উপজেলার আরেক কৃষক মো. কামাল উদ্দিন বলেন, ‘সার পাওয়া নিয়ে কৃষকদের মধ্যে সবসময় একটা অনিশ্চয়তা থাকে। বাজারে সার সংকটের কথা শুনি, অথচ সীমান্তে সার জব্দ হওয়ার খবরও দেখি। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা দরকার।’
কৃষক মো. হুমায়ুনের ভাষ্য, ‘আমরা বেশি দামে সার কিনতে বাধ্য হলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। কৃষকের জন্য বরাদ্দ সার যদি পাচার হয়ে থাকে, তাহলে যারা এর সঙ্গে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’
যে পথে যাচ্ছে সার
নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তের দুর্গম পাহাড়ি পথগুলোকে সার পাচারের রুট হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, নাইক্ষ্যংছড়ি সদর ইউনিয়নের ফুলতলী, বামহাতিরছড়া, চাকঢালা ও আছারতলী, দৌছড়ি ইউনিয়নের কালাচাঁদের পথ এবং ঘুমধুম ইউনিয়নের বাইশফাড়ি, তুমব্রু ও রেজু সীমান্তসংলগ্ন দুর্গম এলাকাগুলোতে পাচারকারীদের তৎপরতা রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সীমান্তের কাছাকাছি বিভিন্ন স্থানে আগে সার মজুত করা হয়। পরে রাতের আঁধারে শ্রমিকদের মাধ্যমে মাথায়, কাঁধে কিংবা অন্য কোনো উপায়ে দুর্গম পাহাড়ি পথ পেরিয়ে সীমান্তের ওপারে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
দামের বিশাল পার্থক্যই কি পাচারের মূল কারণ?
সীমান্ত দিয়ে সার পাচারের পেছনে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের বাজারদরের বড় পার্থক্য ভূমিকা রাখছে বলে সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ মনে করছেন। কৃষকদের জন্য বাংলাদেশে সরকারি মূল্যে প্রতি বস্তা ইউরিয়া সার ১ হাজার ২৫০ টাকায় বিক্রির কথা। স্থানীয়দের দাবি, মিয়ানমারের বাজারে একই পরিমাণ ইউরিয়া বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৬ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়ে থাকে। ফলে দেশের বাজার থেকে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি—প্রায় ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকা দরে সার সংগ্রহ করেও পাচারকারীদের বড় ধরনের মুনাফা করার সুযোগ থাকে বলে তাদের ধারণা।
আগে মজুত, পরে রাতের আঁধারে পাচার
সীমান্ত এলাকার বাসিন্দাদের ভাষ্য, পাচারকারীরা সরাসরি দেশের মূল বাজার থেকে সীমান্ত পার করে সার নিয়ে যায় না। বিভিন্ন জায়গা থেকে সার সংগ্রহ করে প্রথমে সীমান্তবর্তী দুর্গম এলাকায় মজুত করা হয়। পরে সুযোগ বুঝে ছোট ছোট চালানে তা সীমান্তের ওপারে নেওয়া হয়।
একজন কৃষি কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে সার সংগ্রহ করে নাইক্ষ্যংছড়ি ও টেকনাফ সীমান্ত এলাকায় নেওয়া হচ্ছে—এমন তথ্য রয়েছে। দুর্গম পাহাড়ি পথ ব্যবহার করে এসব সার মিয়ানমারে পাচারের চেষ্টা করা হয় বলেও তিনি জানান।
শুধু সীমান্তে অভিযান নয়, খুঁজতে হবে উৎস
স্থানীয়দের মতে, সীমান্তে সার জব্দ করে পাচারকারীদের আটক করাই যথেষ্ট নয়। সার কোথা থেকে সংগ্রহ করা হচ্ছে, কোন পরিবেশক বা ডিলারের মাধ্যমে তা সীমান্তে পৌঁছাচ্ছে এবং সরবরাহ ব্যবস্থার কোথায় ফাঁকফোকর রয়েছে—এসব বিষয় তদন্ত করা জরুরি। স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা বলেন, ‘শুধু সীমান্তে পাহারা বাড়িয়ে এ সমস্যার সমাধান হবে না। সার কোথা থেকে আসছে এবং কারা সরবরাহ করছে—সেই জায়গায় হাত দিতে হবে। তাহলেই পাচারের মূল হোতাদের বের করা সম্ভব হবে।’
বিজিবির অভিযানে বারবার সার জব্দ
নাইক্ষ্যংছড়ির দুর্গম সীমান্ত এলাকায় বিভিন্ন সময় চোরাচালানবিরোধী অভিযান চালিয়ে আসছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। এসব অভিযানে মাদক, অবৈধ পণ্যসহ বিভিন্ন চোরাচালানি পণ্য জব্দের পাশাপাশি সারও জব্দ হয়েছে। গত আগস্ট মাসে ঘুমধুম, বাইশফাড়ি, চাকঢালা ও রেজুপাড়া সীমান্ত এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৪ হাজার ৪০১ কেজি ইউরিয়া ও টিএসসি সার জব্দের তথ্য জানিয়েছে বিজিবি। এর আগে সোনাইছড়ির সীমান্তসংলগ্ন এলাকা থেকে ১০০ বস্তা ইউরিয়া সার জব্দ করা হয়।
নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. ইনামুল হক বলেন, ‘কৃষকদের বরাদ্দের সার অবৈধভাবে যাতে অন্যত্র চলে না যায়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সমন্বয় করে নজরদারি জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
কৃষি বিভাগের এই উদ্যোগের মধ্যেই সীমান্ত দিয়ে সার পাচারের অভিযোগের বিষয়টি সামনে এসেছে। ফলে স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে বরাদ্দ ও সরবরাহ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়েও উদ্বেগ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
সরকার বলছে সংকট নেই, মাঠের চিত্র ভিন্ন
দেশে সারের সংকট নেই এবং পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে—সরকারের পক্ষ থেকে এমন বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে। চলতি বোরো মৌসুমে যাতে কোনো ঘাটতি না হয়, সে জন্য প্রয়োজনীয় আমদানির অনুমোদনও দেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
কিন্তু মাঠের চিত্র ভিন্ন। কৃষকদের নানান অভিযোগ। কোথাও সার না পাওয়ার অভিযোগ, কোথাও বেশি দামে কেনার অভিযোগ, আবার কোথাও সরবরাহ ঘাটতির কারণে সংকটের কথা বলছেন কৃষকরা। এর সঙ্গে নাইক্ষ্যংছড়ির মতো সীমান্তবর্তী এলাকায় সার পাচারের অভিযোগ ও বিপুল পরিমাণ সার জব্দ হওয়ার ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
সার পাচারের অভিযোগের নেপথ্যে কারা রয়েছে, দেশের কোন অঞ্চল থেকে সার সীমান্তে যাচ্ছে, কীভাবে তা পরিবহন ও মজুত করা হচ্ছে এবং সরবরাহ ব্যবস্থার কোনো পর্যায়ে যোগসাজশ রয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সমন্বিত তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
কেকে/সাশ